বাংলাদেশের আদালতে ব্রিটিশ আইনপ্রণেতা (এমপি) টিউলিপ সিদ্দিককে দুর্নীতির মামলায় দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সোমবার (১ ডিসেম্বর) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত থেকে এই রায় ঘোষণার পর ওয়েস্টমিনিস্টারের রাজনীতি অঙ্গণে শুরু হয় তোলপাড়। হ্যাম্পস্টেড ও হাইগেট আসন থেকে লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ এখন আইন অনুযায়ী তার পার্লামেন্টারি আসন ধরে রাখতে পারবেন কিনা, এটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
অপরদিকে, দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং প্রভাবশালী মিত্র টিউলিপের কারাদণ্ড নিয়ে সরকারের অবস্থান লেবার পার্টিকে রাজনৈতিক ও নৈতিক পরীক্ষার মুখোমুখি করেছে।
ব্রিটিশ আইন কী বলে?
যুক্তরাজ্যের ‘রিকল অব এমপি অ্যাক্ট ২০১৫’ অনুযায়ী, কোনও নির্বাচিত এমপি যদি একবছরের বেশি সময়ের জন্য কারাদণ্ড প্রাপ্ত হন, তবে তার পদ বাতিলের প্রক্রিয়া বা ‘রিকল পিটিশন’ শুরু হতে পারে। তাই টিউলিপের দণ্ড এই আইনের আওতায় পড়ে।
তবে এখানে আরেকটি আইনি প্রশ্ন রয়েছে। আইনটি মূলত ব্রিটিশ আদালতের রায়ের ক্ষেত্রে সরাসরি কার্যকর হয়। বিদেশি আদালতের রায়, বিশেষ করে যে দেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের কোনও বন্দিবিনিময় চুক্তি নেই, তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একজন ব্রিটিশ এমপির পদ খারিজ করতে পারে কিনা— তা নিয়ে আইনজীবীদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতপার্থক্য
ব্রিটেনে বাংলাদেশের রায়ের আইনি বৈধতা এবং টিউলিপ সিদ্দিকের ক্যারিয়ারের ওপর এর প্রভাব নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে দুই বিশিষ্ট আইনজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা হয়।
লন্ডনের ল’ ম্যাট্রিক সলিসিটর্সের ব্যারিস্টার সালাহ উদ্দিন সুমন মনে করেন, ‘ঢাকার রায়ের ভিত্তিতে টিউলিপের পদ হারানোর কোনও আইনি সুযোগ নেই।’’
তিনি বলেন, ‘এটি ন্যায়বিচারের একটি বড় ব্যত্যয়। মিজ সিদ্দিককে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে তার অনুপস্থিতিতে ওই রায় দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী, প্রাকৃতিক ন্যায়বিচার লঙ্ঘন করে দেওয়া কোনও বিদেশি আদালতের রায় যুক্তরাজ্যে কার্যকর বা গ্রহণযোগ্য নয়। এটি স্পষ্টতই একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রায়, যার ভিত্তিতে একজন ব্রিটিশ এমপিকে পদত্যাগে বাধ্য করা আইনত অসম্ভব।’’
অপরদিকে, সিনিয়র লিগ্যাল কনসালটেন্ট লন্ডনের চ্যান্সেরী সলিসিটর্সের কর্ণধার ব্যারিস্টার মো. ইকবাল হোসেন বিষয়টিকে নৈতিকতার জায়গা থেকে দেখছেন।
তিনি বলেন, ‘‘আইনের মারপ্যাঁচ এক জিনিস আর একজন এমপির নৈতিক অবস্থান আরেক জিনিস। ঢাকার আদালত তথ্য-প্রমাণ যাচাই করেই রায় দিয়েছে যে, বাংলাদেশে সরকারি সম্পদ আত্মসাতে ক্ষমতার অপব্যবহার হয়েছে। দুর্নীতি একটি বৈশ্বিক অপরাধ। কোনও ব্রিটিশ এমপি যদি বিদেশের আদালতেও আর্থিক কেলেঙ্কারিতে দোষী সাব্যস্ত হন, তবে সেটাকে ‘রাজনৈতিক মামলা’ বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। (ব্রিটিশ) জনগণের আস্থা ধরে রাখতে তার পদত্যাগের প্রচণ্ড চাপ তৈরি হবে। কারণ, দুর্নীতির দায়ে দণ্ড জনপ্রতিনিধিত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’’
স্টারমারের রাজনৈতিক ‘মাথাব্যথা’
আইনি লড়াইয়ের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক চাপ। টিউলিপ সিদ্দিক কেবল একজন এমপি নন, তিনি প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং পাশের আসনের প্রতিনিধি। স্টারমারের নির্বাচনি এলাকা হলবর্ন অ্যান্ড সেন্ট প্যানক্রাস এবং টিউলিপের আসন পাশাপাশি।
বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি ইতোমধ্যেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে, দুর্নীতির দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত এক এমপিকে স্টারমার সমর্থন দেবেন কিনা। স্টারমার যদি টিউলিপকে রক্ষা করেন, তবে তার প্রতিশ্রুত ‘সততার রাজনীতি’ প্রশ্নবিদ্ধ করার লোকের অভাব হবে না। আর যদি ব্যবস্থা নেন, তবে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া রায়কে পরোক্ষভাবে স্বীকৃতি দেবেন, যে রায় টিউলিপের আইনজীবীরা ‘প্রহসন’ বলে খারিজ করে আসছেন।
টিউলিপ সিদ্দিক শুরু থেকেই সব অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন। তিনি পুরো প্রক্রিয়াকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর আগে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে তার আর্থিক সম্পর্কের তদন্ত শুরু হলে তিনি ট্রেজারির ইকোনমিক সেক্রেটারির পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন, তবে এমপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ভবিষ্যৎ কী?
টিউলিপ সিদ্দিকের রাজনৈতিক ভাগ্য এখন অনেকটাই নির্ভর করছে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ‘কমিটি অন স্ট্যান্ডার্ডস’-এর ওপর। তারা যদি মনে করে, এই দণ্ডাদেশ এমপিদের আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছে, তবে বিদেশি রায় হওয়া সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।








