এক দশকেরও বেশি আগে ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিলেন সানাম। দীর্ঘদিন ধরে কাগজপত্র, অনুমোদন, পরীক্ষা ও নিরাপত্তা যাচাইয়ের সব ধাপ পেরিয়ে তিনি পৌঁছেছিলেন শেষ ধাপে—নাগরিকত্বের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে। কিন্তু তার ঠিক দুই দিন আগে ৩ ডিসেম্বর হঠাৎ করেই সরকার সেই অনুষ্ঠান বাতিল করে দেয়।
কোনও ব্যাখ্যা ছাড়া অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ায় প্রথমে বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন সানাম। তিনি বিবিসিকে বলেন, কোনও ভুল না করেও কেন অনুষ্ঠান বাতিল হলো, তা তিনি বুঝতে পারেননি। পরে তিনি জানতে পারেন, সিদ্ধান্তটির পেছনে কারণ ছিল তার জন্মস্থান। এতে তার মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ চেপে বসে।
তিনি বলেন, এটা বছরের পর বছর ধরে চলেছে। আমি ভীষণ ক্লান্ত বোধ করছি। মনে হচ্ছে, আমি কি আদৌ এই প্রক্রিয়াটা চালিয়ে যেতে পারব? এটা খুবই কষ্টকর। এটা সত্যিই হৃদয়বিদারক।
সানাম বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগনে বসবাস করছেন। তার স্বামী ক্যানসাসের একজন মার্কিন নাগরিক। বিবিসি সানামের পরিচয় যাচাই করেছে।
সানামের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। চলতি মাসের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত ১৯টি দেশের অভিবাসীদের নাগরিকত্বের শপথ অনুষ্ঠান বাতিল করা শুরু করে—এর মধ্যে ইরানও রয়েছে।
এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তে সানামের মতো বহু আইনগত স্থায়ী বাসিন্দা অনিশ্চয়তায় পড়েছেন—যারা নাগরিকত্বের সব ধাপ পেরিয়ে কেবল শেষ আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষায় ছিলেন।
এই অভিজ্ঞতার পর সানাম যুক্তরাষ্ট্রে থাকা নিয়ে নতুন করে ভাবছেন। ইরানে তার পরিবার রয়েছে, বিশেষ করে বয়স্ক বাবা-মা। কবে তাদের সঙ্গে দেখা হবে, তিনি জানেন না।
ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞায় প্রভাবিত ১৯ দেশ
শপথ অনুষ্ঠান বাতিল ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন কড়াকড়ির সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলোর একটি মাত্র। ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাভুক্ত ১৯ দেশের অভিবাসীদের ক্ষেত্রে পুরো অভিবাসন প্রক্রিয়াই স্থগিত করা হয়েছে—তারা যে পর্যায়েই থাকুক না কেন।
এই সিদ্ধান্তসহ অন্যান্য পদক্ষেপ আসে ২৬ নভেম্বর ওয়াশিংটন ডিসিতে এক আফগান নাগরিকের গুলিতে ন্যাশনাল গার্ডের এক সদস্য নিহত ও আরেকজন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনার পর। ওই হামলাকে সামনে রেখে প্রশাসন আরও কঠোর ব্যবস্থা নেয়—ডিসিতে অতিরিক্ত ৫০০ ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন, কর্মভিসার মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে ১৮ মাস করা এবং সব আশ্রয় আবেদন সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়।
ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিসেস জানিয়েছে, এসব বিধিনিষেধ জাতীয় নিরাপত্তা, মার্কিন নাগরিকদের জীবন রক্ষা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয়।
তবে নিউ ইয়র্ক ইমিগ্রেশন কোয়ালিশন (এনওয়াইআইসি)–এর নীতিবিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট মারিও ব্রুজোনে বলেন, এসব সিদ্ধান্ত সুরক্ষার প্রয়োজন থাকা অভিবাসীদের ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
তিনি বলেন, অনির্দিষ্টকালের স্থগিতাদেশ মানেই কার্যত নিষেধাজ্ঞা। ডিসির সাম্প্রতিক হামলাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে অভিবাসী ও শরণার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোরতা বাড়ানো হচ্ছে।
নাগরিকত্বের দোরগোড়ায় হতাশ আরেক অভিবাসী
ভেনেজুয়েলার অভিবাসী হোর্হে (ছদ্মনাম)–এর নাগরিকত্বের শপথও বাতিল হয় ২ ডিসেম্বর, অনুষ্ঠানের ২৪ ঘণ্টারও কম সময় আগে, কোনও ব্যাখ্যা ছাড়াই।
তিনি বলেন, সব প্রস্তুত ছিল, ছেলেকে নিয়ে অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথাও ছিল। হঠাৎ আগের দিন বাতিল হওয়ায় পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে কোনও স্পষ্টতা নেই।
বিবিসি তার পরিচয় যাচাই করেছে।
হোর্হে বলেন, অভিবাসীদের ক্ষেত্রে কঠোর যাচাই হওয়া উচিত—এতে তিনি একমত। তিনি মনে করেন, আগের প্রশাসন অতিরিক্ত অভিবাসী প্রবেশের সুযোগ দিয়েছিল এবং ভোটাধিকার পেলে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করতেন।
তবে তার উদ্বেগ হলো—দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে থাকা, কোনও অপরাধ রেকর্ড না থাকা মানুষদেরও এখন একইভাবে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, যারা নিয়ম মেনে সব করেছেন, তারা যেন এগোতে পারেন—আর যারা জালিয়াতি বা অপরাধ করেছেন, তারা যেন আইনি পরিণতি ভোগ করেন, এটাই হওয়া উচিত।
এনওয়াইআইসি জানায়, এই ১৯ দেশের বহু অভিবাসী—শরণার্থী, আশ্রয়প্রার্থী ও স্থায়ী বাসিন্দারা—ইতোমধ্যেই বহু বছর ধরে চলা বহুস্তর নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য যাচাই পেরিয়ে এসেছেন।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, শুধু নিউ ইয়র্ক রাজ্যেই ২০২৩ সালে প্রায় এক লাখ ৩২ হাজার ভেনেজুয়েলায় জন্মগ্রহণকারী মানুষ বসবাস করতেন।
এই স্থগিতাদেশ অভিবাসন প্রক্রিয়ার সব স্তরের মানুষের জীবনকে ব্যাহত করেছে এবং তাদেরকে “চরম অনিশ্চয়তার” মধ্যে ফেলে দিয়েছে বলে জানান ব্রুজোনে।
সানামের স্বামী বলেন, ঘটনাপ্রবাহটি বিস্ময়কর।
তিনি বলেন, যদি ন্যাশনাল গার্ডের ওপর হামলাটা গত সপ্তাহে না হয়ে এই সপ্তাহে হতো, তাহলে আমার স্ত্রী এখন নাগরিক হতেন।
সূত্র: বিবিসি









