চলতি বছরে ইউক্রেনের চালানো সবচেয়ে বড় হামলায় রাশিয়ায় অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। রুশ কর্মকর্তাদের দাবি, হামলায় প্রায় ৮২২টি ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০০টি ড্রোন মস্কো অভিমুখে ছিল।
মস্কোর আঞ্চলিক গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিয়ভ বলেছেন, রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় ড্রোন হামলা হয়েছে। হামলায় রাশিয়ার জনপ্রিয় অনলাইন পণ্য বিক্রেতা ওয়াইল্ডবেরিজের একটি গুদামও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রোস্তভ অঞ্চলের গভর্নর জানিয়েছেন, রাতভর চালানো হামলায় সেখানে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। ইউক্রেন সীমান্তবর্তী বেলগোরোদ অঞ্চলে একটি বেসামরিক বাসে ড্রোন আঘাত হানলে এক নারী নিহত হন। মস্কো অঞ্চলে ড্রোন হামলায় ৮৩ বছর বয়সী এক বৃদ্ধও মারা গেছেন।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানান, রাজধানী থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে কোয়েদিনো এলাকায় ওয়াইল্ডবেরিজের একটি গুদামে হামলা হয়েছে। এতে তিনজন আহত হন। হামলার পর গুদামটিতে আগুন ধরে যায় এবং আকাশে ঘন ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যায়।
রাশিয়ার ‘অ্যামাজন’ হিসেবে পরিচিত ওয়াইল্ডবেরিজের বিভিন্ন স্থাপনা গত জুলাই থেকে একাধিকবার হামলার শিকার হয়েছে। তখন ইউক্রেন জানিয়েছিল, রাশিয়ার সেনাবাহিনীর জন্য সামরিক সরঞ্জাম কেনাকাটা ও সরবরাহের কাজে ব্যবহৃত লজিস্টিক কেন্দ্রগুলো লক্ষ্য করেই এসব হামলা চালানো হচ্ছে।
ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, সর্বশেষ হামলার ফলে ওয়াইল্ডবেরিজের ১০টি বৃহত্তম লজিস্টিক কেন্দ্রের মধ্যে সাতটি অচল হয়ে পড়েছে।
এদিকে রুশ হামলায় ইউক্রেনেও অন্তত সাতজন নিহত এবং ৩৯ জনের বেশি আহত হয়েছেন। ইউক্রেনের জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে একটি বাড়িতে গাইডেড বোমা আঘাত হানলে ৬৬ বছর বয়সী এক পুরুষ ও ৬৪ বছর বয়সী এক নারী নিহত হন।
ডিনিপ্রোপেত্রোভস্কের ক্রিভি রিহ শহরে আরও দুজন নিহত হয়েছেন। সুমি, দোনেৎস্ক ও খেরসন অঞ্চলেও একজন করে নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সুমিতে ড্রোন হামলায় নিহত ব্যক্তির বয়স ছিল ৫১ বছর।
রাজধানী কিয়েভে রাতভর চারবার বিমান হামলার সতর্কসংকেত বাজানো হয়। রুশ হামলায় সেখানে অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে একটি শিশুও রয়েছে বলে জানিয়েছেন মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো।
রাশিয়া জানিয়েছে, শনিবার রাতে কিয়েভে তাদের হামলার লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের ‘ফায়ারপয়েন্ট’ নামের একটি স্থাপনা, যেখানে ইউক্রেনের ফ্লামিঙ্গো ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ তৈরি হয়। পাশাপাশি ড্রোনের বিভিন্ন উপাদান তৈরির একটি কারখানাও হামলার লক্ষ্য ছিল বলে দাবি করেছে মস্কো।
হামলায় কিয়েভের পোচাইনা এলাকার একটি বইয়ের বাজারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে আগুনে পুড়ে যাওয়া বই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা গেছে।
বিবিসিকে ৬৯ বছর বয়সী ভ্যালেন্তিনা নামে এক নারী বলেন, বাজারে তার স্বামীর একটি দোকান ছিল। ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, রাস্তায় পড়ে থাকা বইগুলো তার স্বামীর দোকানের এবং মেঝেতে পড়ে থাকা বই দেখেই তিনি সেগুলো চিনতে পারছেন।
ভিনাইল রেকর্ডের দোকানের মালিক ৪২ বছর বয়সী লুবাও হামলায় বড় ধরনের ক্ষতির কথা জানিয়েছেন। তার প্রায় ৫ লাখ ইউক্রেনীয় হৃভনিয়া মূল্যের পণ্য নষ্ট হয়েছে। ধ্বংস হওয়া অনেক ভিনাইল রেকর্ড বিরল ও পুনরায় পাওয়া সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, চলতি সপ্তাহে দেশটির ১৩টি অঞ্চল রাশিয়ার হামলার শিকার হয়েছে। এ সময়ে রাশিয়া ১ হাজার ৫৫০টির বেশি আক্রমণাত্মক ড্রোন, প্রায় ১ হাজার ৫৬০টি গাইডেড বোমা এবং ৬২টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
জেলেনস্কির অভিযোগ, রাশিয়া যেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত হানতে পারে, সেখানেই বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে।
রুশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে ইউক্রেন দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করে আসছে। তবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র নিজস্ব প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের বড় অংশ ব্যবহার করায় ইউক্রেনকে আরও সরবরাহ করতে অনাগ্রহী ওয়াশিংটন।
জুলাইয়ের শুরুতে ইউক্রেনকে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পরে অবশ্য তিনি এমন প্রযুক্তি ‘দিয়ে দেওয়ার’ বিষয়ে কোনো চুক্তি হয়নি বলে মন্তব্য করেন।
যুদ্ধের পুরো সময়জুড়েই পশ্চিমা সহযোগিতার পাশাপাশি নিজস্ব প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে ইউক্রেন। দেশটির তৈরি ড্রোন ব্যবহার করে রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরেও হামলা চালানো হচ্ছে।
ইউক্রেনের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী মিখাইলো ফেদোরভ সিবিএস নিউজকে জানিয়েছেন, তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে ইউক্রেন নিজস্বভাবে তৈরি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়ায় হামলা চালাতে সক্ষম হবে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি









