মরক্কোয় জেন-জি বিক্ষোভ, প্রকাশ্যে আসছে অর্থনৈতিক বৈষম্য

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৬ অক্টোবর ২০২৫, ২০:০১আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৫, ২০:০১

মরক্কোয় সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভ দেশটির অর্থনৈতিক অগ্রগতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা দারিদ্র্য ও সামাজিক বৈষম্যের বাস্তব চিত্র প্রকাশ্যে আসছে। আগামী ২০৩০ বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি, নতুন স্টেডিয়াম ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পের মাঝেই দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এ অস্থিরতা সরকারকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।

গত সপ্তাহে রাজধানী রাবাতসহ মরক্কোর প্রধান শহরগুলোতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরে তা গ্রামীণ ও দূরবর্তী এলাকাগুলোতে দাঙ্গায় রূপ নেয়। নিরাপত্তা সদর দফতর দখলের চেষ্টার সময় পুলিশের গুলিতে তিনজন নিহত হন, আটক হন ৪০০ জনের বেশি। পরে সহিংসতা কিছুটা প্রশমিত হয়।

এটি ২০১১ সালের আরব বসন্তের পর সবচেয়ে বড় আন্দোলন। ওই সময় রাজা মোহাম্মদ ষষ্ঠ সংসদের হাতে কিছু ক্ষমতা হস্তান্তর করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ২০১৬ সালের রিফ অঞ্চলের বিক্ষোভের পর এটিই সবচেয়ে সহিংস ঘটনা।

মরক্কো দীর্ঘদিন ধরে তেলবিহীন আরব দেশগুলোর মধ্যে উন্নয়নের এক উদাহরণ হিসেবে পরিচিত। দেশটি সড়ক, রেল, বন্দর, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উৎপাদন খাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। সরকার বলছে, দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নেমেছে এবং কিছু উপকূলীয় অঞ্চলের জীবনমান ইউরোপের সমান।

দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানায়, চলতি বছর জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৬ শতাংশে পৌঁছাবে, যা গত বছরের ৩.৮ শতাংশের চেয়ে বেশি। এমনকি গত মাসে এসঅ্যান্ডপি মরক্কোকে ‘ইনভেস্টমেন্ট গ্রেড’ মর্যাদা দিয়েছে।

তবু সাধারণ মানুষ বলছেন, উন্নয়নের সুফল সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। তাদের প্রধান দাবি, ভালো স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাব্যবস্থা। অনেকেই সরকারের বিশ্বকাপ প্রস্তুতির ব্যয়বহুল প্রকল্পের সঙ্গে তা তুলনা করছেন। দক্ষিণের উপকূলীয় শহর আগাদিরে সম্প্রতি আট নারীর প্রসবজনিত মৃত্যুর পর হাসপাতালের সামনে স্লোগান ওঠে, ‘আমরা বিশ্বকাপ চাই না, আগে স্বাস্থ্য চাই।’

২৪ বছর বয়সী মেডিক্যাল শিক্ষার্থী নাজি আচৌই বলেন, আমি প্রতিদিন দেখি, সরকারি হাসপাতালে সরঞ্জামের অভাবে দরিদ্ররা কষ্ট পাচ্ছেন। সিটি স্ক্যানের মতো সাধারণ যন্ত্রও নেই।

দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিষদের (সিইএসই) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী মরক্কোর এক-চতুর্থাংশ তরুণ কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নয়।

প্রথমে সরকার বিক্ষোভ ঠেকাতে কঠোর অবস্থান নেয়। র‍্যালি নিষিদ্ধ করা হয়, পুলিশ ছত্রভঙ্গ করে দেয় জমায়েত। কিন্তু পরে যখন কর্তৃপক্ষ আলোচনায় আগ্রহী হয়, তখন পর্যন্ত শতাধিক গাড়ি ও ভবন, ব্যাংক ও একটি পুলিশ স্টেশন পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আগদিদ বলেন, সরকার বাস্তবতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে। অকার্যকর নীতির ভার নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর পড়েছে।

এই বিক্ষোভের পেছনে ছিল ‘জেনজি টুওয়ানটু’ নামের এক অজ্ঞাত অনলাইন সংগঠন। যারা ডিসকর্ড, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তরুণদের সংগঠিত করে। তাদের ডিসকর্ড সার্ভারের সদস্য এক সপ্তাহে ৩ হাজার থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৮৮ হাজারে।

দক্ষিণাঞ্চলের কৃষি অঞ্চল আইত আমিরায় বিক্ষোভ ছিল সবচেয়ে সহিংস। তিন দশকে এ অঞ্চলের জনসংখ্যা ২৫ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ১৩ হাজারে পৌঁছেছে। মৌসুমি শ্রমিকদের আগমন, বেকারত্ব ও অবৈধ নির্মাণে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে।

সমাজবিজ্ঞানী খালিদ আলাইউদ বলেন, আইত আমিরা ছিল এক বিস্ফোরণের অপেক্ষায় থাকা বারুদের স্তূপ।

দেশটিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থা কমছে। মরক্কো ইনস্টিটিউট ফর পলিসি অ্যানালাইসিসের এক জরিপে দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলের প্রতি আস্থা এক বছরে ৫০ শতাংশ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ শতাংশে।

সহিংসতা প্রশমনের পর সরকার এখন সমঝোতার পথে হাঁটছে। শ্রমমন্ত্রী ইউনেস সেক্কুরি বিক্ষোভকারীদের দাবিকে ‘সৎ ও বাস্তবসম্মত’ বলেছেন। প্রধানমন্ত্রী আজিজ আখানুশও জানিয়েছেন, ‘সংলাপই একমাত্র পথ।’

অনেকে এখন রাজা মোহাম্মদ ষষ্ঠের সংসদ উদ্বোধনী ভাষণের অপেক্ষায় আছেন। তরুণদের সংগঠন জেনজি টুওয়ানটু এক বিবৃতিতে ২০১৭ সালে রাজার একটি উক্তি উদ্ধৃত করেছে। ওই উক্তিতে রাজা কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘হয় আপানারা নিজেদের দায়িত্ব পুরোপুরি পালন করুন, অথবা সরে যান।’ এই উক্তিই আজ মরক্কোর তরুণ প্রজন্মের প্রতিবাদের মর্মবাণী হয়ে উঠেছে।

 

/এএ/
সম্পর্কিত
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নে মার্কিন চাপ মানছে না ওমান
রাস্তায় তোশক আর মুখে মুখ, দিল্লির আগুনে যেভাবে ‘হিরো’ হলেন স্থানীয়রা
সর্বশেষ খবর
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ট্রাফিক আইন সবার জন্য সমান, পুলিশ সদস্য হলেও ব্যবস্থা: ডিএমপি কমিশনার
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
ফ্রিল্যান্সারদের আয় থেকে সাড়ে ৭ শতাংশ কর কাটা নিয়ে যা বলছে এনবিআর 
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের আয়ে ৭.৫% কর নেওয়ার অভিযোগ, স্পষ্ট করার দাবি সারজিসের
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের