ধনকুবের ইলন মাস্ক যুক্তরাষ্ট্রের এক ডজনেরও বেশি ফেডারেল এজেন্সিতে প্রভাব বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হোয়াইট হাউজের কিছু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। চার সূত্রের বরাতে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কিছু শীর্ষ সহকারী মাস্কের দলের পক্ষ থেকে আরও সমন্বয় চাইছেন। কারণ তিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কর্মীসংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনছেন।
ট্রাম্পের চিফ অব স্টাফ সুজি উইলস ও তার দল কখনও কখনও নিজেদের আলোচনার বাইরে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। কারণ মাস্কের তথাকথিত ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি (ডোজ) হাজার হাজার ফেডারেল কর্মী ছাঁটাই করার পাশাপাশি সংবেদনশীল ডেটা অ্যাক্সেস করছে এবং সরকারি কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। এক সূত্র জানিয়েছে, উইলস ও তার কিছু শীর্ষ সহকারী সম্প্রতি মাস্কের সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলেছেন।
মঙ্গলবার হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মাস্ক নিজেকে, তার ঘনিষ্ঠ ডোজ কর্মীদের এবং ট্রাম্পের মধ্যে সমন্বয় থাকার কথা জানান। তবে হোয়াইট হাউজের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে উত্তেজনা ট্রাম্পের জন্য সম্ভাব্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। কারণ তিনি তার মূল দল ও মাস্কের ডোজ কর্মীদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছেন। ডোজ কর্মীরা কংগ্রেসের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছে এবং একের পর এক মামলার মুখোমুখি হয়ে ফেডারেল এজেন্সিগুলোতে ব্যাপক পুনর্গঠন করছে।
সূত্রটি জানিয়েছে, সম্প্রতি আলোচনায় উইলস ও তার দল মাস্ককে একটি বার্তা দিয়েছেন: আমাদের এই সবকিছু জানানো দরকার। আমাদের আলোচনায় রাখতে হবে।
রয়টার্স এই আলোচনার সঠিক তারিখ বা মাস্কের কোনও পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে পারেনি। সূত্রটি আরও জানিয়েছে, ট্রাম্প নিজে দাতা ও অন্যান্যদের কাছে মাস্ক সম্পর্কে ইতিবাচক কথা বলছেন।
মাস্ক মন্তব্য করার জন্য অনুরোধের জবাব দেননি। হোয়াইট হাউজও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে বিষয়টি সম্পর্কে জ্ঞাত একজন কর্মকর্তা সূত্রগুলোর বর্ণনাকে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, প্রাথমিক কার্যক্রমগত সমস্যাগুলোর সমাধান করা হয়েছে। তিনি জানান, মাস্ক দিনের শেষে উইলসকে রিপোর্ট পাঠান এবং তারা প্রায় প্রতিদিন ফোনে কথা বলেন।
মঙ্গলবার ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, যা মাস্কের ফেডারেল আমলাতন্ত্রের ওপর ক্ষমতা বাড়িয়েছে। এই আদেশে ফেডারেল এজেন্সিগুলোকে ডোজের সঙ্গে কাজ করে কর্মীসংখ্যা ব্যাপকভাবে কমাতে এবং নিয়োগ সীমিত করতে বলা হয়েছে। আদেশে প্রতিটি সরকারি এজেন্সিতে ‘টিম লিডার’ নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। যারা সব নিয়োগের সিদ্ধান্ত তদারকি করবেন।
হোয়াইট হাউজের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট সাংবাদিকদের বলেছেন, এটি একটি ঐক্যবদ্ধ দল। ইলন মাস্ক প্রেসিডেন্টের সন্তুষ্টির জন্য কাজ করছেন। এই দলের অন্যান্য সদস্যদের মতোই তিনি সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্টের নির্দেশনা মেনে চলেন।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় মাস্ক নিজের ভূমিকা নিয়ে বলেছেন, তিনি একজন নির্বাচিত কর্মকর্তা নন। কিন্তু রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট তাকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কিছু অংশ ভেঙে ফেলার জন্য অভূতপূর্ব ক্ষমতা দিয়েছেন। তিনি বলেন, তিনি প্রায় প্রতিদিন ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলেন এবং তার কাজ জনগণ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে।
তবে ডোজ গভীর গোপনীয়তার মধ্যে কাজ করছে। তারা তাদের কর্মী, কার্যক্রম বা সরকারি এজেন্সিতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, সে সম্পর্কে প্রায় কোনও তথ্য দিচ্ছে না। তারা তাদের কাজ সম্পর্কে খুব কম তথ্য প্রকাশ করে। শুধু নির্দিষ্ট এজেন্সিতে কত ডলার সাশ্রয় হয়েছে, তার পরিসংখ্যান দেয়। ডোজ কর্মীরা অন্তত ১৫টি এজেন্সিতে প্রবেশ করে সংবেদনশীল ডেটা অ্যাক্সেস করেছে, যা ফেডারেল কর্মীদের হতবাক করেছে। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, একজন বিশেষ সরকারি কর্মী হিসেবে মাস্কের আর্থিক তথ্য প্রকাশ করা হবে না।
চার সূত্রের মধ্যে একজন জানিয়েছে, উইলস মাস্কের সরকারি এজেন্সি ভেঙে ফেলার প্রচেষ্টা বা ফেডারেল কর্মীসংখ্যা কমানোর বিষয়ে বিরক্ত নন। বরং তার পদ্ধতিতে অসন্তুষ্ট। ট্রাম্পের ২০২৪ সালের নির্বাচনি প্রচারণার দুই ম্যানেজারের একজন উইলস চান মাস্ক ও ডোজ তার দলকে অবহিত রাখুক এবং আরও সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করুক।
চতুর্থ সূত্র, যিনি হোয়াইট হাউজের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুক্ত, তিনি এই উত্তেজনাকে আরও গুরুতর বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, উইলসের অধীনস্থরা মাস্কের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ প্রকাশিত তথ্য সম্পর্কে অস্বস্তি প্রকাশ করেছেন। যা হোয়াইট হাউজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যাচাই করার আগেই প্রকাশ করা হয়েছে।
একটি বিতর্কের বিষয় হলো মাস্কের সহযোগীদের পাঠানো কিছু ইমেইল। যার মধ্যে ২৮ জানুয়ারির একটি বার্তায় ২০ লাখ ফেডারেল কর্মীকে আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে চাকরি ছাড়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। চার সূত্রের মধ্যে একজন এবং ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ পঞ্চম সূত্র জানিয়েছে, উইলস ও তার দল এই ইমেইলগুলোর অনুমোদন দেননি।
অবশ্য ট্রাম্পের অনেক ঘনিষ্ঠ মিত্র ও হোয়াইট হাউজের সহকারী মাস্কের আপসহীন ধাঁচের প্রক্রিয়ায় আনন্দিত বলে মনে হচ্ছে। তবে রয়টার্সের সাক্ষাৎকার অনুযায়ী, তার সমর্থন সর্বসম্মত নয়।
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি মাস্ক গত বছর ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচারণায় ২৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ব্যয় করেছেন। ট্রাম্পের নভেম্বরে বিজয়ের পর মাস্ক ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটাতে শুরু করেন। তিনি মাস্ককে অসাধারণ বলে অভিহিত করেছেন এবং ডোজ কর্মীদের ‘সুপার জিনিয়াস’ দল হিসেবে প্রশংসা করেছেন।
চিফ অব স্টাফ হিসেবে উইলস ওয়াশিংটনের শীর্ষ ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের একজন। তার নেতৃত্বে ট্রাম্পের সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি প্রচারণাকে তার সবচেয়ে শৃঙ্খলাবদ্ধ প্রচারণা হিসেবে প্রশংসা করা হয়। তিনি আত্মপ্রচার এড়িয়ে চলেন, এমনকি ট্রাম্পের বিজয়ের রাতে জনতার সামনে কথা বলার আমন্ত্রণও প্রত্যাখ্যান করেন। একাধিক হোয়াইট হাউজ কর্মকর্তা বলেছেন, তারা কখনও তাকে উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনেননি। তিনি প্রায়ই ট্রাম্পের পাশে থাকেন, এমনকি এয়ার ফোর্স ওয়ানে ভ্রমণের সময়ও। সম্প্রতি ক্যালিফোর্নিয়ায় এক সফরে ক্যামেরা তার দিকে ঘুরলে তিনি সরে যান।
অন্যদিকে, মাস্ক তার কাজের জন্য তীব্র, স্বাধীনচেতা পদ্ধতি এবং আলোচনার প্রতি উৎসাহের জন্য পরিচিত। তিনি প্রায়ই তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দিনে কয়েক ডজন পোস্ট করেন, ব্যবহারকারীদের পরামর্শ নেন এবং সপ্তাহান্তে কাজ করার প্রবণতার কথা জানান।









