গোটা বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ১৮০টি ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রা চালু রয়েছে। কিন্তু যখনই আন্তর্জাতিক বা বৈশ্বিক লেনদেনের বিষয়টি সামনে আসে, তখন পৃথিবীর সিংহভাগ মানুষ কেবল একটি মুদ্রাই ব্যবহার করতে চায়, তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের ডলার।
বিশ্বজুড়ে ডলারের এই একচেটিয়া অবস্থান আমেরিকার জন্য এক অনন্য বৈশ্বিক ক্ষমতা এবং একই সঙ্গে বড় ধরনের দায়িত্বের উৎস। আগামী দশকগুলোতে বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার ভূমিকা কেমন হবে, তা মূলত নির্ভর করবে বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই ডলারের আধিপত্য বজায় রাখা এবং তা বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিচালনা করার ক্ষমতার ওপর। তবে মুদ্রাবাজারে মার্কিন ডলারের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে যে সীমাহীন ক্ষমতা পুঞ্জীভূত হয়েছে, তা নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলো দিন দিন ক্রমেই ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত হয়ে উঠছে। আর এ কারণেই তারা এখন ডলারের বিকল্প খুঁজতে মরিয়া।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থায়নে ডলারের এই নিরঙ্কুশ আধিপত্য যুক্তরাষ্ট্রকে কোনও ধরনের গুলি না ছুড়েই নিজের ভূখণ্ড থেকে হাজার হাজার মাইল দূরেও নিজের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা দেয়।
আমেরিকার এই ক্ষমতার প্রকাশ তখনই স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যখন তারা ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য করার অপরাধে ইউরোপীয় ব্যাংকগুলোকে বড় অঙ্কের জরিমানা করে কিংবা আন্তর্জাতিক মূলধারার আর্থিক ব্যবস্থা থেকে রাশিয়ার তেল কোম্পানিগুলোকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এ ছাড়া ডলারের এই দাপট মার্কিন ট্রেজারি বন্ড বা ঋণের বৈশ্বিক চাহিদাকে প্রতিনিয়ত চাঙ্গা রাখছে, যার ফলে যেকোনও বড় সংকটের মুহূর্তেও যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ববাজার থেকে বিশাল অঙ্কের অর্থ ঋণ নেওয়ার সুবিধা পেয়ে থাকে।
ডলারের এই শ্রেষ্ঠত্ব একদিনে তৈরি হয়নি। এটি মূলত বিগত কয়েক দশক, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে কয়েক শতাব্দী ধরে তৈরি করা এক আন্তঃসম্পর্কিত নীতিগত পছন্দ এবং কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।
এর মধ্যে অন্যতম হলো ‘ইউরোডলার’ ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে মার্কিন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেও বৈশ্বিক ব্যাংকগুলোকে ডলার তৈরি এবং তা বাজারে সঞ্চালন করার বিষয়টি কেবল মেনেই নেয়নি, বরং উৎসাহিতও করেছে। এমনকি যেকোনো বড় আর্থিক সংকটের সময় মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ বিশ্বের অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় চুক্তি চালুর মাধ্যমে এই পুরো ব্যবস্থাকে শক্তভাবে ধরে রেখেছে।
একই সঙ্গে, নিরাপদ সরকারি বন্ড বা ঋণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও গভীর বাজার। সেই সঙ্গে দেশটির রয়েছে একটি উন্মুক্ত মূলধন হিসাব, যার অর্থ হলো আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা আইনিভাবেই যেকোনো সময় মার্কিন বিনিয়োগে তাদের অর্থ নিয়ে আসতে বা সেখান থেকে সরিয়ে নিতে পারেন। ফলে যেসব দেশ বিশাল আকারে তাদের আর্থিক রিজার্ভ বা তহবিল সংরক্ষণ করতে চায়, তাদের জন্য মার্কিন বাজার ছাড়া আর কোনও নির্ভরযোগ্য বিকল্প নেই বললেই চলে। এ ছাড়া আমেরিকা দীর্ঘকাল ধরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ আমদানিকারক দেশ এবং পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রক। ফলে অন্য দেশগুলোর জন্য বাণিজ্যে ডলার ব্যবহার করা একাধারে যেমন সুবিধাজনক, তেমনই এটি বড় ধরনের নিরাপত্তা বলয়ও তৈরি করে।
গত মাসে রেগান ন্যাশনাল ইকোনমিক ফোরাম-এ জেপিমরগান-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জেমি ডাইমন এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, যদি আপনাকে আপনার সব অর্থ কেবল একটি দেশে রাখার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে সেটি কোন দেশ হবে? নিশ্চিতভাবেই এমন একটি দেশ, যা আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগর, মার্কিন সামরিক বাহিনী এবং আইনের শাসন দ্বারা সুরক্ষিত, আর সেটি হলো একমাত্র যুক্তরাষ্ট্র।
তবে ডলারের এই একচ্ছত্র আধিপত্যের কিছু মূল ভিত্তি এখন বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। আমেরিকার আকাশচুম্বী রাজস্ব ঘাটতির অর্থ হলো বিশ্বের বাজারগুলো এখন মার্কিন ট্রেজারি ঋণে তলিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি ফেডারেল রিজার্ভের রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এমনকি খোদ ট্রাম্প প্রশাসনের অনেকেই ডলারের এই বৈশ্বিক আধিপত্য বজায় রাখার খরচকে মার্কিন জনগণের জন্য একটি বড় ‘বোঝা’ হিসেবে দেখছেন।
সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারণ হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখন অর্থনৈতিক যুদ্ধের একটি সর্বজনীন অস্ত্র হিসেবে ডলার-ভিত্তিক বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার বন্ধের হুমকিকে বারবার ব্যবহার করছে। এর ফলে আমেরিকার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো (যেমন: চীন, রাশিয়া) এবং বন্ধুভাবাপন্ন বা জোটের বাইরের দেশগুলো (যেমন: ভারত, ব্রাজিল) এখন ডলারের বাইরে অন্য কোনও বিকল্প খুঁজে পাওয়ার জন্য অত্যন্ত উদগ্রীব হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের অন্য বড় শক্তিগুলো ডলারের বিকল্প তৈরি করতে চাইলেও, এখন পর্যন্ত তাদের সেই সদিচ্ছা বা সক্ষমতার চরম অভাব দেখা যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপীয় দেশগুলো এখন পর্যন্ত এমন একটি সমন্বিত সার্বভৌম ঋণ বাজার গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে গত দুই শতাব্দী ধরে অত্যন্ত সফলভাবে বিদ্যমান রয়েছে।
অন্য দিকে চীনারা তাদের মূলধন হিসাব অ্যাকাউন্ট উন্মুক্ত করতে সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক। কারণ মুক্তভাবে দেশে অর্থ আসা-যাওয়ার সুযোগ দিলে অর্থনীতির ওপর থেকে তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বড় ভয় রয়েছে। চীন অবশ্য বিদেশে তাদের মুদ্রা ‘রেনমিনবি’ বা ইউয়ানের ব্যবহার বাড়াতে বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে মুদ্রা বিনিময়ের সুযোগ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে, কিন্তু অন্যান্য দেশগুলোর কাছে মনে হয়েছে যে মার্কিন ডলারের চেয়েও চীনের এই ব্যবস্থায় অনেক বেশি ভূ-রাজনৈতিক শর্ত বা অদৃশ্য সুতো যুক্ত রয়েছে। তদুপরি, ইউরোডলারের মতো বিশ্বের অন্যান্য দেশের ব্যাংকগুলো নিয়মিতভাবে চীনা মুদ্রা বিশ্ববাজারে সরবরাহ করবে, এমন একটি ব্যবস্থা চীনারা সহজে মেনে নেবে, তা কল্পনা করাও কঠিন।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, নেটওয়ার্কের একটি শক্তিশালী প্রভাব রয়েছে। সহজ কথায়, সবাই ডলার ব্যবহার করে কারণ বাকি সবাইও ডলারই ব্যবহার করছে।
গ্রিনব্যাক বা মার্কিন ডলারের নতুন ইতিহাস নিয়ে লেখা ‘দ্য অলমাইটি ডলার: ৫০০ ইয়ার্স অব দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট পাওয়ারফুল মানি’ বইয়ের লেখক ব্রেন্ডন গ্রিলি বলেন, আমি এমন কিছু দেখছি না যা এই ডলার সিস্টেমকে প্রতিস্থাপন করতে পারে। আমার মনে হয় ডলার হয়তো খোদ যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও বেশি দিন টিকে থাকবে, তবে এর অর্থ এই নয় যে আমি কোনোভাবে আমেরিকার পতন বা শেষ হওয়ার পূর্বাভাস দিচ্ছি।
মূল কথা হলো, আমেরিকার প্রতিদ্বন্দ্বীরা বর্তমান পরিস্থিতি পছন্দ না করলেও, বিশ্ববাজারে মার্কিন ডলারের অবস্থান আপাতত সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে বিশ্বজুড়ে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ও অস্বস্তি ক্রমান্বয়ে দানা বাঁধছে। আর ইতিহাস সাক্ষী, ডাচ বা ব্রিটিশরা বহু আগেই যা টের পেয়েছিল, তা হলো কোনও মুদ্রার আধিপত্যই চিরকাল স্থায়ী হয় না।
সূত্র: অ্যাক্সিওস









