যুক্তরাষ্ট্রের পাশে না দাঁড়ালে মিত্র হলেও রেহাই নেই, ট্রাম্পের স্পষ্ট বার্তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৮ আগস্ট ২০২৬, ১৭:১৪আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ১৭:১৪

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সহযোগীদের জন্য একটি নতুন নীতি কার্যকর করেছেন: একটি ক্ষেত্রে কোনও দেশ ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত না মানলেই সেটির মাশুল গুণতে হবে অন্য ক্ষেত্রেও। নিজের দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে মিত্রদের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করে চলেছে এবং তাদের অপমান করছে, ইরান যুদ্ধ সে প্রবণতাকে আরও ঘনীভূত করেছে। যে সব মিত্র দেশ এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দেয়নি বা দূরে থেকেছে, তাদের ওপর ক্ষোভ বাড়ছে ট্রাম্পের। সংঘাত অবসানে টানাপোড়েনের মাঝেই শাস্তি হিসেবে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন তিনি।

সম্প্রতি প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যাকে ‘আদর্শ মিত্র’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন, সেই দক্ষিণ কোরিয়াই ট্রাম্পের এই প্রতিশোধমূলক নীতির নতুন ও অপ্রত্যাশিত শিকার হয়েছে। গত রবিবার পেন্টাগনকে মার্কিন-দক্ষিণ কোরিয়া যৌথ বার্ষিক সামরিক মহড়া ‘উলচি ফ্রিডম শিল্ড’ নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনার নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। এর পেছনে অতিরিক্ত খরচ এবং উত্তর কোরিয়ার স্বৈরশাসক কিম জং উনের সঙ্গে তার ‘অত্যন্ত ভালো সম্পর্কের’ কথা তুলে ধরেন তিনি। পারমাণবিক শক্তিধর উত্তর কোরিয়াকে রুখতে দীর্ঘ অর্ধশতক ধরে ওয়াশিংটন ও সিউলের যৌথ প্রতিরোধের অন্যতম মূল স্তম্ভ হিসেবে কাজ করে আসছে এই সামরিক মহড়া।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে জানান, আমি সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টকে আমাদের সঙ্গে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ অভিযানে যোগ দিতে বলেছিলাম, তারা উত্তরে বলেছে, ‘না, ধন্যবাদ!’ এরপর সোমবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেন, আমরা এসব দেশকে রক্ষা করে বেড়াতে পারি না, বিশেষ করে যখন আমাদের সাহায্যের প্রয়োজন হলে তারা এগিয়ে আসে না।

কয়েক বছর ধরেই ইউরোপীয় মিত্ররা ট্রাম্পের এই জোটবিরোধী অবস্থানের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে আসছে। তবে ইরান যুদ্ধ আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পারের সংঘাতকে আরও উন্মুক্ত করায় ট্রাম্পের এই চাপ সৃষ্টির নীতি আরও পদ্ধতিগত রূপ নিয়েছে।

ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে অবস্থানরত মার্কিন সেনা মোতায়েন রাখা হবে নাকি প্রত্যাহার করা হবে, তা পর্যালোচনার অংশ হিসেবে ন্যাটোভুক্ত মিত্রদের একটি প্রশ্নমালা পাঠিয়েছে পেন্টাগন। সেখানে ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির প্রতি তাদের অনুগত থাকার মাত্রা পরীক্ষা করা হচ্ছে। এই প্রশ্নাবলীতে মার্কিন সামরিক কার্যক্রমে সহায়তা, অস্ত্র কেনা এবং বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে কতটুকু সঙ্গতি রাখা হয়েছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে।

যেসব মিত্র দেশ অনুগত থাকার নীতি থেকে কিছুটা সরে এসেছে, তাদের ইতোমধ্যে চরম মাশুল গুণতে হয়েছে। চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস প্রকাশ্যে ট্রাম্পের ইরান কৌশলের তীব্র সমালোচনা করার পর গত মে মাসে জার্মানি থেকে প্রায় ৫ হাজার সেনা প্রত্যাহারের পদক্ষেপ নেয় পেন্টাগন। ইরান অভিমুখে সামরিক হামলার জন্য মার্কিন বাহিনীকে নিজেদের ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় স্পেনের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য বন্ধের হুমকি দেন ট্রাম্প। এর কিছুদিন পরেই পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা স্পেনকে ন্যাটো থেকেই সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

এমনকি হরমুজ প্রণালি সংকট সমাধানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা দীর্ঘদিনের বন্ধুদেশ ওমানও ট্রাম্পের নজর এড়াতে পারেনি। গত সোমবার তিনি হুমকি দিয়ে বলেন, ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত চুক্তির পথে যদি ওমান ‘বাধা সৃষ্টি’ করে তবে দেশটি তিনি ‘বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেবেন’।

যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের সীমাবদ্ধতাও এই যুদ্ধ প্রক্রিয়ায় ফুটে উঠছে। ইরান এবং ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া ৬০ দিনের চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির মেয়াদ গত সোমবারে শেষ হলেও কোনও চুক্তি অর্জিত হয়নি। গত জুনে দুই দেশের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের তুলনায় বর্তমানে দুই পক্ষ সমঝোতা থেকে আরও অনেক দূরে অবস্থান করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মাসের পর মাস ধরে চলা সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি স্বাভাবিক করা যায়নি। অথচ ট্রাম্প দাবি করছেন, জলপথটি এখন পুরোপুরি ‘উন্মুক্ত’ এবং এটি শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত হতে পারে।

অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে মার্কিন সামরিক চাপ সামাল দিতে গিয়ে মার্কিন নৌবাহিনী তাদের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর থেকে প্রত্যাহার করে দীর্ঘ দিন ধরে মোতায়েন থাকা ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য পাঠিয়েছে। এর ফলে এশিয়া অঞ্চল সাময়িকভাবে মার্কিন রণতরিহীন হয়ে পড়েছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি এক বিবৃতিতে প্রশাসনের এই অবস্থানকে সমর্থন করে বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সফলভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও বিশ্বমঞ্চে মর্যাদাপূর্ণ স্থানে উন্নীত করেছেন এবং ফলাফল স্পষ্ট, নয়টি যুদ্ধ শেষ হয়েছে, গাজা থেকে বন্দিদের মুক্ত করা হয়েছে, বাণিজ্য চুক্তিগুলো আরও ন্যায্য করা হয়েছে এবং এখন ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে চিরতরে বিরত রাখা হবে।

তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্যায্য আচরণ মেনে নেবেন না। সব কূটনৈতিক সম্পর্ক যেন দ্বিপাক্ষিক ও সমান লেনদেনের ভিত্তিতে হয়, তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে তিনি পূর্বসূরিদের কয়েক দশকের ভুলগুলো শুধরে দিচ্ছেন।

ট্রাম্পের এই কঠোর নীতি মূলত মার্কিন মিত্রদের এই শিক্ষাই দিচ্ছে যে, প্রয়োজনে ওয়াশিংটনকে তারা পাশে নাও পেতে পারে। এই পরিস্থিতি মার্কিন মিত্রদের বিকল্প চিন্তা করতে বাধ্য করছে এবং শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক সম্পর্কের সেই নেটওয়ার্ককেই দুর্বল করে দিচ্ছে, যা এতদিন ধরে মার্কিন বিশ্বশক্তিকে টিকিয়ে রেখেছিল।

সূত্র: অ্যাক্সিওস

/এএ/
সম্পর্কিত
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করার আহ্বান আফগান দূতের
ট্রাম্পের ক্ষমতা কমাতে চায় ডেমোক্র্যাটরা
যুদ্ধ ও কূটনীতিতে জিতেছে ইরান: আরাঘচি
সর্বশেষ খবর
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করার আহ্বান আফগান দূতের
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক জোরালো করার আহ্বান আফগান দূতের
চট্টগ্রামেও নারীদের জন্য চালু হলো গোলাপি বাস, সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা
চট্টগ্রামেও নারীদের জন্য চালু হলো গোলাপি বাস, সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা
আর্জেন্টিনায় জন্ম, ভারতে কোচিং অভিজ্ঞতা নিয়ে মোহামেডানে স্প্যানিশ কোচ 
আর্জেন্টিনায় জন্ম, ভারতে কোচিং অভিজ্ঞতা নিয়ে মোহামেডানে স্প্যানিশ কোচ 
‘টিনি ট্যুরিজম’ কি গণপর্যটনের বিকল্প
‘টিনি ট্যুরিজম’ কি গণপর্যটনের বিকল্প
সর্বাধিক পঠিত
মহিষগুলোর কষ্ট দেখে কষ্ট পেতো গ্রামের লোকও, অবশেষে উদ্ধার
মহিষগুলোর কষ্ট দেখে কষ্ট পেতো গ্রামের লোকও, অবশেষে উদ্ধার
ব্যাংকের বাইরে টাকা জমানোর নতুন সুযোগ, ১০ শতাংশ বরাদ্দ শুধু ব্যক্তিদের 
ব্যাংকের বাইরে টাকা জমানোর নতুন সুযোগ, ১০ শতাংশ বরাদ্দ শুধু ব্যক্তিদের 
লোডশেডিং ও গ্যাস সংকট নিয়ে মিছিল শুরুর আগেই বৈষম্যবিরোধী ৩ নেতা আটক
লোডশেডিং ও গ্যাস সংকট নিয়ে মিছিল শুরুর আগেই বৈষম্যবিরোধী ৩ নেতা আটক
ঢাকায় এসে ক্যানিজিয়া বললেন, পেলে-ম্যারাডোনা-মেসি তিন জনই সর্বকালের সেরা  
ঢাকায় এসে ক্যানিজিয়া বললেন, পেলে-ম্যারাডোনা-মেসি তিন জনই সর্বকালের সেরা  
প্রেম নাকি পরিবারের পছন্দে বিয়ে—কোনটিতে ভালোবাসা বেশি? গবেষণায় চমকপ্রদ তথ্য
প্রেম নাকি পরিবারের পছন্দে বিয়ে—কোনটিতে ভালোবাসা বেশি? গবেষণায় চমকপ্রদ তথ্য