মিয়ানমারের রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ চালানোর ঘটনায় অভিযুক্ত মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ডের সামরিক বাহিনীর যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। যদিও মিয়ানমাকে শুধু মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলা অংশে পর্যবেক্ষক হিসেবে রাখা হবে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গত ২৫ আগস্ট রাখাইনে সহিংসতা জোরালো হওয়ার পর হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ছয় লাখেরও বেশি মানুষ। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এ ঘটনায় খুঁজে পেয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের আলামত। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন এই ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের ‘পাঠ্যপুস্তকীয় উদাহরণ’ আখ্যা দিয়েছে। রাখাইন সহিংসতাকে জাতিগত নিধন আখ্যা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রও। সেই রাখাইনের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা মং মং সো-কে গত মাসে কোনও কারণ উল্লেখ না করেই অন্যত্র স্থানান্তর করে মিয়ানমারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
২২ ডিসেম্বর মার্কিন অর্থ দফতর এক বিবৃতিতে জানায়, মং মং সো নামের ওই জেনারেল রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞে জড়িত। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও দুর্নীতির অভিযোগে আগেই যুক্তরাষ্ট্রের 'কালো তালিকা'য় অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলেন এই সেনা কর্মকর্তা। শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্বাক্ষরিত এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ট্রাম্পের এই নিষেধাজ্ঞার আদেশের মাত্র দুইদিনের মাথায় যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ডের সামরিক মহড়ায় মিয়ানমারকে অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণের খবর আসলো সংবাদমাধ্যমে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক দফতর পেন্টাগনের মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্নেল ক্রিস্টোফার লোগানের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, থাইল্যান্ড তাদের বার্ষিক সামরিক মহড়া ‘কোবরা গোল্ড এক্সারসাইজ’ এ অংশ নেওয়ার জন্য মিয়ানমারকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। ওই মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও থাইল্যান্ডসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের কয়েক হাজার সামরিক সদস্য অংশ নেবে।
লোগান আরও বলেন, ‘মিয়ানমারকে শুধু মানবিক সহায়তা ও দুর্যোগ মোকাবিলা অংশে পর্যবেক্ষক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।’
মিয়ানমারকে আমন্ত্রণ না জানাতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে থাইল্যান্ডকে কোনও চাপ দেওয়া হয়েছিল কিনা জানতে চাইলে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করবেন না বলে জানান পেন্টাগণের কর্মকর্তা লোগান।
রয়্যাল থাই আর্মড ফোর্সের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘মিয়ানমার আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছে কিনা বিষয়টি পরিষ্কার নয়। তবে থাইল্যান্ড তাদের নিয়ে আসতে আগ্রহী।’ সংবাদমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তিনি তার নাম প্রকাশ করতে চাননি।
ওই কর্মকর্তার কাছে রোহিঙ্গাদের উপর নৃশংসতা চালানোর পরও থাইল্যান্ড তাদের আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত কেন নিয়েছে এবং তাদের আলোচনায় বিষয়টি উল্লেখ ছিল কিনা কিনা জানতে চাওয়া হয়। জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনও আলোচনা হয়নি। আমরা ওই বিষয়টি আলাদা করে রেখেছি। আমরা প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ও সামরিক সহযোগিতার উপর জোর দিয়েছি। আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত হতে চাই।’ তিনি বলেন, ‘ওটা রাজনীতি। আমরা সেনা। আর এটা একটা সামরিক মহড়া।’
এই বিষয়ে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বক্তব্য জানতে রয়টার্সর পক্ষ থেকে কয়েকবার চেষ্টা করা হলেও জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় যুদ্ধ কলেজের প্রফেসর যাচারি আবুজা বলেন, সামরিক মহড়ায় মিয়ানমারকে আমন্ত্রণ জানানো ‘ভয়ংকর’ আর এটা মানুষকে ভুল বার্তা দেবে। দক্ষিণ-পূব এশিয়ায় মানবাধিকারসহ নিরাপত্তার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র সরকার তাদের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধন ঘোষণার পর গতকাল (২২ ডিসেম্বর) অর্থ দফতর থেকে এই গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে বাহিনীর এক কমান্ডারকে নিষিদ্ধ তালিকাভুক্ত করেছে। এ অবস্থায় তাদের আমন্ত্রণ জানানো শুধু ভুল মনে হচ্ছে না। বরং এটা আগের পদক্ষেপগুলোকে হালকা করে দেবে।’
‘কোবরা গোল্ড’ থাইল্যান্ডের বার্ষিক সামরিক মহড়া। ২০১৭ সালে এতে অংশগ্রহণকারী ও পর্যবেক্ষক হিসেবে মিয়ানমারসহ ২৯টি দেশ উপস্থিত ছিল। ওই মহড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৬০০ মার্কিন সেনা অংশ নেয়। ২০১৮ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে আবারও ওই মহড়া অনুষ্ঠিত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময় থাইল্যান্ডে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গণতন্ত্রের বিপর্যয়ের অভিযোগ করে আসলেও দেশ দুটি কয়েক দশক ধরে যৌথ সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে। ২০১৪ সালে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা নিলে তাদের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অবস্থার উন্নতি হয়েছে।








