ভারত জুড়ে বিজেপির প্রবল ঢেউয়ে বইছে, ভাঙছে কংগ্রেস। দলটি হিন্দুদের বিরুদ্ধে লড়াই করে ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হচ্ছে বলে দাবি করেছেন বিজেপির ভোট কুশলী প্রশান্ত কুমার। শনিবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) এই দাবি করেছেন তিনি। তিনি আরও বলেন, এই তথ্যে সত্যতা গত দুয়েক বছরে কংগ্রেসের হেভিওয়েট নেতাদের দল ছেড়ে গেরুয়া শিবির যোগ দেওয়ার পরিসংখ্যান দেখলেই সাফ বোঝা যায়।
এই পরিসংখ্যানের সর্বশেষ প্রমাণ কমলনাথ। বিজেপিতে এখনও যোগ না দিলেও তিনি যে গেরুয়া বসন গায়ে জড়ানোর জন্য প্রস্তুত তা তার আচরেণই পরিষ্কার। রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, হিন্দুত্ববাদের জন্যই কংগ্রেস ছেড়েছেন মধ্যপ্রদেশের সাবেক এই মুখ্যমন্ত্রী।
কংগ্রেস ছেড়ে গেরুয়া শিবিরে যাওয়ার প্রবণতা শুরু হয়েছে গুজরাটে কংগ্রেসের অন্যতম নেতা ও সাবেক কংগ্রেস বিধায়ক আল্পেশ ঠাকুরের হাত ধরে। ২০১৯ সালে হাত শিবির ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। এরপর থেকেই গত উনিশের লোকসভা নির্বাচনের পরই কংগ্রেসকে বড় ধাক্কা দেন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া। কমলনাথের সঙ্গে গণ্ডগোলের জেরে ২০২০ সালের জানুয়ারিতে কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি।
এর পর ২০২১ সালে কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন রাহুল গান্ধীর ঘনিষ্ঠ তথা সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জিতিন প্রসাদ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে দলত্যাগ করেন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অশ্বনী কুমার। তিনি প্রথম ইউপিএ সরকারের সিনিয়র মন্ত্রী ছিলেন। একই বছরের মে মাসে কংগ্রেস ছাড়েন গুজরাটে কংগ্রেসের অন্যতম নেতা হার্দিক প্যাটেল। পরে তিনিও বিজেপিতে যোগ দেন। পাঞ্জাবে কংগ্রেসের অন্যতম মুখ ছিলেন সুনীল জাখর। ২০২২ সালে প্রদেশটির তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর প্রকাশ্যে সমালোচনা করে দল থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। এরপরই দলবদল করেন পাঞ্জাবে বিজেপির প্রধান হন।
২০২২ সালে কংগ্রেস ছেড়েছেন আরও এক প্রবীণ নেতা গুলাম নবি আজাদ। প্রধানমন্ত্রী মোদির প্রকাশ্যে গুণগান করে সোনিয়া ও রাহুলদের বিরাগভাজন হন তিনি। বর্তমানে তিনি জম্মু ও কাশ্মীর ডেমোক্র্যাটিক প্রোগ্রেসিভ আজাদ পার্টির নেতা। ২০২৩ এর জানুয়ারির দল ছাড়েন উত্তরপ্রদেশ কংগ্রেসের নেতা আরপিএন সিং। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর নেতৃত্বে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে কোণঠাসা হওয়ার জেরেই পদত্যাগ করেছিলেন তিনি। পরে বিজেপিতে যোগ দেন। প্রবীণ কংগ্রেস নেতা একে অ্যান্টনির ছেলে অনিল অ্যান্টনি গত বছরের জানুয়ারিতে হাত শিবির ছাড়েন এবং একমাস পরইযোগ দেন বিজেপিতে।
গত বছর পরপর কংগ্রেসের কয়েকটি বড় মুখ দল ত্যাগ করেন। গত লোকসভা নির্বাচন তথা ২০১৯ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত একাধিক প্রবীণ নেতা কংগ্রেস ছেড়েছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম কপিল সিব্বল। তিনি গত ১৬ মে কংগ্রেস ত্যাগ করেন এবং এসপি-র সমর্থনে নির্দলীয় হিসেবে রাজ্যসভার সদস্য হন। গত ১৪ জানুয়ারি রাহুল গান্ধীর ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রার দিনই বড় ধরনের ধাক্কা খায় কংগ্রেস। দল ছাড়েন সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মিলিন্দ দেওরা।
শুধু তাই নয়, পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত দশ বছরে বিভিন্ন রাজ্যের ৯ সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেস ছেড়েছেন। তাদের মধ্যে উত্তরাখণ্ডের বিজয় বহুগুণা, ছাত্তিশগড়ের অজিত যোগী, কর্ণাটকের এসএম কৃষ্ণ, মহারাষ্ট্রের নারায়ণ রাণে ও উড়িশার গিরিধর গামাং রয়েছেন। তবে তাদের মধ্যে গামাং সম্প্রতি আবারও কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন।
তবে ১৩ ফেব্রুয়ারি কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন মহারাষ্ট্রের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অশোক চৌহান। ২০২১ সালের ২৫ নভেম্বর কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেন মেঘালয়ের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংমা। মুকুলের সঙ্গে দল ছাড়েন ১১ কংগ্রেস বিধায়কও। মুকুল দলত্যাগ করায় উত্তর-পূর্বের এই রাজ্যে শক্তি হারায় কংগ্রেস।
গুলাম নবির আগে দল ছাড়েন সোনিয়া গান্ধীর ‘আস্থাভাজন’ ও পাঞ্জাবের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরেন্দ্র সিংহ। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পাঞ্জাব কংগ্রেসে অমরেন্দ্রকে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরিয়েছিল কংগ্রেস শীর্ষনেতৃত্ব। ওই বছর নভেম্বরে সোনিয়াকে সাত পাতার চিঠি লিখে দল ছাড়ার কথা ঘোষণা করেন তিনি।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে পাঞ্জাবে বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৈরি করেন নিজের দল ‘পাঞ্জাব লোক কংগ্রেস’। একই বছরের সেপ্টেম্বরে নিজের দলকে বিজেপিতে মিশিয়ে দেন তিনি। মধ্যপ্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী, সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং দীর্ঘদিনের প্রবীণ কংগ্রেস নেতা কমলনাথের বিজেপিতে সম্ভাব্য যোগদান নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। এভাবে লোকসভার আগে একের পর দাপুটে কংগ্রেস নেতার দল ছাড়ায় ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ছে গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি।
সংবাদমাধ্যমকে বিজেপির এক কেন্দ্রীয় নেতা বলেছেন, বিজেপির কাছে কংগ্রেসের দুটি উইকেট ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এরমধ্যে একটি মহারাষ্ট্রের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অশোক চৌহান।
এবার পদ্মে কমল বিকশিত হলে আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসকে নিশানা করা বিজেপির পক্ষে আরও সহজ হয়ে যাবে। তখন জনগণের কাছে এটি পরিষ্কার হয়ে যাবে কংগ্রেস কতটা ভেঙে পড়লে দলটি তাদের সাবেক মুখ্যমন্ত্রীদের ধরে রাখতে পারেনি। এটি ভোটের আগে দেশটির সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক শক্তি বিজেপিকে নিঃসন্দেহ একটি অতিরিক্ত মাইলেজ দেবে।








