ভারতে একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা মার্কিন নারীকে ঘিরে রহস্য এখনও কাটেনি। ললিতা কাইয়ি নামের ৫০ বছর বয়সী এই নারীকে মহারাষ্ট্রের সিন্ধুগড় জেলার একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়। সেখানে তাকে গাছের সঙ্গে শিকল দিয়ে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এই খবর জানিয়েছে।
এক সপ্তাহ আগে, জঙ্গলে ওই নারীর আর্তনাদ শুনতে পান স্থানীয় রাখালরা। এরপর তারা পুলিশকে খবর দিলে তারা এসে শিকল কেটে তাকে উদ্ধার করে।
কাইয়িকে সম্পূর্ণ রুগ্ন অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে তাকে মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সংবাদমাধ্যমকে এসব তথ্য জানিয়েছেন মিজ কাইয়ির চিকিৎসক।
পুলিশের কাছে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে নিজের স্বামীকে অভিযুক্ত করেছেন ভুক্তভোগী। অনাহারে মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য নিজের স্বামীই জঙ্গলে শিকল দিয়ে বেধে রেখেছিল বলে তিনি জানিয়েছেন।
কাইয়ির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুতে অভিযুক্ত ব্যক্তির সন্ধান করছে পুলিশ।
তবে উদ্ধারের সাত দিন পার হয়ে গেলেও কাইয়ির পরিচয় কী, তিনি কীভাবে ওই জঙ্গলে এলেন এবং কেন তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছিল—এ প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও জানা যায়নি।
স্থানীয় এক বাসিন্দা পাণ্ডুরাং গাওকার বিবিসি মারাঠিকে জানিয়েছেন, গরু চড়াতে সেদিন জঙ্গলের কাছে গেলে এক নারীর আর্তনাদ শুনতে পান তিনি। তার বক্তব্যে, ‘জঙ্গলের ভিতর থেকে আমি চিৎকার শুনতে পাই। আওয়াজ শোনে এগিয়ে গেলে ওই নারীকে গাছের সঙ্গে এক পা বাঁধা অবস্থায় দেখি। তিনি জন্তুর মত চিৎকার করছিলেন। আমি অন্য গ্রামবাসীদের ডেকে আনি। পরে পুলিশকে খবর দিই।’
উদ্ধারকৃত ওই নারীর কাছ থেকে মার্কিন পাসপোর্ট পেয়েছে পুলিশ। তার কাছে তামিলনাড়ুর স্থায়ী ঠিকানা সম্বলিত আধার কার্ডও (ভারতীয়দের জাতীয় পরিচয়পত্র) ছিল।
কাইয়ির সঙ্গে ৩১ হাজার রূপি, একটি মোবাইল ফোন এবং ট্যাবলেট অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়। তাই অপরাধের পেছনে চুরির উদ্দেশ্য থাকার সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছে পুলিশ।
বয়ানে স্থানীয়রা বলেছে, জঙ্গলটি বিশাল। কেউ তার চিৎকার না শুনলে ভুক্তভোগী হয়তো কোনও সাহায্যই পেতেন না। তার ভাগ্য সুপ্রসন্ন ছিল যে গাওকার ওইদিন গরু চড়াতে তার কাছাকাছি অবস্থানে গিয়েছিলেন।
পার্শ্ববর্তী রাজ্য গোয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে কাইয়িকে। এর আগে, প্রাথমিকভাবে তাকে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করে পুলিশ।
গোয়া মেডিকেল কলেজের ডিন ড. শিভানান্দ বান্দেকার দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীর পায়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এছাড়া কাইয়ি মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সমস্যায় ভুগছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ড. শিভানান্দ বলেন, ‘ভুক্তভোগী ঠিক কতদিন অনাহারে ছিলেন আমরা তা বলতে পারছি না। তবে তার শারীরিক অবস্থা এখন স্থিতিশীল।’
শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলে কাইয়িকে মহারাষ্ট্রের একটি মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ড. সঙ্ঘমিত্র ফুলে বিবিসি মারাঠিকে বলেন, ‘আপাতত তার স্বাস্থ্যাবস্থা স্থিতিশীল। তিনি খাবার ও ঔষধ গ্রহণ করছেন। অন্যদের সঙ্গে কথাও বলছেন। তবে তিনি শুধু ইংরেজি জানেন।’
পুলিশ জানান, কাইয়ি যুক্তরাষ্ট্রের একজন ব্যালে ড্যান্সার এবং যোগব্যায়াম প্রশিক্ষণার্থী। ধ্যান ও যোগব্যায়াম চর্চার জন্য দশ বছর আগে ভারতের তামিলনাড়ুতে আসেন তিনি। সেখানেই স্বামীর সঙ্গে পরিচয় হয় তার। স্থানীয় গণমাধ্যমে সেই ব্যক্তিকে সতীশ বলে অভিহিত করেছে পুলিশ।
স্থানীয় কিছু সূত্র জানিয়েছে, কাইয়ি গোয়ার একটি হোটেলে দুইদিন অবস্থান করার পর মুম্বাই যান।
তবে সেই জঙ্গলে তিনি কখন ও কীভাবে পৌঁছালেন তা রহস্যই রয়ে গেলো। উদ্ধার হবার পর প্রাথমিকভাবে কথা বলতে অপারগ ছিলেন কাইয়ি। তখন লিখিত বক্তব্যে পেশ করে পুলিশ ও ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। বক্তব্যে নিজের স্বামীকে অভিযুক্ত করেন কাইয়ি। তার দাবি, টানা চল্লিশ দিন শিকলবন্দি ছিলেন তিনি।
তবে পুলিশ তার সব দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। এত দীর্ঘ সময় খাবার ও পানি ছাড়া বেঁচে থাকা তাদের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে।
অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার মামলা দায়ের করেছে পুলিশ। গোয়া, তামিলনাড়ু ও মহারাষ্ট্রের আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এই তদন্তে সহায়তা করছেন।
দিল্লিতে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস এই ঘটনায় গণমাধ্যমে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকছে। ‘ইউএস প্রাইভেসি অ্যাক্ট’ আইনের কারণে দূতাবাসের একজন মুখপাত্র কাইয়ির কোনও ব্যক্তিগত তথ্য দিতে বিবিসির কাছে অপারগতার কথা জানান।








