ইউক্রেনে সেনা ও অস্ত্র পাঠানোর হুমকি দিলো দ. কোরিয়া

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৩ অক্টোবর ২০২৪, ১৫:১৫আপডেট : ২৩ অক্টোবর ২০২৪, ১৫:১৫

ইউক্রেনে অস্ত্র ও সেনা পাঠানোর হুমকি দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তার লক্ষ্যে উত্তর কোরিয়া বিশাল সংখ্যক সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা করছেএমন গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশের পর এই হুমকি দিলো দেশটি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তার বরাতে মঙ্গলবার (২২ অক্টোবর) ইয়োনহোপ বার্তা সংস্থা এই খবর জানিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, দক্ষিণ কোরিয়া ইউক্রেনে ‘প্রতিরক্ষা ও আক্রমণের জন্য অস্ত্র’ পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছে।

যুদ্ধেক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার কৌশল বিশ্লেষণ এবং আটক হওয়া উত্তর কোরীয়দের জিজ্ঞাসাবাদে সহায়তায় করতে সামরিক ও গোয়েন্দা বাহিনীর সদস্যদের ইউক্রেনে পাঠাতে পারে সিউল।

এক বিবৃতিতে রাশিয়া থেকে উত্তর কোরিয়ার সেনাদের ‘অবিলম্বে প্রত্যাহার’ করার দাবি জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। এমনকি ‘পালাক্রমে পাল্টা পদক্ষেপ নেওয়ার’ প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেছে তারা। তবে ঠিক কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে সে বিষয়ে স্পষ্টভাবে কিছু জানানো হয়নি।

সিউলের এই কঠোর সতর্কতার বিষয়টি এমন সময় সামনে এলো যখন ইউক্রেন সংঘাতে উত্তর কোরিয়ার গভীর সম্পৃক্ততা এই অঞ্চলে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

গত সপ্তাহে দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা জানিয়েছিল, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সঙ্গে যোগ দিতে ইতোমধ্যেই বিশেষ বাহিনীর দেড় হাজার সেনা পাঠিয়েছে উত্তর কোরিয়া। এমনকি একটি বিশেষ বাহিনীর মোট ১২ হাজার সেনাকে মোতায়েনের পরিকল্পনাও করছে তারা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো কর্মকর্তারা বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার সেনা মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত নয়। তবে তারা ইউক্রেনে আক্রমণের জন্য পিয়ংইয়ংয়ের গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ এবং উত্তর কোরিয়া-রাশিয়া সামরিক সহযোগিতার নিন্দা করেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই ইউক্রেনকে সরাসরি অস্ত্র সরবরাহের জন্য দক্ষিণ কোরিয়াকে আহ্বান জানিয়ে আসছে পশ্চিমা দেশগুলো। তবে রাশিয়ার সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সামরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হতে পারে এমন আশঙ্কায় এই আহ্বানে সাড়া দেয়নি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অস্ত্র রফতানিকারক দেশ দক্ষিণ কোরিয়া।

কৌশলগত পরিবর্তন

তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, সিউলের সতর্কতা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার সম্পর্ক যেহেতু দিন দিন আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, সেক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার কৌশলগত হিসেবটাও হয়তো পাল্টে যাচ্ছে।

চলতি বছরের শুরুর দিকে শীতল যুদ্ধের সময়কার পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি পূনর্বহাল করে উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়া। ফলে দেশ দুটির মধ্যকার সামরিক সহযোগিতার পথ আরও ব্যাপকভাবে উন্মুক্ত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করবে উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনী। এছাড়া, দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে আর্থিক সহযোগিতার নিশ্চয়তা পাবে এবং ভবিষ্যতে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথ মহড়ার প্রস্তুতি নিবে।

তবে সিউল আশঙ্কা করছে, মস্কোর কাছ থেকে সর্বাধূনিক সামরিক প্রযুক্তি পেতে পারে পিয়ংইয়ং।

সিউলে কাংকুক ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের অধ্যাপক মেসন রিচী বলেন, সম্ভবত এই সব উদ্বেগের কারণেই ইউক্রেনে উত্তর কোরিয়ার সম্পৃক্ততা নিয়ে এ ধরণের কড়া প্রতিক্রয়া জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া।

তিনি বলেন, ‘আমার কাছে সবচেয়ে সহজ ব্যাখ্যাটি হলো, দক্ষিণ কোরিয়া মনে করছে, সেনা মোতায়েনের বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া যথেষ্ট মূল্যবান কিছু পাচ্ছে।’

দক্ষিণ কোরিয়ার হিসাব-নিকাষ

সিউলের অদূরে ডানকুক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক বেন এনগেল বলেন, ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহের পেছনে থাকতে পারে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়ুন সুক ইয়লের পররাষ্ট্র বিষয়ক ‘শক্তির মাধ্যমে শান্তি’ মন্ত্রটি কাজ করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘কোনও রকম প্রতিক্রিয়া না দেখালে তো তাদের খুব শক্তিশালী বলে মনে হবে না। আর ইউক্রেনে অস্ত্র পাঠানোর কাজটা তো কার্যত তারা করছেই। তাই এটি হচ্ছে শক্তি প্রদর্শনের সহজ উপায়।’

এ পর্যন্ত তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে ইউক্রেনকে এই অস্ত্র সরবরাহ করেছে দক্ষিণ কোরিয়া। যেমনঃ দেশটি যুক্তরাষ্ট্র ও পোল্যান্ডকে অস্ত্র দিয়েছে যারা সরাসরি ইউক্রেনকে অস্ত্র সরবরাহ করে।

কর্মকর্তারা অবশ্য অভ্যন্তরীণ আইনে সংঘাতময় এলাকায় অস্ত্র পাঠানোর বিষয়ে বিধিনিষেধের কথা বলে তাদের এই অবস্থানকে সমর্থন করে। তবে এই বাধাগুলো যে পাশ কাটানো যায় এমন আভাসও দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইয়ুন।

ইউক্রেন যুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন দেশটির নেতা কিম জং উন। কিম বলেন, শিগগিরই তিনি এমন আইন চালু করবেন যাতে এই তৎপরতা বন্ধ করা যায়।

কয়েকটি জনমত জরিপে দেখা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার অধিকাংশ মানুষই ইউক্রেনকে অস্ত্র দেওয়ার বিরোধিতা করেন। তবে এ বিষয় দেশটির জনসাধারণের মধ্যে বড় রকমের কোনও বিতর্কের জন্ম হয়নি।

বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, কোনও রকম চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নভেম্বরে মার্কিন নির্বাচনের ফলাফলের দিকে নজর দিবে দক্ষিণ কোরিয়া। কেননা, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তিনি নির্বাচিত হলে ইউক্রেনের প্রতি সমর্থন কমাবেন এবং এই যুদ্ধ শেষ করবেন।

সিউলের ইয়নসেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কূটনৈতিক গবেষণার অধ্যাপক জেফ্রি রবার্টসন বলেন, ‘এই নির্বাচনে ট্রাম্প জয়লাভ করলে বাইডেন ও ন্যাটো ছয় মাস আগে যে আবেদন জানিয়েছিল তাতে ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার কোনও অর্থ হয় না।’

দীর্ঘ মেয়াদি প্রতিক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের মতো রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়াও বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ সতর্ক করেছেন, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যকার কৌশলগত সম্পৃক্ততা আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তার দীর্ঘ মেয়াদী চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফেকেশনে রাশিয়া বিষয়ক গবেষক হিউন সেআং সু বলেন, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যকার সম্পর্ক স্বল্প মেয়াদি সামরিক সহযোগিতাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

হিউন বলেন, ‘মানুষ মনে করছে, উত্তর কোরিয়া শুধু কিছু সেনাই পাঠাবে আর বিনিময়ে দেশটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও কিছু সামরিক প্রযুক্তি পাবে। তবে কিম জং উনের চিন্তাভাবনা এর চেয়েও অনেক বেশি।’

তিনি বলেন, ‘উত্তর কোরিয়ার জন্য রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করা শুধু দেশটিকে সাহায্য করাই নয়, বরং এটিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব পবিত্র যুদ্ধ হিসেবে দেখছে। এমনও হতে পারে, তারা ভাবছে, যুদ্ধে তারা রাশিয়ার সঙ্গে একসাথে বাঁচবে, লড়াই করবে এবং মরে যাবে।’

তবে এই ব্যাপক জোট দক্ষিণ কোরিয়ার ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন হিউন।

তিনি আরও বলেন, ‘মোতায়েন করা সেনারা সংখ্যায় হয়তো কম হতে পারে, তবে এই ধরণের সেনা মোতায়েনের তাৎপর্যটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। এমনকি রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার কর্ম তৎপরতা বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক মানচিত্রকে বদলেও দিতে পারে।’

সূত্র: ভয়েস অব আমেরিকা

/এএকে/
সম্পর্কিত
কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বললেন আরাঘচি
ইরাকে অস্ত্র জমা দেওয়ার ঘোষণা ইরানপন্থি দুই মিলিশিয়া গোষ্ঠীর
বোফোর্ট দুর্গে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে হিজবুল্লাহর হামলা
সর্বশেষ খবর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম