ভারতের শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বর্তমানে খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপে ব্যয় সংকোচন করতে বাধ্য হচ্ছে। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে তাদের দৈনন্দিন ব্যয় সংকুচিত হওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। খাদ্য থেকে শুরু করে ভোগ্য পণ্য সবকিছুতেই মধ্যবিত্ত শ্রেণির ব্যয় কমাতে হচ্ছে। যা ভারতের স্থায়ী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
কোভিড-১৯ মহামারির পর থেকে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শহুরে ভোক্তাদের ব্যয়ের ওপর নির্ভর করলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে।
নেসলে ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান সুরেশ নারায়ণ বলেছেন, ধনীদের একটি শ্রেণি এখনও খরচ করছে। কিন্তু মধ্যবিত্ত শ্রেণি, যাদের ওপর অধিকাংশ ভোগ্যপণ্য কোম্পানি নির্ভর করে, তা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে।
নেসলে ইন্ডিয়া সম্প্রতি তাদের প্রথম ত্রৈমাসিক রাজস্ব হ্রাসের মুখোমুখি হয়েছে, যা কোভিড পরবর্তী সময়ে প্রথমবারের মতো ঘটলো।
ভারতের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই মধ্যবিত্ত বলে ধারণা করা হয়। এই শ্রেণি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উভয় ক্ষেত্রেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নির্বাচনি ফলাফলের দুর্বলতায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির হতাশা বড় ধরনের ভূমিকা পালন করেছে বলে মনে করা হয়।
এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ভারত ২০২৫ সালের মার্চে শেষ হতে যাওয়া অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধির আশা করছে। তবে এই আশার বিপরীতে রয়েছে দেশীয় খাতে প্রবৃদ্ধির শ্লথতার লক্ষণ। ভারতীয় শহরাঞ্চলে ভোগ খরচ চলতি মাসে দুই বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে নেমেছে, যা সিটিব্যাংকের প্রকাশিত এক সূচকে ফুটে উঠেছে। এই সূচক বিমান বুকিং, জ্বালানি বিক্রয় ও মজুরি নির্দেশক দ্বারা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সিটির প্রধান ভারতীয় অর্থনীতিবিদ সমীরণ চক্রবর্তী বলেন, যদিও এই পতন কিছুটা সাময়িক হতে পারে, মূল সামষ্টিক চালিকা শক্তিগুলো এখনও প্রতিকূল।
২০২৪ সালের তিনটি ত্রৈমাসিকে ভারতীয় তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল গড়ে ২ শতাংশের কম। যা বিগত ১০ বছরের ৪.৪ শতাংশ গড়ের চেয়ে অনেক কম।
খাদ্য মূল্যস্ফীতি বিগত ১২ মাসে গড়ে ৮ শতাংশের বেশি ছিল। যা সবজির পাশাপাশি খাদ্যশস্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির জন্য দায়ী। অক্টোবর মাসে খুচরা মূল্যস্ফীতি ছিল ১৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৬ দশমিক ২ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছায়।
অনেকের মতে, উৎসবের মৌসুমে খুচরা বিক্রি গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। তবে তা গত বছরের প্রায় অর্ধেক চিল।
৬০ বছর বয়সী রাজওয়ন্তি দাহিয়া স্বামীর মাসিক পেনশন ৩০ হাজার রুপি নিয়ে সংসারের ব্যয় মেটান। তিনি বলেছেন এই উৎসবের মৌসুমে আমরা একেবারেই ব্যয় করিনি। আমাদের সঞ্চয় নেই বললেই চলে।
সংকুচিত হচ্ছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক চলতি অর্থবছরে গ্রামীণ চাহিদা এবং শক্তিশালী সেবা খাতের কারণে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির আশা করছে। সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ভোগ্যপণ্যের চাহিদা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে বলে জানিয়েছেন ব্যাংক অব আমেরিকার ভারত ও আসিয়ানের অর্থনৈতিক গবেষণার প্রধান রাহুল বাজোরিয়া। তিনি বলেন, সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বেসরকারি খরচেও প্রভাব পড়তে পারে।
তবে সিটি ও আইডিএফসি ফার্স্ট ব্যাংকের অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, জুলাই-সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশিত ৭ শতাংশে পৌঁছাবে না। শহুরে ভোক্তাদের খরচের শ্লথতার কারণে ভোগ্যপণ্য কোম্পানির শেয়ার সূচক নিফটি এফএমসিজি প্রায় ১৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যেখানে বেঞ্চমার্ক নিফটি ৫০ সূচক ৭ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে।
শহুরে ভোক্তারা এখন ব্র্যান্ডেড পণ্যের পরিবর্তে কমদামি পণ্য বেছে নিচ্ছেন। হিন্দুস্তান ইউনিলিভারের খাদ্য ও রিফ্রেশমেন্ট গ্রুপ প্রথমবারের মতো বিক্রয় কমেছে। কোম্পানিটির সিইও রোহিত জাওয়া বলেন, বড় শহরগুলোতে প্রবৃদ্ধি স্থির থাকলেও ছোট শহর এবং গ্রামীণ এলাকায় চাহিদা ভালোই রয়েছে।
রেস্তোরাঁয় খাওয়ার ব্যয় কমিয়ে দিয়েছেন ভোক্তারা। ফাস্ট ফুড চেইনগুলোও বিক্রয় হ্রাসের সম্মুখীন হয়েছে। মুম্বাইয়ের ৩৭ বছর বয়সী অভিনাশ ক্রাস্টো বলেন, মানিব্যাগ-বান্ধব দোকানে যাই, যেখানে ভালো ছাড় পাওয়া যায়।









