নেপালের অভিজ্ঞ কমিউনিস্ট নেতা কেপি শর্মা ওলি টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় ফিরেছিলেন মাত্র এক বছর আগে। দুর্নীতি দমন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং স্থিতিশীলতা আনার অঙ্গীকার করেছিলেন তিনি। কিন্তু রক্তক্ষয়ী বিক্ষোভ, দুর্নীতির অভিযোগ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের সমালোচনার মধ্যে মঙ্গলবার আকস্মিক পদত্যাগ করতে হলো তাকে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
এই পদত্যাগ আধুনিক নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি। গত দুই দশকে বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী দেশটিতে ওলি ছিলেন রাজনৈতিক নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র—একজন কিশোর বিপ্লবী থেকে চারবারের প্রধানমন্ত্রী।
কাঠমান্ডুতে সোমবারের বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে অন্তত ১৯ জন নিহত হন। এর পরদিনই পদত্যাগপত্র জমা দেন ওলি। বিক্ষোভকারীরা আনন্দ প্রকাশ করতে গিয়ে তার ব্যক্তিগত বাসভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। টেলিভিশনে দেখা গেছে, জনতা তার বাসভবনে ঢুকে জানালা ভাঙচুর করছে, আসবাবপত্র ভেঙে ফেলছে, আর নিরাপত্তা বাহিনী কয়েক মিটার দূরে দাঁড়িয়েও কার্যত নিষ্ক্রিয়।
কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধান বিশেষজ্ঞ বিপিন অধিকারী বলেন, সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি মানুষের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ জমে ছিল। সোমবারের হত্যাযজ্ঞ সেই ক্ষোভ বিস্ফোরিত করেছে।
গত সপ্তাহে ওলি সরকার ফেসবুক, এক্স, ইউটিউবসহ একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দিলে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। সরকারের ব্যাখ্যা ছিল, ভুয়া তথ্য ছড়ানো ও প্রতারণা ঠেকানোর জন্য এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম, বিশেষত জেনারেশন জেড, একে ভিন্নভাবে দেখে। তাদের অভিযোগ, সরকার মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনে মরিয়া এবং দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাতদের রক্ষা করছে।
প্রতিবাদকারীরা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, বরং ওলির পুরো শাসনামলকেই নিশানা করেন। তাদের মতে, দুর্নীতি, অর্থনৈতিক স্থবিরতা এবং কর্তৃত্ববাদ ওলি সরকারের মূল বৈশিষ্ট্য।
নেপাল বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগ আসেনি, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। ফলে কর্মসংস্থানের অভাবে লাখো তরুণ মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে কাজ খুঁজতে বাধ্য হয়েছেন। এই বাস্তবতাই দেশের তরুণদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
১৯৫২ সালে পূর্ব নেপালে জন্মগ্রহণ করেন ওলি। চার বছর বয়সে মাকে হারান তিনি। বন্যায় বাস্তুচ্যুত হয়ে দাদা-দাদির কাছে বড় হন। শৈশবের কষ্টের অভিজ্ঞতা তাকে রাজনীতির দিকে ঠেলে দেয়। কমিউনিস্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী তরুণ ওলি ১৯৭০ ও ৮০’র দশকে রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন এবং ১৪ বছর কারাবরণ করেন।
পরবর্তীতে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনিফাইড মার্ক্সিস্ট–লেনিনিস্ট)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হন। ওলি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। তখন ভারতের সঙ্গে সীমান্ত অবরোধে জ্বালানি ও ওষুধের সংকটে পড়ে দেশ। সেই সময় ওলি বেইজিংয়ের সঙ্গে ট্রানজিট চুক্তি করে ভারতের ওপর নেপালের বাণিজ্যিক নির্ভরতা কমান।
ভারত ও চীনের ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতেই অবস্থান করছে নেপাল। ওলি প্রায়ই চীনের কাছাকাছি বলেই বিবেচিত হয়েছেন। প্রথম দফায় প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ভারতবিরোধী জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিয়ে সীমান্ত মানচিত্র পরিবর্তনের মতো পদক্ষেপ নেন তিনি। তবে ২০২২ সালে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ওলি বলেছিলেন, তার প্রশাসন নিরপেক্ষ ও অ-জোটপন্থি থাকবে।
১৪ বছরে ১৪ জন প্রধানমন্ত্রী বদলেছে নেপালে। এই অস্থির রাজনৈতিক মঞ্চে ওলি চারবার প্রধানমন্ত্রীর পদে বসেন। তবে মঙ্গলবারের পদত্যাগ প্রমাণ করে, অভিজ্ঞ রাজনৈতিক হয়েও জনতার ক্ষোভ থেকে রক্ষা পাননি।
ওলি সরকারের পতনের পর দেশটি আবারও অনিশ্চয়তার মুখে। তরুণদের ক্ষোভ, সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান-সবকিছুই নেপালের ভবিষ্যৎ পথচলাকে নির্ধারণ করবে।









