নেপালের রাজনৈতিক অস্থিরতার ইতিহাস: রাজতন্ত্র থেকে প্রজাতন্ত্র, ফের অনিশ্চয়তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৯:২৪আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১৯:২৪

দেশজুড়ে রক্তক্ষয়ী দুর্নীতিবিরোধী বিক্ষোভের মুখে মঙ্গলবার পদত্যাগ করেছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি। এতে করে হিমালয়ের দেশটি আবারও নতুন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়লো। ২০০৮ সালে রাজতন্ত্র বিলুপ্তির পর থেকে আজ পর্যন্ত নেপালে ১৪টি সরকার হয়েছে। কিন্তু কোনও সরকারই পূর্ণ পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করতে পারেনি।

১৯৫১: রানা শাসনের পতন

১৯৫১ সালের আগে নেপালে রাজা ছিলেন সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। রানা বংশীয় শাসকেরা প্রধানমন্ত্রীর পদ বংশানুক্রমিকভাবে দখল করে রাখতেন। কিন্তু গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলনের চাপে সেই শাসন ভেঙে পড়ে। এর মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের সূচনা হয়।

১৯৬১১৯৯০: পঞ্চায়েত শাসনব্যবস্থা

১৯৬১ সালে রাজা মহেন্দ্র সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন এবং ‘পঞ্চায়েত’ নামে কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা চালু করেন। এর ফলে রাজতন্ত্র আবারও সর্বময় ক্ষমতায় ফিরে যায়। তবে জনগণের মধ্যে অসন্তোষ জমতে থাকে। ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। ‘জনআন্দোলন’ নামে পরিচিত সেই বিক্ষোভ রাজা বিরেন্দ্রকে দল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য করে।

১৯৯৬: মাওবাদী বিদ্রোহ

১৯৯৬ সালে নেপালের বামপন্থি মাওবাদীরা রাজতান্ত্রিক সংসদীয় ব্যবস্থার পরিবর্তে ‘গণপ্রজাতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু করে। দশ বছরব্যাপী সেই গৃহযুদ্ধে ১৭ হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটে এবং নেপালের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত সৃষ্টি হয়।

২০০৬২০১৫: রাজতন্ত্রের অবসান ও নতুন সংবিধান

২০০৬ সালে আবারও গণআন্দোলন শুরু হয় রাজতন্ত্রবিরোধী স্লোগান নিয়ে। তীব্র জনচাপ ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ২০০৮ সালে রাজতন্ত্র আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়। নেপাল হয় একটি ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। শেষ রাজা গিয়ানেন্দ্র বর্তমানে কাঠমান্ডুতেই সাধারণ নাগরিক হিসেবে বসবাস করছেন।

২০১৫ সালে নেপাল নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে। এর মাধ্যমে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে গণতান্ত্রিক কাঠামোয় প্রবেশ করে। তবে একই সঙ্গে জাতিগত বৈষম্য, ক্ষমতা ভাগাভাগি ও কেন্দ্র-প্রদেশ সম্পর্ক নিয়ে নতুন দ্বন্দ্বেরও সূচনা হয়।

২০১৫বর্তমান: ওলি সরকারের উত্থান-পতন

ওলি প্রথমবার নেপালের প্রধানমন্ত্রী হন ২০১৫ সালের অক্টোবরে। তার প্রথম মেয়াদ স্থায়ী হয় মাত্র এক বছর। পরবর্তীতে ২০১৮ ও ২০২১ সালে পরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর আসনে বসেন ২০২৪ সালে।

চীনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে বিবেচিত ওলি তার প্রথম মেয়াদেই ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন এবং সীমান্ত মানচিত্র পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে বিতর্কে জড়ান। তবে তার শাসনামল জুড়ে দুর্নীতি, কর্তৃত্ববাদ ও অর্থনৈতিক স্থবিরতার অভিযোগ ছিল প্রবল। সর্বশেষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভে প্রাণহানি ঘটার পর মঙ্গলবার তাকে পদত্যাগ করতে হলো।

অস্থিরতার ধারাবাহিকতা

নেপালের সাম্প্রতিক ইতিহাস প্রমাণ করে, দেশটি দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক অস্থিরতার ঘূর্ণাবর্তে আটকে আছে। রাজতন্ত্র থেকে প্রজাতন্ত্রে উত্তরণের পরও একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠতে পারেনি। একের পর এক সরকার পরিবর্তন, নেতাদের প্রতি জনঅবিশ্বাস এবং তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ-সবকিছুই দেশটিকে বারবার অনিশ্চয়তার পথে ঠেলে দিয়েছে।

ওলির পতনের পরও প্রশ্ন রয়ে গেছে যে, নেপাল কি অবশেষে একটি টেকসই রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে পাবে, নাকি আবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে?

সূত্র: রয়টার্স

/এএ/
সম্পর্কিত
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যের জের, মমতার বিরুদ্ধে মামলা
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
সর্বশেষ খবর
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মামলাজট নিরসনের উদ্যোগ জোরদারের দাবি মন্ত্রীর
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মামলাজট নিরসনের উদ্যোগ জোরদারের দাবি মন্ত্রীর
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যের জের, মমতার বিরুদ্ধে মামলা
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যের জের, মমতার বিরুদ্ধে মামলা
তীব্র গরমে ৪ জনের মৃত্যু
তীব্র গরমে ৪ জনের মৃত্যু
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি