মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সোমবার ঘোষণা করেছেন, গাজা যুদ্ধের অবসান ও অবশিষ্ট জিম্মিদের মুক্তি নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছেছেন তারা। এই উদ্যোগ সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমিত হবে, নৌপথে বাণিজ্য নিরাপদ হবে এবং চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থও সুরক্ষিত থাকবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করছে। এতে বেইজিংকে হয়তো প্রান্তিক ভূমিকায় ঠেলে দেওয়া হবে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় রয়েছে- ইসরায়েলের সম্মতির ৭২ ঘণ্টার মধ্যে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও সব জিম্মির মুক্তি, ২৫০ জন যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি, গাজা থেকে ১ হাজার ৭০০ বন্দি ও নিহত প্রতি ইসরায়েলির বিনিময়ে ১৫ জন গাজাবাসীর মৃতদেহ হস্তান্তর। অস্ত্রসমর্পণকারী হামাস সদস্যদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ও গাজা ছাড়ার ক্ষেত্রে নিরাপদ পথের নিশ্চয়তা। গাজার অস্থায়ী প্রশাসন গঠন করা হবে এক ফিলিস্তিনি কমিটির মাধ্যমে। যা তদারকি করবে বোর্ড অব পিস। এর চেয়ারম্যান হবেন ট্রাম্প নিজে ও অন্য রাষ্ট্রপ্রধানরা।
বেইজিং হোয়াইট হাউজ ঘোষিত গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছে। মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন সাংবাদিকদের বলেন, ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে সহায়ক সব প্রচেষ্টাকে চীন সমর্থন করে। আমরা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আহ্বান জানাই জাতিসংঘের প্রস্তাবগুলো কার্যকর করতে, পূর্ণ যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করতে এবং যত দ্রুত সম্ভব মানবিক সংকট প্রশমিত করতে।
তিনি আরও বলেন, চীন বিশ্বাস করে ফিলিস্তিনিরাই ফিলিস্তিন শাসন করবে- এই নীতিই ন্যায়সংগত সমাধানের ভিত্তি এবং দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানই টেকসই শান্তির একমাত্র পথ।
গাজা সংঘাত দুই বছরে গড়িয়েছে। আর তাতে মধ্যপ্রাচ্যে চীনের বাণিজ্যিক স্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানসমর্থিত হুথি জঙ্গিদের বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার কারণে লোহিত সাগরের নৌপথ অচল হয়ে পড়েছে। ২০২৪ সালে এই রুটে কনটেইনার চলাচল কমেছে প্রায় ৭৫ শতাংশ, যা ২০২৫ সালেও পুনরুদ্ধার হয়নি।
সুয়েজ খালের আয়ও ধসে পড়েছে। এই খাল দিয়ে বিশ্বের ১০-১৫ শতাংশ পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে। ২০২৩ সালে চীনের ইউরোপমুখী রফতানির প্রায় ৬০ শতাংশই গিয়েছিল এই পথ দিয়ে। ফলে এই ব্যাঘাতে চীনের বাণিজ্য ব্যয় বেড়েছে বহুগুণ।
হুথিদের হামলার পর চীন থেকে ইউরোপে ৪০ ফুট কনটেইনার পাঠানোর খরচ ২০২৩ সালে ১ হাজার ৫০০ ডলার থেকে ২০২৪ সালে বেড়ে হয় ৪ হাজার ডলার। অনেক চীনা জাহাজকে বাধ্য হয়ে আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে যেতে হচ্ছে, এতে প্রতিটি যাত্রায় বাড়ছে প্রায় ১০ দিন সময় ও ১০ লাখ ডলারের জ্বালানি ব্যয়।
কূটনৈতিক হিসাবের নতুন বাস্তবতা
যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন হলে চীনের অর্থনৈতিক চাপ কিছুটা লাঘব হবে বটে, কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি বেইজিংয়ের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জও বয়ে আনবে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বেইজিংয়ে চীন হামাস ও ফাতাহসহ ১৪টি ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীকে নিয়ে এক ঐতিহাসিক বৈঠক আয়োজন করে। বৈঠক শেষে প্রকাশিত ‘বেইজিং ঘোষণা’য় বলা হয়, সব গোষ্ঠী পিএলও’র কাঠামোর অধীনে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকবে এবং জেরুজালেমকে রাজধানী করে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্য পূরণে কাজ করবে।
কিন্তু ট্রাম্প ঘোষিত পরিকল্পনা ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ বা পিএলও কাঠামোর কোনও ভূমিকা রাখছে না। বরং গাজাকে সাময়িকভাবে বিদেশি তত্ত্বাবধানে পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা চীনের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার সম্ভাবনাকে প্রায় বাদ দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ও চীনের অবস্থান
এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র আবারও মধ্যপ্রাচ্যে নিজের প্রভাবশালী অবস্থান নিশ্চিত করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, মিসর ও তুরস্কসহ আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থনেই পরিকল্পনাটি গঠিত হয়েছে।
বাইডেন ও ট্রাম্প উভয় প্রশাসনের সময়েই ওয়াশিংটনের ইসরায়েলমুখী অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে চীন নিজেকে ‘ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধবিরতি চুক্তি ও সদ্য ঘোষিত যুক্তরাষ্ট্র-কাতার নিরাপত্তা চুক্তি প্রমাণ করছে, আরব দেশগুলোর রাজধানীগুলোয় ওয়াশিংটনের প্রভাব এখনও গভীর ও কাঠামোগতভাবে স্থায়ী। যা চীনের আঞ্চলিক কূটনৈতিক আকাঙ্ক্ষার জন্য এক বড় ধাক্কা।
সূত্র: আল-মনিটর









