বাংলাদেশে জামায়াতের উত্থান আর পশ্চিমবঙ্গের ব্যালট বক্সে সেটির সরাসরি প্রভাব, পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এটাই এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয়। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বিধানসভা কেন্দ্রগুলোতে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)-র অভাবনীয় উত্থানের নেপথ্যে বাংলাদেশের জামায়াতে ইসলামির শক্তিবৃদ্ধি এক অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সীমান্তে সিঁদুরে মেঘ দেখা দিয়েছিল গত কয়েক মাসে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেখানে জামায়াতে ইসলামির দাপট বেড়ে যাওয়ার পর। বিশেষ করে সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়ার মতো সীমান্ত জেলাগুলোতে জামায়াতের শক্তি বৃদ্ধি পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু হিন্দুদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। আর এই উদ্বেগের ঢেউ আছড়ে পড়েছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া, মালদহ এবং মুর্শিদাবাদের মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে।
তীব্র মেরুকরণ ও বিজেপির লক্ষ্যভেদ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশের অস্থিরতা ও হিন্দু নির্যাতনের খবর সীমান্ত পেরিয়ে এপার বাংলায় আসতেই ভোটারদের মধ্যে এক তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। বিজেপির প্রচারের মূল অস্ত্রই ছিল ‘জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন’ এবং ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যু। জামায়াতের উত্থানকে সামনে রেখে বিজেপি যে ‘সুরক্ষা’ ও ‘হিন্দু সংহতি’র বার্তা দিয়েছিল, তা সীমান্তবর্তী ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। মতুয়া ভোটারদের বড় অংশও বাংলাদেশের পরিস্থিতির কারণে আরও বেশি করে সিএএ এবং বিজেপির দিকে ঝুঁকেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
ভোটের পাটিগণিতে আমূল পরিবর্তন তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত অনেক সীমান্তবর্তী আসনেই এবার পদ্ম শিবিরের দাপট দেখা গেছে। বিজেপি নেতৃত্ব দাবি করছে, মানুষ বুঝতে পেরেছে যে সীমান্ত সুরক্ষিত না থাকলে পশ্চিমবঙ্গও নিরাপদ নয়। অন্যদিকে, বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের এই উত্থান ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য যেমন বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনি তা পশ্চিমবঙ্গের হিন্দু ভোটারদের মনে এক অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, যার ফসল ঘরে তুলেছে গেরুয়া শিবির।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অন্তত ১৭টি আসনে জামায়াতের জয় পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত অঞ্চলে বিজেপির পক্ষে ভোট একত্রিত করতে সাহায্য করেছে বলে ধারণা সংশ্লিষ্ট মহলের। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলে দেখা যায়, সীমান্তবর্তী এলাকায় বিজেপি অন্তত ২৬টি আসনে জয়ী হয়েছে। এই আসনগুলো বাংলাদেশের সেই ১৭টি জামায়াত-জয়ী আসন লাগোয়া।
১৭টি এসেছিল রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, জয়পুরহাট, নওগাঁ, মেহেরপুর, চুয়াডাঙা, ঝিনাইদহ, যশোর ও সাতক্ষীরার মতো সীমান্তবর্তী জেলাগুলো থেকে। রংপুর বিভাগে, যা ভারতের ‘চিকেনস নেক’ বা ‘শিলিগুড়ি করিডর’ লাগোয়া, জামায়াতের ব্যাপক উত্থান দেখা যায়। এই করিডর ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী দক্ষিণ দিক থেকে শুরু করলে, দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় বিজেপি জিতেছে বাগদা, বনগাঁ উত্তর এবং হিঙ্গলগঞ্জ এর মতো আসন। এই আসনগুলো ঠিক বিপরীতে রয়েছে বাংলাদেশের সাতক্ষীরা-১ থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসন, যেখানে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে জামায়াত জয়ী হয়েছিল। আবার নদিয়া বিজেপির জেতা আসনগুলোর ওপারে রয়েছে বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গা এবং যশোরের জামায়াত-জয়ী আসনগুলো।
এরপর কিছুটা উত্তরে মুসলিম-অধ্যুষিত মালদা জেলায় বিজেপি জিতেছে ইংলিশ বাজার এবং বৈষ্ণবনগর আসন, যেগুলোর সীমান্তের ওপারেও রয়েছে জামায়াত-জয়ী বাংলাদেশি আসন। আরও উত্তরে দক্ষিণ দিনাজপুরে বিজেপি দখল করেছে কুশমণ্ডি বালুরঘাট, তপন গঙ্গারামপুর এবং হবিবপুর আসন। এই কেন্দ্রগুলোর নওগাঁ এবং মেহেরপুরের মতো বাংলাদেশি আসন, যেখানে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত জিতেছিল। উত্তর দিনাজপুর, যা আরেকটি মুসলিম-প্রধান জেলা, সেখানেও বিজেপি জিতেছে করণদিঘি, হেমতাবাদ এবং হরিপুর আসন।
শিলিগুড়ি করিডরের দিকে এগোলে, বিজেপির শিলিগুড়ি এবং ফাঁসিদেওয়া আসনগুলো বাংলাদেশের নীলফামারী-১ আসনের ঠিক বিপরীতে অবস্থিত। জলপাইগুড়ি জেলায় বিজেপি জিতেছে ময়নাগুড়ি এবং জলপাইগুড়ি আসন, যেগুলোও সরাসরি সীমান্ত লাগোয়া এবং বাংলাদেশের জামায়াত-জয়ী আসনগুলোর মুখোমুখি। সবশেষে ডুয়ার্স অঞ্চলের কোচবিহার জেলায় বিজেপি দখল করেছে সিতাই, শীতলকুচি এবং মেখলিগঞ্জ আসন। এই আসনগুলোর ঠিক ওপারেই রয়েছে বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলা, যেখানে জামায়াত ও তাদের মিত্ররা ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে চারটি আসনে জয় পেয়েছিল।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ডামাডোল এবং তার জেরে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই জলোচ্ছ্বাস রাজ্য রাজনীতির সব হিসেব-নিকেশ ওলটপালট করে দিয়েছে। এই জয় যেমন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে শক্তিশালী করলো, তেমনি সীমান্তবর্তী অঞ্চলে অস্থিরতা মোকাবিলায় দিল্লিকে আরও কড়া পদক্ষেপ নিতে প্ররোচিত করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ শুক্রবার বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয় শুধু সংগঠনের বিস্তার বা মতাদর্শের স্বীকৃতি নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নও।
সব মিলিয়ে, ওপার বাংলার ‘জামায়াত ফ্যাক্টর’ যে নিঃশব্দে এপার বাংলার রাজপাটের নকশা বদলে দিলো, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সীমান্ত লাগোয়া গ্রামগুলোর মানুষের চোখেমুখে এখন একটাই প্রশ্ন, এই রাজনৈতিক পালাবদল কি আদপে তাদের জীবনে সুরক্ষা এনে দেবে? নাকি আরও বাড়বে সীমান্তের উত্তাপ?
**প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব








