কলকাতার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ-এর নাম পরিবর্তন করে গোপাল মুখার্জি রোড করার সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। শনিবার (২০ জুন) পশ্চিমবঙ্গ দিবস উপলক্ষে কলকাতা পৌরসংস্থা এই নামকরণের সিদ্ধান্ত নেয়। রবিবার এই পদক্ষেপকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যা দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ প্রশংসা করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেন, এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিনের একটি ‘ঐতিহাসিক ভুল’ সংশোধনের বড় পদক্ষেপ। তিনি যুক্তি দেন, কলকাতার একটি প্রধান সড়ক দশকের পর দশক ধরে এমন এক ব্যক্তির নামে ছিল, যিনি রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন এবং নির্দোষ নাগরিকদের ওপর সহিংসতার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
ইতিহাসবিদদের মতে, শুভেন্দু অধিকারীর এই তীর ছিল অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সুরাওয়ার্দীর দিকে, যার বিরুদ্ধে ১৯৪৬ সালের আগস্টে কলকাতার কুখ্যাত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-তে উসকানি ও মূল ভূমিকা পালনের অভিযোগ রয়েছে।
তবে কলকাতা পৌরসংস্থার এই নামকরণের পরই তৃণমূল কংগ্রেস পাল্টা তথ্য নিয়ে হাজির হয়। তাদের দাবি, পৌরসংস্থা ও মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঐতিহাসিক এক মারাত্মক ভুল করেছেন। রাস্তাটি আসলে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে ছিলই না!
কে এই হাসান সোহরাওয়ার্দী, যার নামে সড়ক?
তৃণমূল কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র ও সাবেক এমপি সাকেত গোখলে এক্স–এ লিখেছেন, ‘এই রাস্তাটির নাম মোটেও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে রাখা হয়নি, যাকে ‘বাংলার কসাই’ বলা হয়ে থাকে।’ তিনি স্পষ্ট করেন, রাস্তাটি মূলত তার চাচা হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে উৎসর্গ করা হয়েছিল, যিনি ছিলেন একজন প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, শল্যচিকিৎসক ও সমাজসেবক।
তৃণমূলের বর্ষীয়ান নেতা কুনাল ঘোষ এক্স-এ লিখেছেন, ‘আমার মনে হয় কলকাতা পৌরসংস্থা মস্ত বড় ভুল করেছে। তারা চাচা ও ভাতিজাকে গুলিয়ে ফেলেছেন। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর উচিত তথ্যটি যাচাই করা এবং পৌরসংস্থাকে রেকর্ড পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া। যদি ভুলবশত ভাতিজার অপরাধের শাস্তি চাচাকে দেওয়া হয়, তবে তা হবে অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।’
ঐতিহাসিক রেকর্ড অনুযায়ী, স্যার হাসান সোহরাওয়ার্দী ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম উপাচার্য (ভাইস চ্যান্সেলর), যিনি ১৯৩০ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বিতীয় মুসলিম হিসেবে ইংল্যান্ডের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস-এর ফেলো হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। ১৯৪৫ সালে মৃত্যুর এক বছর আগে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রের বাইরে তিনি সাইমন কমিশনের উপদেষ্টা এবং ১৯২৩-২৫ মেয়াদে বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের ডেপুটি প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
১৯৩৩ সালে হাসান সোহরাওয়ার্দী জীবিত থাকাকালীনই পার্ক সার্কাস থেকে কসাইপাড়া লেন সংযোগকারী এই রাস্তাটি তার নামে নামকরণ করে তৎকালীন কলকাতা পৌরসংস্থা। এই সড়কেই তার বিখ্যাত বাসভবন ‘কাশানা’ অবস্থিত ছিল, যা ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে ভারতের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের একটি প্রধান মিলনস্থল ছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসেও এই সড়কের একটি অনন্য স্থান রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউয়ের একটি ঔপনিবেশিক আমলের ভবনেই বাংলাদেশের প্রথম প্রবাসী সরকার বা মুজিবনগর সরকারের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন এই প্রবাসী সরকারের হাতে হস্তান্তরের আগে ভবনটি পাকিস্তানের ডেপুটি হাই কমিশন হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
কে এই গোপাল মুখার্জি ওরফে ‘গোপাল পাঁঠা’?
পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে গোপাল মুখার্জি বা ‘গোপাল পাঁঠা’র মতো বিতর্কিত চরিত্র খুব কমই আছে। কলকাতায় তার পরিবারের একটি বিখ্যাত খাসির মাংসের দোকান থাকার কারণে স্থানীয়ভাবে তিনি ‘পাঁঠা’ উপনামে পরিচিতি পান।
কারও কারও কাছে তিনি ১৯৪৬ সালের কলকাতার অন্ধকার অধ্যায়ে হিন্দুদের রক্ষাকারী এক বীর। আবার সমালোচকদের চোখে তিনি দাঙ্গার সময়কার একজন উগ্র দলনেতা।
১৯৪৬ সালের আগস্টে ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে-র সময় কলকাতায় হিন্দু-মুসলিম ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, যাতে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারান। এই সহিংসতার মধ্যে গোপাল মুখার্জি হিন্দুদের পাল্টা প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান নেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। তার সমর্থকেরা দাবি করেন, গোপাল স্থানীয় যুবকদের সংগঠিত করে বাস্তুচ্যুত পরিবার ও বিধবাদের আশ্রয় দিয়েছিলেন এবং অসংখ্য মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। ১৮ আগস্ট থেকে তিনি সুসংগঠিত প্রতিরোধের নেতৃত্ব দেন। অনুসারীদের মতে, তার এই ভূমিকার কারণেই মুসলিম লীগের কলকতাব্যাপী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয় এবং লীগ নেতারা বাধ্য হয়ে রক্তপাত বন্ধ করতে গোপালের কাছেই আবেদন জানিয়েছিলেন। এই কারণেই তার ভক্তরা মনে করেন যে, গোপাল পাঁঠার কারণেই কলকাতা ভারতের অংশ হিসেবে রয়ে গেছে।
‘দ্য বেঙ্গল ফাইলস’ ও নতুন বিতর্ক
কয়েক দশক ধরে ইতিহাসের পাতায় প্রায় বিস্মৃত এই চরিত্রটি সম্প্রতি নির্মাতা বিবেক অগ্নিহোত্রীর চলচ্চিত্র দ্য বেঙ্গল ফাইলস-এর ট্রেইলার মুক্তির পর পুনরায় আলোচনায় আসে।
ট্রেইলার প্রকাশের পর গোপাল পাঁঠার নাতি শান্তনু মুখার্জি পরিচালক অগ্নিহোত্রীর বিরুদ্ধে একটি এফআইআর দায়ের করেন। তার অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি রিলে অগ্নিহোত্রী তার দাদাকে ‘এক থা কসাই গোপাল পাঁঠা’ বলে উল্লেখ করেছেন, যা অত্যন্ত ‘অবমাননাকর’ ও ‘বিভ্রান্তিকর’। যদিও বিবেক অগ্নিহোত্রী এই দাবি অস্বীকার করে বলেছেন, সিনেমায় গোপাল পাঁঠাকে ১৯৪৬ সালের কলকাতা হত্যাকাণ্ডের প্রতিরোধ গড়ে তোলা একজন নায়ক হিসেবেই চিত্রায়িত করা হয়েছে।
ইতিহাসের সেই বিতর্কিত অধ্যায় এবার কলকাতার রাজপথে এসে আছড়ে পড়েছে। কেবল নামের বানানের মিল থাকার কারণে এক সোহরাওয়ার্দীর জায়গায় অন্য সোহরাওয়ার্দীকে ‘শাস্তি’ দিতে গিয়ে একজন ভিন্ন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের সম্মান কেড়ে নিয়ে সেখানে গোপাল মুখার্জিকে বসানোর এই চেষ্টা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিলো।








