ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় বাখমুত শহর থেকে রুশ ভাড়াটে বাহিনী ওয়াগনার গ্রুপ যোদ্ধাদের প্রত্যাহারের হুমকি দিলেও তা বাস্তবায়িত করার কোনও ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না। শুক্রবারের (১০ মে) মধ্যে সেনা প্রত্যাহার করা বললেও কিয়েভের দাবি, ৯ মে’র আগে বাখমুত দখলের জন্য আরও যোদ্ধা মোতায়েন করছে ইয়েভজেনি প্রিগোজিনের বাহিনী।
ইউক্রেনীয় এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, ওয়াগনার গ্রুপের যোদ্ধারা যুদ্ধের সম্মুখভাগে অবস্থান নিচ্ছে যুদ্ধে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে নাৎসিদের হারানোর বিজয় উদযাপনের (৯ মে) আগেই বাখমুত দখলের পরিকল্পনা করছে তারা।
সংঘাতময় বাখমুত থেকে নিজ বাহিনীর যোদ্ধাদের প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছেন ওয়াগনার গ্রুপের প্রধান ইয়েভেজেনি প্রিগোজিন। ইউক্রেনীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য পর্যাপ্ত গোলাবারুদ সরবরাহের ঘাটতির অভিযোগ তুলে এমন ঘোষণা দেন তিনি। বলেন, ‘আমাদের সেনারা ১০ মে রুশ সামরিক বাহিনীর কাছে অবস্থান হস্তান্তর করবে।’
তবে রুশ রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আরআইএ-এর প্রতিবেদন অনুসারে, যুদ্ধের জন্য ওয়াগনার গ্রুপকে পর্যাপ্ত অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করতে এক উপ-মন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছেন রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু।
ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় ডনেস্ক অঞ্চলের ছোট শহর বাখমুতে গত বছরের জুলাই মাস থেকে রুশ ও ইউক্রেনীয় সেনারা তীব্র সংঘাতে লিপ্ত রয়েছে। রাশিয়ার কাছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহরটিতে এক সময় বড় ধরনের জয়ের আশা করলেও বর্তমানে সে আশায় কিছুটা ভাটা পড়েছে মস্কোর। শহরটি দখলে রাশিয়ার আক্রমণের নেতৃত্বে রয়েছে ওয়াগনার যোদ্ধারা।
কিয়েভ বলছে, সম্প্রতি ইউক্রেনীয় সেনারা বাখমুতে পিছু হঠতে বাধ্য হলেও যুদ্ধক্ষেত্রে যথাসম্ভব রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত করেছে।
কিয়েভের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ বলছে, সম্প্রতি বাখমুতে ৩০টিরও বেশি রুশ আক্রমণ প্রতিহত করেছে ইউক্রেনীয় সেনারা। তাদের দাবি, শুক্রবার বাখমুত ও মারিনকা অঞ্চলে ভয়াবহ হামলা হয়।
ইউক্রেনের ডনেস্ক অঞ্চলের গভর্নর পাভলো কাইরিলেঙ্কো এক টেলিগ্রাম বার্তায় বলেন, ইউক্রেনের ক্রামাটর্স্কের ভারী যন্ত্রাংশ উৎপাদন কারখানায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে রাশিয়া। এছাড়া স্লোভিয়ানস্কে আরও একটি কারখানায় রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। তবে এসব হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলেছেন গভর্নর।
ইউক্রেনের দাবি, বাখমুতের সম্মুখ সারিতে পাকাপোক্ত অবস্থান নিচ্ছে ওয়াগনার গ্রুপের যোদ্ধারা। তারা বলছে, যোদ্ধাদের প্রত্যাহার কিংবা গোলাবারুদের ঘাটতির কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
অবশ্য বিষয়টি নিয়ে কোনও মন্তব্য করেনি ক্রেমলিন।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী সের্গেই শোইগু ও পদাতিক বাহিনীর প্রধান ভ্যালেরি গেরাসিমভের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে একাধিকবার সমালোচনা করেছেন ওয়াগনার প্রধান।
গত সপ্তাহেও রুশ সামরিক ব্লগারের এক ভিডিওতে বাখমুতে নিজ বাহিনীর যোদ্ধাদের গোলাবারুদ ফুরিয়ে আসছে বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে চেয়েও পর্যাপ্ত পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ না পাওয়ায় হতাহতের সংখ্যা ৫ গুণ বেশি হচ্ছে এমন অভিযোগও করেছিলেন পুতিন ঘনিষ্ঠ প্রিগোজিন।
ফেব্রুয়ারিতেও যোদ্ধাদের মরদেহের ছবি তুলে এই হতাহতের রুশ সেনাপ্রধানকে দায়ী করেছিলেন তিনি। অবশ্য এসব দায় অস্বীকার করেছিল রুশ সেনাবাহিনী।
ইউক্রেনীয় উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হান্না মালিয়ার বলেছেন, আমরা এখন দেখছি ওয়াগনার যোদ্ধাদের বাখমুতের দিকে পাঠানো হচ্ছে।
দেশটির সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি আন্দ্রি চেরনিয়াক বলেছেন, প্রত্যাহারের দাবি পরও বাখমুত থেকে ওয়াগনার যোদ্ধাদের তুলে নেওয়ার কোনও ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে না।
সামরিক বিশ্লেষকেরা বলেছেন, কয়েক মাস ধরে প্রিগোজিনের একাধিকবার এমন কিছু বলার কারণে তার হুমকিকে খুব একটা গুরুত্ব দেওয়ার সুযোগ নেই।
বার্নার্ড কলেজ অ্যান্ড কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও রাশিয়ার নিরাপত্তা ইস্যু-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কিম্বারলি মার্টেন বলেছেন, রুশ সামরিক গোয়েন্দাদের জন্য প্রিগোজিন ও তার ভাড়াটে যোদ্ধারা আবশ্যক উপাদান। তিনি যা বলছেন তা আমরা বিশ্বাস করছি না। এছাড়া যেকোনও সামরিক কমান্ডারের পক্ষ থেকে তার বাহিনীর পরবর্তী কর্মকাণ্ডের কথা কয়েকদিন আগে জানানো একেবারে চরম বোকামি। এগুলো ধোঁয়া ছড়ানো ছাড়া কিছু না।
লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক ইয়োহান মাইকেল বলেছেন, প্রিগোজিনের এই মন্তব্য বাখমুত দখলে ব্যর্থতার দায় অন্যের কাঁধে দেওয়া এবং শহরটি দখল করা রাশিয়ার জন্য এখনও অনেক দূরের লক্ষ্য-সেটিই উঠে এসেছে।
ক্রেমলিনের অনুমতি ছাড়া বাখমুত থেকে যোদ্ধাদের প্রত্যাহার করার ক্ষমতা প্রিগোজিনের রয়েছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মাইকেল। তিনি বলেছেন, পুতিন যদি তাকে বাখমুতে লড়াইয়ে চান, তাহলে তাকে যেভাবেই হোক বাধ্য করা হবে।
অস্ট্রীয় বিশ্লেষক গেরহার্ড ম্যাংগট বলেছেন, যদি প্রিগোজিন সত্যিই যোদ্ধাদের প্রত্যাহার করেন তাহলে বাখমুত আশেপাশে ওয়াগনার যোদ্ধাদের স্থান দখল করলে রাশিয়ার নিয়মিত সেনারা। তারা খুব দ্রুতই এটি করবে। তিনি যদি সত্যিই প্রত্যাহারের কথা বলে থাকেন তাহলে রুশদের কাছ থেকে পুরো বাখমুত বা অংশ বিশেষ পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাবে ইউক্রেন। যা পুতিন ও শোইগুর জন্য একটি বিপর্যয় হবে।
সূত্র: রয়টার্স, আল জাজিরা









