দীর্ঘদিন ধরে পাল্টা আক্রমণের কথা বলে আসছেন ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। হামলার জন্য মিত্র দেশগুলো থেকে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদ সংগ্রহ করছিলেন তিনি। সম্প্রতি (৩ জুন) প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে পাল্টা হামলায় কিয়েভ সেনারা প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন জেলেনস্কি। কিছু দিন ধরে রাশিয়ার অভ্যন্তরে এবং ইউক্রেনে দখলকৃত ভূখণ্ডে রুশ সেনারা হামলার শিকার হচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব হামলা ইউক্রেনের বহুল প্রতীক্ষিত পাল্টা আক্রমণের অংশ হতে পারে।
ইউক্রেনের রুশ দখলকৃত ভূখণ্ড পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্য নিয়ে পাল্টা হামলা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আমরা সফল হবো। আমরা এটি (পাল্টা হামলা) করতে চলেছি, এবং আমরা প্রস্তুত।’
মঙ্গলবার(৬ জুন)ইউক্রেনের খেরসনে রুশ দখলকৃত অংশে অবস্থিত ‘নোভো কাখোভকা’বাঁধ ধস নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বিষয়টির জন্য পরস্পরকে দায়ী করছে মস্কো ও কিয়েভ। ইউক্রেনের দাবি ‘রুশ সন্ত্রাসীরা’ এমন কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী। অপরদিকে রাশিয়া বলছে, ইউক্রেনীয় সেনারাই এমন কাণ্ড ঘটিয়েছে।
একই সঙ্গে ৬ জুনের একটি প্রতিবেদনে বিবিসি বলছে, পূর্ব ইউক্রেনের বাখমুতের নিয়ন্ত্রণ হারানোর কয়েকদিনের মাথায় শহরটির চারপাশে ফের বিদ্যুৎ গতিতে অগ্রসর হচ্ছে কিয়েভের যোদ্ধারা। শহরটি লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে বলে দাবি করেন ইউক্রেনের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী হানা মালিয়ার। তবে এটি রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে বহুল প্রতীক্ষিত ‘পাল্টা আক্রমণ’কিনা, তা স্পষ্ট করেননি তিনি।
কিছুদিন আগেই বাখমুতের সম্পূর্ণ ভূখণ্ড দখল করে ফেলেছে বলে দাবি করে রুশ ভাড়াটে বাহিনী ওয়াগনার গোষ্ঠী। বিষয়টির কারণে মস্কোতে উদযাপনের খবরও পাওয়া যায় তখন। তবে বরাবরই মস্কোর এমন দাবি অস্বীকার করে কিয়েভ বলছে, বাখমুতে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে ইউক্রেনীয় সেনারা।
রুশ ভাড়াটে গোষ্ঠীর প্রধান ইয়েভজেনি প্রিগোজিন বলছেন, ওয়াগনার যোদ্ধাদের ক্ষতি করতে বাখমুত শহর থেকে ফেরার পথে কিয়েভের সেনারা বিস্ফোরক পুঁতে রাখছে।
বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন দিক থেকে পাল্টা আক্রমণ হবে বলে জানিয়েছিলেন জেলেনস্কি। তাই এটিও তাদের পাল্টা হামলার কোনও পন্থা কি না সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
এদিকে রবিবার (৪ জুন) কিয়েভের সামরিক বাহিনী দাবি করে, ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় বাখমুতে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির শিকার হচ্ছে মস্কোর সেনারা। ইউক্রেনের পদাতিক বাহিনীর প্রধান কমান্ডার জানিয়েছেন,বাখমুতে সম্প্রতি দুটি অভিযানে ব্যর্থ হয় রুশ সেনারা।
কিয়েভের এমন দাবির আগের দিন ওয়াগনার প্রধান প্রিগোজিন জানিয়েছিলেন, শহরটি থেকে তাদের ৯৯ শতাংশ যোদ্ধাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কিয়েভের দাবি, প্রাণ বাঁচাতে পাল্টা আক্রমণের ভয়েই বাখমুত থেকে সরে যাচ্ছে ওয়াগনার যোদ্ধারা।
সোমবার (৫ জুন) দক্ষিণ ইউক্রেনীয় অঞ্চল ডনেস্কে অন্তত ৫টি ইউক্রেনীয় হামলা প্রতিহত করার কথা জানায় মস্কো। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, ছয়টি যান্ত্রিক এবং দুটি ট্যাংক ব্যাটালিয়ন দিয়ে দক্ষিণ ডনেস্কে হামলা চালিয়েছিল ইউক্রেন। রয়টার্সের এক প্রতিবেদন থেকে বিষয়টি জানা যায়। রুশ দখলকৃত ডনেস্কে এমন হামলা জেলেনস্কির পাল্টা হামলারই ইঙ্গিত কি না সে সম্পর্কে অবশ্য কিছু জানায়নি কিয়েভ।
সম্প্রতি আজভ সাগরের উপকূলেও কিয়েভের সেনারা প্রবেশের চেষ্টা করে বলে দাবি করেন জাপোরিজ্জিয়ায় নিযুক্ত রুশপন্থি গভর্নর। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আরআইএ নভোস্তির প্রতিবেদনে বিষয়টি উঠে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রথমদিকে প্রবল হামলা চালিয়ে আজভ সাগর পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নেয় রুশ বাহিনী। এরপর থেকেই প্রবেশাধিকার হারিয়েছিল ইউক্রেনীয়রা। ইউক্রেনীয়দের মধ্যে অঞ্চলটি আবার দখলের চেষ্টা স্পষ্ট।
রুশ দখলকৃত ইউক্রেনীয় অঞ্চলগুলো ছাড়াও রাশিয়ার নিজস্ব ভূখণ্ডেও বেশ কিছু হামলার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে ড্রোন হামলা হয় গত ৩০ মে। ছোট হামলা হলেও রাজধানীতে এমন হামলায় রাশিয়ার উদ্বেগ বেড়েছে নিঃসন্দেহে।
আর ইউক্রেনের সীমান্তবর্তী রুশ অঞ্চল বেলগোরোদে সংঘর্ষ যেন এখন নিত্যদিনের খবর। অঞ্চলটিতে লাগাতার হামলা, সংঘর্ষ ও গোলাবর্ষণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। রাশিয়ার দাবি, ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর ‘সন্ত্রসী গোষ্ঠী’ এমন হামলার পেছনে দায়ী। তবে ইউক্রেন বলছে রাশিয়ার পুতিন প্রশাসনের পতন করতে রুশ নাগরিকেরাই এসব হামলা করছে।
অঞ্চলটির শেবেকিনো শহরে প্রায় সাড়ে ৮০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য বস্তু দিয়ে হামলা হয়েছে। এসব হামলায় নিহত হন অঞ্চলটির দুজন নারী এবং গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন শহরটির ১৬ জন বাসিন্দা। টেলিগ্রাম বার্তায় শুক্রবার (২ জুন) এমন দাবি করেছিলেন অঞ্চলটির গভর্নর ভ্যাচেস্লাভ গ্ল্যাডকভ।
এদিকে ইউক্রেনপন্থী রুশ বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এখনও বেলগোরোদে সক্রিয়, যদিও তাদের পুরোপুরি হঠিয়ে ইউক্রেনে ফেরত পাঠিয়েছে বলে দাবি করেছিল মস্কো। শুক্রবার এক প্রতিবেদনে দ্য গার্ডিয়ান এমন খবর জানিয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ফ্রিডম অব রাশিয়া লিজিয়ন।
ইউক্রেনের দিক থেকে লাগাতার এমন হামলা সম্ভাব্য পাল্টা আক্রমণের অংশ কি না তা নিয়ে জেলেনস্কি প্রশাসন কিছু না বললেও ঘটনাগুলোকে তারই ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকে। ইউক্রেন অবশ্য বলে আসছে, তারা ঘোষণা দিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করবে না।
সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা, সিএনএন









