ব্রিটেনে কাজের ভিসার নাম করে শত শত কোটি পাউন্ড হাতিয়ে নিয়েছে একটি চক্র। বিশেষ করে কেয়ার হোম মালিক ও তাদের দালালদের পকেটে গত তিন বছরে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার গেছে। অনেক কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল হয়েছে। যারা কর্মী এনেছে সেসব কোম্পানির অর্ধেকের বেশি কর্মীকে এক দিনের জন্যও কোনও কাজ দেয়নি। তবে কর্মী আনার ব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ওয়ার্ক পারমিট শব্দটি সামনে পেছনে জুড়ে দিয়েছে বিভিন্ন কোম্পানি। এসব কোম্পানির মালিকরা মিলিয়নিয়ার বনে গেলেও বাংলাদেশ থেকে আসা অন্তত কয়েক হাজার কর্মী কাজ না পেয়ে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
এসব কর্মীদের অনেকে এদেশে টিকে থাকতে কোম্পানির লাইসেন্স বাতিলের পর দশ থেকে পনের হাজার পাউন্ডে নতুন কোম্পানির কাগুজে ওয়ার্ক পারমিট কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে সীমিত ভিসার সময়কাল এবং অনথিভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা শোষণ ও আধুনিক দাসত্বের অনুশীলনের বাংলাদেশিসহ অভিবাসী কর্মীদের বিপদ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। কর্মসংস্থান ও কাজের শর্তের ফাঁদ এবং ভিসার সময়কাল সম্পর্কিত মিথ্যা প্রতিশ্রুতিসহ ব্যাপক প্রতারণা করছে মধ্যস্থতাকারীরা।
বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে মঙ্গলবার কথা বলার সময় সিলেট থেকে আসা তাজুল ইসলাম ও রায়হান খান জানান, স্বপ্নের লন্ডনে ভিসা বাঁচাতে সপ্তাহে একশ ঘণ্টা কাজ করেও কুল কিনারা পাচ্ছেন না তারা। ভিসার জন্য আইন প্রয়োগকারী পদক্ষেপের ভয়, ভাষার প্রতিবন্ধকতা এবং অভিযোগ প্রক্রিয়া না জানার কারণে নিপীড়িত কর্মীরা প্রতিকার চাইতে পারেন না। কেয়ার ভিসার টাকা নিয়ে রীতিমত বিচার শালিস চলছে কমিউনিটিতে।
ইউকেবিএর সমীক্ষায় দেখা গেছে, কাজের ভিসা স্পনসরশিপ লাইসেন্স ২০২০ সালের তুলনায় ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্পন্সরশিপ খরচ বর্তমানে তিন বছরের জন্য তিন হাজার পাউন্ড হলেও আছে ২৪০ পাউন্ডের এডমিন ফি। আছে স্বাস্থ্যসেবা খরচও। তবে নিয়োগকারীর দালালরা হাতিয়ে নিচ্ছে অন্তত ২৫ হাজার পাউন্ড বা বর্তমানে বাংলাদেশি মুদ্রায় চল্লিশ লাখ টাকা।
জানা গেছে, গত তিন বছরে ব্রিটেনে নতুন আসা বাংলাদেশিদের অভিবাসনকে টার্গেট করে কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র হাতিয়ে নিয়েছে কয়েকশ কোটি টাকা। বিশেষ করে, কেয়ার ভিসায় মানুষ আনার নাম করে স্বামী-স্ত্রী সন্তানসহ এক একটি পরিবারের কাছ থেকে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ লাখ টাকার মতো হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। দেশে তীব্র বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের সময়ে ভিসার নামে মানুষ পাচার করে মূলত হুন্ডির মাধ্যমে শত শত কোটি টাকা পাচার করে আনা হয়েছে। অন্তত দেড়শো ভুয়া কেয়ার হোমের বিদেশি কর্মী আনার লাইসেন্স বাতিল করেছে হোম অফিস।
লন্ডনের লেক্সপার্ট সলিসিটর্সের প্রিন্সিপাল সলিসিটর ব্যারিস্টার শুভাগত দে মঙ্গলবার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এই সেক্টরে ব্যাপক অনিয়মের খবর আসার পর আগামী দিনগুলোতে কেয়ার হোমগুলোর অফিস গিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধান করার মাত্রা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করেন তিনি।
জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে কেয়ার ভিসায় আসা কয়েক হাজার কর্মীর শতকরা ৯০ শতাংশেরও বেশিকে কাজ দিতে পারেনি সংশ্লিষ্ট নিয়োগদাতা। কাজ না পেয়ে, ভিসা বাতিলের নোটিশের চিঠি হাতে পরিবার নিয়ে পথে পথে ঘুরছেন শত শত বাংলাদেশি। অথচ উন্নত জীবনের স্বপ্ন দেখানো সংঘবদ্ধ চক্রগুলো হাতিয়ে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা। হুন্ডির মাধ্যমে পাচার করে আনা টাকায় দুবাই, লন্ডনে পাচারকারীরা কিনেছেন বাড়ী ও হোটেলসহ নানা স্থাপনা। এই সংঘবদ্ধ চক্রে আছেন আইনজীবি হিসেবে পরিচয় দাতা কিছু বাংলাদেশিও। সম্প্রতি পূর্ব লন্ডনে বাংলাদেশি মালিকানাধীন বেশ কয়েকটি ল ফার্মে অভিযান চালিয়েছে ব্রিটেনের আইনী সেবাদাতাদের রেগুলেটর প্রতিষ্ঠান।
ভয়েস ফর জাস্টিস ইউকের সেক্রেটারি, বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রবীণ নেতা কে এম আবু তাহের চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত দুই বছরে কেয়ার ভিসায় বাংলাদেশি যারা এসেছেন, তাদের শতকরা ৯০ জনই প্রতারিত হয়েছেন। এখন নতুন কোম্পারি ওয়ার্ক পারমিট কিনে নতুন করে তারা প্রতারিত হচ্ছেন। অনেকে শেষ সম্বল দেশে বাড়ীর ভিটা বিক্রি করে দালালদের টাকা দিয়েছিলেন।
আর এই প্রতারণার মূল হোতা বাংলাদেশি মধ্যস্বত্বভোগী দালালরা। বাংলাদেশি দালালরা স্বদেশী ভাইদের সর্বস্ব হাতিয়ে নিয়ে রাতারাতি কোটিপতি হয়ে ঢাকায়, দুবাইয়ে বাড়ি, বিলাসবহুল গাড়ি কিনছে। আর তাদের প্রতারণার শিকার কয়েক হাজার বাংলাদেশি নিঃস্ব হয়ে দিন পার করছেন।’
এসব ঘটনায় প্রতিদিন সামাজিকভাবে সালিশের মাধ্যমে প্রতারিতদের অর্থ উদ্ধারে কমিউনিটি নেতারা কাজ করছেন বলেও জানান তিনি।









