ভারত সরকার গত সপ্তাহে ঘোষণা করেছে যে, সেনাবাহিনীতে প্রতারিত হয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া ৯১ জন ভারতীয়ের মধ্যে কয়েক ডজনকে মুক্তি দিয়েছে রাশিয়া।। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন ইতোমধ্যে দেশে ফিরে এসেছেন, অন্যদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির সাংবাদিক নিয়াজ ফারুকি এই ভারতীয়দের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তাদের সংগ্রামের কাহিনী তুলে ধরেছেন।
‘আমি আতঙ্কে আছি। জানি না আমি নিরাপদে ফিরবো নাকি কফিনে করে। দয়া করে আমাকে বাঁচান’। এই মর্মস্পর্শী বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন উরগেন তামাং, যিনি একজন সাবেক ভারতীয় সেনা। তাকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে পাঠানো হয়েছিল এবং কয়েকদিন আগে তিনি ফ্রন্টলাইন থেকে ছাড় পেয়েছেন। তামাং ৯১ জন ভারতীয়দের একজন, যারা যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বেশিরভাগই দরিদ্র পরিবারের সন্তান এবং এজেন্টদের প্রলোভনে পড়ে চাকরি বা অর্থ উপার্জনের আশায় রাশিয়ায় গিয়েছিলেন।
কিন্তু তাদের ইউক্রেনে যুদ্ধে পাঠানো হয়, যেখানে তারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। তাদের অনেকেই কোনও সামরিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই মাইন, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও স্নাইপার আক্রমণের সম্মুখীন হতে বাধ্য হন। এপর্যন্ত, এই যুদ্ধে ৯জন ভারতীয় নিহত হয়েছেন। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ মানবপাচারের অভিযোগে ১৯ জনকে গ্রেফতার করেছে।
রাশিয়ার প্রতিশ্রুতি ও মোদির হস্তক্ষেপ
গত জুলাই মাসে, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মস্কো সফরের সময় রাশিয়া প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে তারা সব ভারতীয়কে দ্রুত মুক্তি দেবে। মোদি এই ইস্যুটি প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন। দুই দেশের দীর্ঘদিনের মৈত্রী সম্পর্ক থাকলেও এই ইস্যুতে চাপ বেড়েছিল।
তামাংসহ ৪৫ জনকে ইতোমধ্যে মুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং তারা বাড়ি ফিরে আসার পথে।
যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে ফিরে আসা মানুষের গল্প
একজন রাজস্থানের ইলেক্ট্রিশিয়ান সুনীল কারওয়া ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি বলেছেন, আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে আমি সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছি।
পূর্ব ইউক্রেনের বাখমুত শহরের কাছে অবস্থানকালে তিনি এই কথাগুলো বলেন। মোসকো বিমানবন্দরে বাড়ি ফেরার জন্য অপেক্ষা করার সময় তিনি বিবিসির কাছে তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
কারওয়া যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর মর্মান্তিক দৃশ্যগুলো বর্ণনা করেন। তার গ্রামের পাশের একজন লোকের মৃত্যু তার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল তা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আহত হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যেই তাকে আবার ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়েছিল এবং সে মাঠে অজ্ঞান হয়ে পড়ে। এখন সে পক্ষাঘাতে আক্রান্ত।
প্রতারিত চুক্তি ও স্বপ্নভঙ্গ
রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রলোভনে পড়ে বেশিরভাগ ভারতীয় শ্রমিকরা চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন, যা ছিল রুশ ভাষায়। এজেন্টরা তাদের দ্রুত নিয়োগপ্রক্রিয়ার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল এবং তারা আশায় ছিলেন যে এটি তাদের জীবনে একটি পরিবর্তন আনবে। কারওয়া বলেন, এটি খুব দ্রুত ঘটেছিল। কয়েকটি সই এবং ছবি তোলার পরই আমরা সেনাবাহিনীতে যোগ দিই।
একটি ভুয়া কলেজে ভর্তির প্রতারণার শিকার হয়ে শেষমেষ রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন রাজা পাঠান নামের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, যখন আমি সেখানে পৌঁছলাম, দেখি সেনাবাহিনীর নিয়োগের বিজ্ঞাপন চলছে। আমি তখন এত সময় এবং অর্থ বিনিয়োগ করে ফেলেছিলাম যে অন্য কিছু করার ছিল না।
অন্ধকারময় অভিজ্ঞতা ও যন্ত্রণার স্মৃতি
তেলেঙ্গানার বাসিন্দা মোহাম্মদ সুফিয়ান, যিনি ১২ সেপ্টেম্বর ভারতে ফিরে এসেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা তার মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ওখানে বিশ্রামের খুবই কম সময় ছিল এবং প্রথমদিকে আমি ২৫ দিন পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারিনি।
বন্ধু হেমিল মানগুকিয়া তার সামনে মারা যান। এটিকে সবচেয়ে ভয়াবহ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করে সুফিয়ান বলেন, সে মাত্র ১৫ মিটার দূরে ছিল, যখন ক্ষেপণাস্ত্র এসে পড়ে। তার মৃতদেহ আমি নিজ হাতে ট্রাকে তুলেছিলাম।
সুফিয়ানের দলে থাকা আজাদ ইউসুফ কুমার, যিনি জম্মু ও কাশ্মীরের বাসিন্দা, যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, এক মুহূর্তে আপনি পরিখা খনন করছেন, আর পরের মুহূর্তেই একটি গোলা এসে সবকিছু পুড়িয়ে দেয়। আপনি জীবিত থাকবেন কিনা, তা কেবল ভাগ্যের ওপর নির্ভর করতো।
ভারতে ফিরে আসা ভারতীয়দের মধ্যে অনেকে এখন রাশিয়ায় থাকা তাদের সহযোদ্ধাদের মুক্তির জন্য অপেক্ষা করছেন, যাদের এখনও মুক্তি দেওয়া হয়নি।
তামাংয়ের শেষ যাত্রা ও মুক্তির অপেক্ষা
জানুয়ারিতে রাশিয়ান সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া তামাং আগেই স্থানীয় কাউন্সিলর রবি প্রধানের মাধ্যমে জানিয়েছিলেন যে তার ইউনিটের ১৫ জনের মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তামাংকে অন্তত দু’বার ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়েছিল, এমনকি তিনি তার মুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করার পরও। তিনি বলেন, আমি বাইরে এসেছি। জানিয়েছিলেন যে তিনি তিনি মস্কোর দিকে যাচ্ছিলেন।
শেষবার তিনি ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েছিলেন তাতে বলেছিলেন, তিনি ইউক্রেন ছেড়েছেন ও বাড়ি ফেরার অপেক্ষায় আছেন।
সূত্র: বিবিসি









