যুক্তরাষ্ট্র কি চায় ইউক্রেনের কাছে পরাজিত হোক রাশিয়া?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ২২:১২আপডেট : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ২২:১২

ইউক্রেনীয় নেতারা যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতির পাশাপাশি ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভর করছেন। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্তগুলো তাদের ভবিষ্যৎ গঠনে বড় ভূমিকা রাখছে। সম্প্রতি ইউক্রেনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে তাদের উদ্বেগ, ক্লান্তি ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। গত বসন্ত ও গ্রীষ্মে যুদ্ধক্ষেত্রে কিছু সাফল্য অর্জিত হলেও, যুদ্ধের মানবিক ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি। কিয়েভজুড়ে যুদ্ধের নিহতদের ছবি ঝুলছে, যা ইউক্রেনের সংগ্রামের সাক্ষ্য বহন করছে। এর মধ্যে রাশিয়ার বোমা হামলা আরও বেড়েছে, বিশেষ করে রাজধানী কিয়েভ ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে। আসন্ন শীতকালকে ইউক্রেনের জন্য সবচেয়ে কঠিন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের ওপর ওয়াশিংটনের সিদ্ধান্তের চাপ অনেক বেশি। আগামী সপ্তাহগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে যুক্তরাষ্ট্র সরবরাহকৃত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে রাশিয়ার ভূখণ্ডের আরও গভীরে আঘাত হানার অনুমতি দেবে কিনা। এটি আমেরিকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হতে পারে। ইউক্রেন ইতোমধ্যে রাশিয়ার সীমান্ত এলাকায় হামলা চালানোর অনুমতি পেয়েছে এবং তারা আরও গভীর লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য অনুমতি চাচ্ছে।

ইউক্রেনের জন্য এটি একটি ন্যায্য দাবি। রাশিয়া তাদের ভূখণ্ড থেকে বোমারু বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করছে। ইউক্রেন চায়, তারা যেসব অস্ত্র পেয়েছে তা দিয়ে নিজেদের সুরক্ষিত করতে। এই পদক্ষেপকে একটি ‘উসকানি’ হিসেবে দেখা হলেও, এটি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষারই একটি অংশ। এর আগে ইউক্রেন যখন মার্কিন অ্যাব্রামস ট্যাংক, এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র চেয়েছিল, তখনও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন হুমকি দিয়েছিলেন। তবে, বাইডেন প্রতিবারই পুতিনের হুমকির মুখে সিদ্ধান্ত নিতে কিছু সময় নিলেও শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের অনুরোধ মেনে নিয়েছেন।

তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। মার্কিন নির্বাচনের মাত্র ৪৭ দিন বাকি। বাইডেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হবেন, সেদিকেও নজর রাখছেন। ইউক্রেনের নেতারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের কাছে তাদের সামরিক ও নৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছেন। তারা বলছেন, নিজেদের রক্ষা করতে ও রাশিয়ার হামলা মোকাবিলায় তাদের আরও বড় অস্ত্র প্রয়োজন।

বাইডেন প্রশাসনের দোটানা ও ইউক্রেনের চাহিদা

গত সপ্তাহে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন কিয়েভ সফর করলেও ইউক্রেনের চাওয়া সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানাননি। ইউক্রেনের নেতারা আশা করেছিলেন যে, ব্লিঙ্কেন তাদের দাবিগুলো নিয়ে বাইডেনের সঙ্গে আলোচনা করবেন। কিন্তু তা এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, ‘আমরা এটি নিয়ে কাজ করছি’। তার এই মন্তব্য যা ইঙ্গিত দেয় যে তারা এ বিষয়ে ধৈর্য ধরছেন। তবে ইউক্রেনের সামরিক গোয়েন্দা প্রধান কিরিলো বুদানোভ আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, পুতিন প্রতিবারই যুক্তরাষ্ট্রের বিলম্বকে অনুমতি হিসেবে গ্রহণ করেন। তাকে আরও কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি করতে হবে। পুতিনের জন্য বিষয়টি খুবই সহজ হয়ে যাচ্ছে।

কামানের গোলার ঘাটতিতে রয়েছে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

জেলেনস্কির চার দফা পরিকল্পনা ও শান্তির আশা

জেলেনস্কি আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাইডেনের সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং সেখানে তিনি যুদ্ধের অবসান ঘটানোর জন্য চার দফা পরিকল্পনা উপস্থাপন করবেন। যদিও তিনি এখনও এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেননি। তবে ইউক্রেনের অবস্থান স্পষ্ট যে, যুদ্ধ শেষ করতে তারা প্রস্তুত। কিন্তু সেই সঙ্গে তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অগ্রগতি চাইছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা প্রায়ই রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের কারণে সংঘাত বৃদ্ধির আশঙ্কা করে আসছেন। পুতিন প্রায়ই এই ধরনের হুমকি দিয়ে আসছিলেন। তবে চীনের পরামর্শে তিনি তা থেকে পিছিয়ে এসেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের অন্য একটি উদ্বেগ হলো, রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন শত্রুদের অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কিছু ঘটেনি। পুতিন বরাবরই বলেছেন যে, তারা ইউক্রেনের সঙ্গে নয়, বরং পুরো পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে।

বাইডেনের দ্বিধা ও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। বাইডেন প্রশাসন ইউক্রেনের জয়ের কথা প্রকাশ্যে বলছে না। প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেছেন, ‘যতদিন প্রয়োজন, ততদিন যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে সহায়তা করবে’। কিন্তু কী ধরণের বিজয় যুক্তরাষ্ট্র চাইছে তা স্পষ্ট নয়। এটি স্পষ্ট যে, ইউক্রেনকে হারতে দেওয়া যাবে না, কিন্তু রাশিয়াকে হারানো হবে কিনা তা নিয়ে বাইডেন প্রশাসন দ্বিধায় রয়েছে।

ইতিহাস বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের দ্বিধা পূর্বেও ইউক্রেনের জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। ১৯৯১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ. ডব্লিউ. বুশ ইউক্রেন সফরকালে স্বাধীনতা না চাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তার সেই বক্তব্য ইতিহাসে ‘চিকেন কিয়েভ’ নামে পরিচিত হয়ে আছে। সেই সময়, বুশের উদ্বেগ ছিল রাশিয়ার পতন নিয়ে। এখন আবারও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিধা ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের বর্তমান অবস্থা উদ্বেগজনক। তারা কিছু অঞ্চল দখল করলেও পূর্বাঞ্চলের ডনবাস এলাকায় রাশিয়ার আগ্রাসন তীব্র হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা ইউক্রেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

যুদ্ধের তৃতীয় বছরের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, ইউক্রেনের নাগরিকরা এখনও আশায় বুক বাঁধছে। তারা চায় যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণ সমর্থন দিয়ে তাদের বিজয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। যাতে করে এই দীর্ঘ ও বিধ্বংসী যুদ্ধের অবসান ঘটে। অন্যথায়, বাইডেনের জন্য ‘চিকেন কিয়েভ’ ভাষণের মতো একটি নতুন অধ্যায় লেখা হতে পারে।

সূত্র: পলিটিকো

/এএ/
সম্পর্কিত
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যের জের, মমতার বিরুদ্ধে মামলা
মধ্যপ্রাচ্যের তিন যুদ্ধবিরতিকেই কেন যুদ্ধ মনে হচ্ছে
মহাকাশ কম্পিউটিংয়ের প্রথম উদ্ভাবন কেন্দ্রের অনুমোদন চীনের
সর্বশেষ খবর
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মামলাজট নিরসনের উদ্যোগ জোরদারের দাবি মন্ত্রীর
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মামলাজট নিরসনের উদ্যোগ জোরদারের দাবি মন্ত্রীর
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যের জের, মমতার বিরুদ্ধে মামলা
হাদি হত্যা নিয়ে মন্তব্যের জের, মমতার বিরুদ্ধে মামলা
তীব্র গরমে ৪ জনের মৃত্যু
তীব্র গরমে ৪ জনের মৃত্যু
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
বজ্রপাতে একদিনে ১২ জনের মৃত্যু
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি