ট্রাম্পের মন্তব্যে হতবাক ইউক্রেনীয়রা, হারাচ্ছেন আস্থা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ২০:০৩আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ২০:০৩

কিয়েভের স্বাধীনতা স্কয়ারে দাঁড়ানো নাতালিয়া ক্লিমিউকের চোখে হতাশা। রাশিয়ার আগ্রাসনে নিহত সেনাদের স্মরণে গত ১১ বছর ধরে তিনি এই স্মৃতিসৌধের দেখভালের কাজ করে আসছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে তিনি এবং অনেক ইউক্রেনীয়ই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন।

মঙ্গলবার ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো এস্টেট থেকে ট্রাম্প ইউক্রেনের নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কিকে রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের জন্য দায়ী করেন। তিনি বলেন, তোমাদের এই যুদ্ধ শুরুই করা উচিত ছিল না। যদিও বাস্তবে ইউক্রেনীয় নেতারা এই যুদ্ধ শুরু করেননি। ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইউক্রেনীয়দের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করেছে।

৫১ বছর বয়সী ক্লিমিউক বলেন, আমি আলোচনায় বিশ্বাস করি না। ট্রাম্প সবসময় পুতিনের বন্ধু ছিলেন, আমি বিশ্বাস করি না যে তিনি হঠাৎ আমাদের বন্ধু হয়ে গেছেন। তিনি জেলেনস্কির পিছনে শুধু নিজের স্বার্থ হাসিল করছেন।

স্বাধীনতা স্কয়ারে হেঁটে যাওয়া মারিনা ইভাশিনার বাবা এই যুদ্ধে নিহত হয়েছেন এবং তার স্বামী যুদ্ধে নিখোঁজ। ৩০ বছর বয়সী মারিনা বলেন, এটা আমার জন্য খুব কঠিন—আমি বিশ্বাস করি না যে ভালো কিছু হবে। আমি এই আলোচনায় বিশ্বাস করি না।

ট্রাম্পের মন্তব্য ইউক্রেনীয়দের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশার প্রতিফলিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে সম্পর্কের নতুন গতিপথ ইউক্রেনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। গত ডিসেম্বরে অনেক ইউক্রেনীয় ট্রাম্পের ওপর আস্থা রাখলেও এখন তারা হতাশায় ভুগছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওলেহ সাকিয়ান বলেন, অনেক মানুষ বাইডেনের অনিশ্চয়তায় ক্লান্ত ছিল এবং তারা আশা করেছিল যে ট্রাম্প রাশিয়াকে যুদ্ধ বন্ধ করতে বাধ্য করবেন। কিন্তু এখন তারা হতাশ।

মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকেও আক্রমণ করেন এবং রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনায় ইউক্রেনে নতুন নির্বাচনের প্রস্তাব দেন। বুধবার তিনি জেলেনস্কিকে ‘স্বৈরশাসক’ বলে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন যে, জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছেন।

সাকিয়ান বলেন, ইউক্রেনীয়রা তাদের সরকার পছন্দ নাও করতে পারে, কিন্তু তারা স্বাধীনভাবে পছন্দ করার অধিকারে গভীরভাবে বিশ্বাস করে। ট্রাম্প যখন ইউক্রেনীয়দের বললেন যে তাদের নির্বাচন দরকার, তখন তারা রেগে গেলো।

পূর্ব ইউক্রেনে যুদ্ধরত এক সেনা বলেন, আমি স্পষ্ট বলতে পারি: ট্রাম্প পুতিনের মতো। তিনি কখনও সত্য বলবেন না এবং যা খুশি তাই বলবেন। ইউক্রেনের ট্রাম্পের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।

উত্তর ইউক্রেনের চেরনিহিভ সিটি কাউন্সিলের সদস্য ইউলিয়া গ্রেবনিয়েভা বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্য তার কাছে বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, আমরা তার কাছ থেকে এমন কিছু আশা করেছিলাম যা আমাদের জয়লাভে সাহায্য করবে, শুধু শত্রুর সঙ্গে বসে কথা বলার জন্য নয়।

অনেকে আশা করেছিলেন যে, ট্রাম্প ইউক্রেনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন। কিন্তু তিনি ইউক্রেনকে যুদ্ধের জন্য দায়ী করেন এবং জেলেনস্কির জনপ্রিয়তা মাত্র ৪ শতাংশ বলে মিথ্যা দাবি করেন। বাস্তবে জেলেনস্কির জনপ্রিয়তা ৪২ থেকে ৫৭ শতাংশ।

ইউক্রেনীয়দের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা আরও কমে গেছে যখন রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি আলোচনা ইউক্রেনের অংশগ্রহণ ছাড়াই শুরু হতে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইউক্রেনীয় ভেটেরান ইভহেন ডাইকি ফেসবুকে লিখেছেন, বিদায় আমেরিকা। আমাদের এই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে যে আটলান্টিকের ওপারে আমাদের আর কোনও মিত্র নেই।

জেলেনস্কির বিরোধীরাও ট্রাম্পের মন্তব্যে ক্ষুব্ধ। সেন্টার ফর পলিসি ফরমেশনের বিশ্লেষক ও জেলেনস্কির কট্টর সমালোচক ওলেকসান্ডর নোটেভস্কি বলেন, ইউক্রেনীয়রা তাদের সরকার পছন্দ নাও করতে পারে, কিন্তু তারা তাদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেবে। ট্রাম্পের মতো বিদেশি সমালোচনা শুধু জেলেনস্কির ওপর আক্রমণ নয়, এটি ইউক্রেনের সার্বভৌম সরকার ও রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ।

ইউক্রেনীয়রা এখন উদ্বিগ্ন যে, তারা যুক্তরাষ্ট্রকে মিত্র হিসেবে হারাচ্ছে। লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্সের ইউক্রেনীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারিয়া জোলকিনা বলেন, কিছু বিষয় ইঙ্গিত দিচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্র আর ইউক্রেনের মূল মিত্র নয়। আলোচনা শুরুর আগেই ট্রাম্প ইউক্রেনের জন্য মৌলিক কিছু বিষয় ত্যাগ করেছেন, যেমন ন্যাটো সদস্যপদ ও ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ। তিনি দখলদারিত্বকে ছাড়পত্র দিয়েছেন।

ইউক্রেনের সেনারাও ট্রাম্পের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনছেন। ৮২তম এয়ার অ্যাসল্ট ব্রিগেডের এক সেনা বলেন, ৮২তম এয়ার অ্যাসল্ট ব্রিগেডের মূল কাজ হলো দখলদারদের কাছ থেকে ইউক্রেনের ভূখণ্ড মুক্ত করা এবং আমাদের দেশ রক্ষা করা। ট্রাম্পের বক্তব্য যাই হোক না কেন, আমরা এই কাজ চালিয়ে যাব।

ইউক্রেনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ওলেকসান্ডর মেরেজকো বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্য সত্ত্বেও ইউক্রেনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংলাপ বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, পরিস্থিতি কঠিন, কিন্তু আশাহীন নয়। ট্রাম্প নিজেই এমন পরিস্থিতিতে পরামর্শ দেন: কখনও হাল ছেড়ো না!

সূত্র: নিউ ইয়র্ক টাইমস

/এএ/
সম্পর্কিত
মার্কিন যুদ্ধবিরতি প্রত্যাখ্যান হিজবুল্লাহর, চলছে ইসরায়েলি হামলা
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নে মার্কিন চাপ মানছে না ওমান
রাশিয়া যাচ্ছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রী খলিলুর রহমান
সর্বশেষ খবর
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
এই অর্জন বাংলাদেশের শক্তিশালী কূটনৈতিক অবস্থানকে তুলে ধরে: খলিলুর রহমান  
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
‘মুখ খোলো মমতা, জানতে চায় জনতা’ স্লোগানে ইনকিলাব মঞ্চের মশাল মিছিল
আর্জেন্টিনা আরও চার ফুটবলারকে প্রস্তুত রাখছে
আর্জেন্টিনা আরও চার ফুটবলারকে প্রস্তুত রাখছে
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
কুমিরের আক্রমণে সন্তানের মৃত্যুর পর ফজিলাকে খুঁজে পেলো পরিবার
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী