শান্তি আলোচনার পূর্বে ইউক্রেন ও রাশিয়া যুদ্ধের এক নতুন মাত্রা শুরু হয়েছে। রবিবার রাশিয়ার সীমান্তবর্তী ব্রিয়ানস্ক অঞ্চলে একটি যাত্রীবাহী ট্রেনের নিচে থাকা সড়কসেতু বিস্ফোরণে উড়ে গেছে। পাশাপাশি ইউক্রেন হামলা চালিয়েছে সাইবেরিয়ায় অবস্থিত রাশিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন বোমার ঘাঁটিতে। একই সঙ্গে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘটিত হয়েছে যুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ড্রোন লড়াই। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে সোমবার অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনার প্রাক্কালে এই উত্তেজনা তৈরি হলো। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি নিশ্চিত করেছেন যে, তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রুস্তেম উমেরভ আলোচনায় অংশ নেবেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রস্তাবে আলোচনাটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
এর আগে প্রথম দফা আলোচনার প্রধান অর্জন ছিল সবচেয়ে বড় যুদ্ধবন্দি বিনিময়। তবে সংঘর্ষ বন্ধের বিষয়ে এখনও কোনও সমঝোতার আভাস নেই।
এদিকে রাশিয়ার ব্রিয়ানস্ক অঞ্চলে মস্কোগামী একটি যাত্রীবাহী ট্রেনের নিচে সড়কসেতু বিস্ফোরণে অন্তত সাতজন নিহত এবং ৬৯ জন আহত হয়েছে। ট্রেনটিতে ৩৮৮ জন যাত্রী ছিলেন। হামলার দায় স্বীকার করেনি কেউ।
অন্যদিকে, ইউক্রেন প্রথমবারের মতো ৪ হাজার ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরের সাইবেরিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে রাশিয়ার ৪০টি পারমাণবিক-ক্ষমতাসম্পন্ন যুদ্ধবিমান আঘাত হেনেছে বলে দাবি করেছেন ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়া রাতারাতি ৪৭২টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যা এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় একক ড্রোন আক্রমণ। পাশাপাশি সাতটি ক্ষেপণাস্ত্রও ছোড়া হয়েছে।
রাশিয়া দাবি করেছে, তারা ইউক্রেনের সুমি অঞ্চলে আরও গভীরে অগ্রসর হয়েছে। ওপেন সোর্স সূত্রে প্রকাশিত ইউক্রেনপন্থি মানচিত্র অনুযায়ী, রাশিয়া মে মাসে ৪৫০ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করেছে, যা গত ছয় মাসের মধ্যে দ্রুততম অগ্রগতি।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দুই পক্ষকে শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর আহ্বান জানিয়েছেন। শান্তি না এলে ইউক্রেনকে সমর্থন না দেওয়ার হুমকিও দিয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের এই অবস্থান ইউরোপীয় শক্তিগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ট্রাম্পের দূত কিথ কেলগ জানান, আলোচনায় দুই পক্ষই নিজ নিজ শান্তি প্রস্তাব পেশ করবে। তবে তিন বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে মতপার্থক্য এখনও বিস্তর।
রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে সর্বাত্মক হামলা শুরু করে। এর আগে আট বছর পূর্ব ইউক্রেনে রুশপন্থি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে ইউক্রেনীয় বাহিনীর সংঘর্ষ চলছিল। মার্কিন হিসাবে, ২০২২ সালের পর থেকে এই যুদ্ধে ১২ লাখের বেশি মানুষ হতাহত হয়েছে।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে পুতিনকে ‘উন্মাদ’ ও জেলেনস্কিকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি হুমকি দিয়েছেন যে, পুতিন যদি শান্তিতে বিলম্ব করেন, তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।
গত বছর জুনে পুতিন যুদ্ধ থামানোর জন্য শর্ত দিয়েছিলেন ইউক্রেনকে ন্যাটো সদস্যপদ প্রত্যাহার এবং ডনেস্ক, লুহানস্ক, খেরসন ও জাপোরিজ্জিয়া অঞ্চল থেকে ইউক্রেনকে সেনা সরিয়ে নিতে হবে। এই চারটি অঞ্চল রাশিয়া দখল করে রেখেছে।
ইউক্রেনের পক্ষ থেকে আলোচনায় যে প্রস্তাবনা পেশ করা হবে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে— শান্তিচুক্তির পর ইউক্রেনের সামরিক শক্তির ওপর কোনও বিধিনিষেধ থাকবে না, রাশিয়ার দখল করা ভূখণ্ডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে না এবং ইউক্রেনের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি থাকবে। এছাড়া বর্তমান ফ্রন্টলাইনকেই পরবর্তী আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের এক-পঞ্চমাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে— যা যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইয়ো রাজ্যের সমান।









