মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির মধ্যে গত রবিবার এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠক শেষে ট্রাম্প জানিয়েছেন, রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধ বন্ধে তারা একটি চুক্তির ‘খুব কাছাকাছি’ থাকতে পারেন। তবে ইউক্রেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তার মতো মৌলিক বিষয়গুলো কীভাবে সমাধান করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে আক্রমণ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইউক্রেনের প্রায় ১৯.২ শতাংশ বা ১ লাখ ১৬ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা রাশিয়ার দখলে রয়েছে। ইউক্রেনপন্থি মানচিত্র অনুযায়ী, গত তিন বছরের তুলনায় এটি ১.২ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে ২০২৫ সালে রুশ বাহিনী ২০২২ সালের পর সবচেয়ে দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়েছে।
রাশিয়া দাবি করছে, ২০১৪ সালে দখল করা ক্রিমিয়া ছাড়াও ডনেস্ক, লুহানস্ক, জাপোরিজ্জিয়া ও খেরসন এখন আইনগতভাবে তাদের অংশ। তবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বড় অংশ একে অবৈধ হিসেবেই দেখে। অন্যদিকে রাশিয়া এখনও পুরো ডনবাস দখল করতে পারেনি। ক্রেমলিন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, শান্তি চাইলে ডনেস্কের অবশিষ্ট ৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা থেকে ইউক্রেনকে পিছু হটতে হবে। তা না হলে আরও ভূখণ্ড হারানোর হুমকি দিয়েছে মস্কো।
কিয়েভ অবশ্য কোনও ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে। তারা বর্তমান ফ্রন্ট লাইন বরাবর যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে। ট্রাম্প ও জেলেনস্কি জানিয়েছেন, ডনবাসের ভবিষ্যৎ এখনও নির্ধারিত হয়নি। তবে ট্রাম্পের মতে, আলোচনা ‘সঠিক পথে’ এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক ২৮ দফার শান্তি পরিকল্পনায় ভূখণ্ড ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে একটি ‘মুক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল’ গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যদিও এর কার্যকারিতা এখনও অস্পষ্ট। রাশিয়ার সংবাদপত্র কোমারসান্ট জানিয়েছে, পুতিন পুরো ডনবাসের বিনিময়ে ইউক্রেনের অন্য কিছু অঞ্চল ছেড়ে দিতে আগ্রহী হতে পারেন।
অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে ইউক্রেন এবার শক্তিশালী নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চাইছে। জেলেনস্কি জানান, যুদ্ধ বন্ধের খসড়া রূপরেখায় ১৫ বছরের জন্য মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে। তবে তিনি ট্রাম্পের কাছে ৫০ বছরের গ্যারান্টি চেয়েছেন। ট্রাম্প চান ইউরোপ এই নিরাপত্তার সিংহভাগ দায়িত্ব নিক। অন্যদিকে মস্কো স্পষ্ট জানিয়েছে, ইউক্রেনে যেকোনও বিদেশি সেনার উপস্থিতি তাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য। এ ছাড়া ইউক্রেনের সেনাবাহিনীর আকার সীমিত করা এবং রুশ ভাষাভাষীদের সুরক্ষার দাবিও তুলেছে মস্কো।
পুতিনের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, ন্যাটোর বিস্তার বন্ধের লিখিত প্রতিশ্রুতি। মার্কিন শান্তি প্রস্তাবে ইউক্রেনকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত না করার জন্য সংবিধান সংশোধনের কথা বলা হয়েছে। বিপরীতে ইউক্রেন ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাতা চুক্তির অনুচ্ছেদ ৫-এর মতো নিরাপত্তা গ্যারান্টি দাবি করছে।
মার্কিন প্রস্তাবে যুদ্ধের কারণে নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা রাশিয়াকে পুনরায় বিশ্ব অর্থনীতিতে একীভূত করা এবং জি-৮-এ ফিরিয়ে আনার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। এর বিনিময়ে জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং খনিজ সম্পদ উত্তোলনে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির পরিকল্পনা করছে ওয়াশিংটন। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় ৯০ বিলিয়ন ইউরো ঋণের সিদ্ধান্ত নিলেও রাশিয়ার জব্দ করা অর্থ ব্যবহারের বিষয়টি এড়িয়ে গেছে।
শান্তি আলোচনার প্রক্রিয়ায় কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে। এ ছাড়া ওয়াশিংটন ইউক্রেনে নির্বাচনের বিষয়টি সামনে এনেছে। জেলেনস্কির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নির্বাচন না হওয়ায় পুতিন কিয়েভের নেতৃত্বের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে কিয়েভের দাবি, সামরিক আইনের মধ্যে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে নির্বাচন সম্ভব নয়।









