গ্রিনল্যান্ডে কাজ করছেন বাংলাদেশিরা, নতুন সম্ভাবনা

মুনজের আহমদ চৌধুরী, লন্ডন
২১ জানুয়ারি ২০২৬, ২২:৪৩আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ২২:৪৩

ডিসকো বে-র সুউচ্চ বরফশৈলীর ওপর যখন ভোরের সূর্য উঁকি দেয়, তখন গ্রিনল্যান্ডের বাতাসে কেবল বরফ ভাঙার শব্দই প্রতিধ্বনিত হয় না, বরং শোনা যায় এক বৈচিত্র্যময় কর্মীবাহিনীর ব্যস্ততা। ২০২৬ সালে এসে বিশ্বের বৃহত্তম এই দ্বীপে এক নীরব জনতাত্ত্বিক বিপ্লব তার শিখরে পৌঁছেছে। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে গ্রিনল্যান্ড মূলত ডেনিশ বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল; কিন্তু আজ দেশটির অর্থনীতিকে সচল রাখতে এশীয় অভিবাসী শ্রমিকরা অপরিহার্য হয়ে উঠেছেন।

ইলুলিসাতের হাই-টেক মাছ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র থেকে শুরু করে নুুক শহরের বিশাল বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্প; সবখানেই বাংলাদেশ, ফিলিপাইন, ভারত ও পাকিস্তানের শ্রমিকদের উপস্থিতি আজ চোখে পড়ার মতো। স্থানীয় শ্রমশক্তির সংকট এবং ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যার ভিড়ে গ্রিনল্যান্ড এখন পূর্বের দেশগুলোর দিকে তাকিয়ে আছে। এর ফলে দক্ষিণ এশীয় এই অভিবাসীরা কার্যত আর্কটিক অর্থনীতির নতুন মেরুদণ্ড হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

ফিনিশ বা চীনা কর্মীরা একসময় গ্রিনল্যান্ডের সেবা ও মৎস্য খাতে আধিপত্য বিস্তার করলেও, ২০২৬ সালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবণতা হলো দক্ষিণ এশীয়দের সংখ্যাবৃদ্ধি। রাজধানী নুকে এখন বাংলাদেশি, ভারতীয় বা পাকিস্তানি নাগরিকদের দেখা পাওয়া মোটেও বিরল কোনও ঘটনা নয়। গ্রিনল্যান্ডের পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং সাম্প্রতিক শ্রম প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশটিতে বিদেশি বংশোদ্ভূত জনসংখ্যা প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। এর মধ্যে নর্ডিক দেশগুলোর বাইরে এশীয়রাই সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল জনগোষ্ঠী।

বিশেষ করে বাংলাদেশি শ্রমিকরা এখানে নিজেদের জন্য এক অনন্য অবস্থান তৈরি করে নিয়েছেন। নিজ দেশে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে উন্নত জীবনের আশায় অনেকেই এই সুদূর উত্তরে পাড়ি জমিয়েছেন। মাত্র ৫৭ হাজার জনসংখ্যার এই দেশে দক্ষিণ এশীয়দের সংখ্যা কয়েকশ হলেও, নির্মাণ শিল্প, আতিথেয়তা এবং বিশেষায়িত পরিচ্ছন্নতা সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে তাদের অবদান দেশটির জিডিপিতে বিশাল প্রভাব ফেলছে।

গ্রিনল্যান্ডের অর্থনীতির মূল ভিত্তি এখনও মৎস্য শিল্প। রয়্যাল গ্রিনল্যান্ডের মতো বড় কোম্পানিগুলো তাদের উপকূলীয় কারখানাগুলোর জন্য এশিয়া থেকে নিয়মিত কর্মী নিয়োগ দিচ্ছে। তবে ২০২৬ সালের ‘নতুন গ্রিনল্যান্ড’ এখন আরও বিস্তৃত। নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলো তৈরির ফলে দক্ষ কারিগরদের চাহিদা আকাশচুম্বী হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম প্রতিকূল পরিবেশেও কারিগরি দক্ষতা নিয়ে কাজ করছেন ভারতীয় ও পাকিস্তানি প্রকৌশলী ও শ্রমিকরা। এছাড়া গ্রিনল্যান্ড যখন নিজেকে একটি বিলাসবহুল পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলছে, তখন হোটেল ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে রন্ধনশৈলী সবখানেই এশীয় প্রবাসীদের ছোঁয়া পাওয়া যাচ্ছে।

গ্রিনল্যান্ডে কাজ করছেন বাংলাদেশিরা, নতুন সম্ভাবনা

বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এই কর্মীরা কি কেবলই সাময়িক অর্থ উপার্জনের জন্য এসেছেন, নাকি তারা ভবিষ্যৎ নাগরিক? প্রবণতা বলছে, অনেকেই এখন দীর্ঘমেয়াদী বসবাসের সুযোগ খুঁজছেন। গ্রিনল্যান্ড সরকারও গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজতর করেছে। ইউরোপের অন্যান্য দেশে যখন অভিবাসন নিয়ে কড়াকড়ি, তখন গ্রিনল্যান্ডে দক্ষ শ্রমিকদের জন্য যেন লাল গালিচা সংবর্ধনা অপেক্ষা করছে।

সুদূর উত্তর গোলার্ধের এই জীবনে এশীয় অভিবাসীরা এক টুকরো এশিয়াকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। নুকের বাজারের তাকে এখন সিলের মাংস বা রেইনডিয়ারের পাশেই শোভা পাচ্ছে ঢাকা বা লাহোরের মশলাপাতি। যদিও ইনুইট ঐতিহ্য এবং শিকারি সংস্কৃতির সঙ্গে দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতির পার্থক্য অনেক, তবুও প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার লড়াই উভয় সম্প্রদায়কেই এক সুতোয় বেঁধেছে। ভাষা একটি বড় বাধা হলেও, ইংরেজি এখন ফিলিপিনো মৎস্যজীবী, বাংলাদেশি ছুতার এবং স্থানীয় শিকারিদের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করছে।

২০২৬ সালের এই সময়ে দাঁড়িয়ে এটি স্পষ্ট যে, ডেনমার্কের ওপর থেকে অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা কমাতে গ্রিনল্যান্ডের জন্য এই আন্তর্জাতিক কর্মীবাহিনী অপরিহার্য। বাংলাদেশি ও দক্ষিণ এশীয় এই অভিবাসীরা কেবল দেশটির অর্থনীতিকে টিকিয়েই রাখছেন না, বরং তারা আধুনিক এক আর্কটিক রাষ্ট্র গঠনে সমান অংশীদার হয়ে উঠছেন। তপ্ত গ্রীষ্মের দেশ ছেড়ে যারা মধ্যরাতের সূর্যের এই দেশে ভাগ্য গড়তে এসেছেন, তাদের জন্য গ্রিনল্যান্ড এখন এক নতুন পেশাদার দিগন্ত।

দক্ষিণ এশীয় কর্মীদের জন্য ২০২৬ সালে গ্রিনল্যান্ডে যাওয়ার নিয়মকানুন কিছুটা স্বতন্ত্র। গ্রিনল্যান্ড যেহেতু ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বা শেনজেন এলাকার অন্তর্ভুক্ত নয়, তাই ডেনিশ দূতাবাসের মাধ্যমে বিশেষ ‘ভ্যালিড ফর গ্রিনল্যান্ড’ পারমিট সংগ্রহ করতে হয়। বর্তমানে কোনও কোম্পানি থেকে নিয়োগপত্র বা স্পনসরশিপ থাকা বাধ্যতামূলক। দক্ষ পেশাদারদের জন্য ‘ফাস্ট-ট্র্যাক’ স্কিমের মাধ্যমে এখন মাত্র এক মাসেই পারমিট পাওয়া সম্ভব। ২০২৬ সালের নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এই পারমিটের মেয়াদ এখন এক বছরের পরিবর্তে দুই বছর পর্যন্ত করা হয়েছে।

/এএ/
সম্পর্কিত
মানুষ ঠান্ডা করার ‘ফ্রিজ’ আনলো জাপান
হয়তো শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগপত্র লিখতে জানেন না: মহুয়া মৈত্রের কটাক্ষ
চান্দিপুরা ভাইরাসে রাজস্থানে শিশুর মৃত্যু, গুজরাটে শনাক্ত ১২
সর্বশেষ খবর
যমজ দুই বোনের সাফল্য দেখে গর্বিত বাবা-মা, খুশি শিক্ষকরা
যমজ দুই বোনের সাফল্য দেখে গর্বিত বাবা-মা, খুশি শিক্ষকরা
খাল খনন শেষে ৬৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও
খাল খনন শেষে ৬৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিলেন ইউএনও
‘দুই দিন ধরে খাইনি, ভাত নিয়ে আসো’ বলার পর অসুস্থ যুবককে পিটিয়ে হত্যা
‘দুই দিন ধরে খাইনি, ভাত নিয়ে আসো’ বলার পর অসুস্থ যুবককে পিটিয়ে হত্যা
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ভাইরাল, সেই রুনা ডিবির হাতে গ্রেফতার
আর্জেন্টিনার জার্সি পরে ভাইরাল, সেই রুনা ডিবির হাতে গ্রেফতার
সর্বাধিক পঠিত
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
দলীয় এমপির ভিডিও ভাইরাল ইস্যুতে যা বললো জামায়াত
দলীয় এমপির ভিডিও ভাইরাল ইস্যুতে যা বললো জামায়াত
শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধের মুখে টিটিই বরখাস্ত, ৮ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু
শিক্ষার্থীদের রেলপথ অবরোধের মুখে টিটিই বরখাস্ত, ৮ ঘণ্টা পর ট্রেন চলাচল শুরু