দীর্ঘদিন ধরে প্লাটিনাম-প্রতিরোধী ওভারিয়ান (ডিম্বাশয়) ক্যানসারে আক্রান্ত নারীদের চিকিৎসার সুযোগ ছিল সীমিত। এই ধরনের ক্যানসার প্রচলিত প্লাটিনামভিত্তিক কেমোথেরাপিতে আর সাড়া দেয় না। তবে মিরভেটুক্সিম্যাব সোরাভটানসিন নামে একটি টার্গেটভিত্তিক ওষুধ এ পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
‘এলাহিয়ার’ নামে বাজারজাত হওয়া এ ওষুধকে ক্যানসার বিশেষজ্ঞরা গত দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে ডিম্বাশয়ের ক্যানসার চিকিৎসায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তৃতীয় ধাপের মিরাসল পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর এ নিয়ে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় এ চিকিৎসা রোগীদের আয়ু বাড়ানোর পাশাপাশি জীবনমানও উন্নত করে। এ ফলাফলের পর ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-সহ কয়েকটি দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত রোগীদের জন্য এ চিকিৎসা অনুমোদন দিয়েছে।
প্রচলিত কেমোথেরাপি সুস্থ ও ক্যানসারাক্রান্ত উভয় ধরনের কোষেই আঘাত হানে। কিন্তু মিরভেটুক্সিম্যাব সোরাভটানসিন বিশেষভাবে ‘ফোলেট রিসেপ্টর-আলফা’ নামের একটি প্রোটিন বহনকারী ডিম্বাশয়ের ক্যানসার কোষকে লক্ষ্য করে কাজ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের নির্ভুল লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা উন্নত পর্যায়ের ডিম্বাশয়ের ক্যানসার চিকিৎসায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
মিরভেটুক্সিম্যাব সোরাভটানসিন অ্যান্টিবডি-ড্রাগ কনজুগেটস শ্রেণির একটি ওষুধ। এতে লক্ষ্যভিত্তিক অ্যান্টিবডির সঙ্গে ক্যানসার ধ্বংসকারী ওষুধের কার্যকারিতা একত্র করা হয়েছে। এটি ক্যানসার কোষের পৃষ্ঠে থাকা ফোলেট রিসেপ্টর-আলফার সঙ্গে যুক্ত হয়ে সরাসরি টিউমারের ভেতরে ওষুধ পৌঁছে দেয়। ফলে সুস্থ টিস্যুর ক্ষতি কম হয়।
এ ওষুধটি মূলত এফআরএ-পজিটিভ এপিথেলিয়াল ডিম্বাশয় ক্যানসার, ফ্যালোপিয়ান টিউব ক্যানসার অথবা প্রাইমারি পেরিটোনিয়াল ক্যানসারে আক্রান্ত সেই নারীদের জন্য, যাদের রোগ প্লাটিনামভিত্তিক কেমোথেরাপির বিরুদ্ধে প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ডিম্বাশয়ের ক্যানসার বিশ্বে সবচেয়ে প্রাণঘাতী স্ত্রী-রোগজনিত ক্যানসারগুলোর একটি। উপসর্গ স্পষ্ট না হওয়ায় অনেক সময় রোগটি দেরিতে শনাক্ত হয়। যাদের ক্যানসার প্লাটিনামভিত্তিক কেমোথেরাপিতে সাড়া দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তাদের চিকিৎসার ফলও সাধারণত ভালো হয় না।
মিরাসল পরীক্ষায় ৪৫০ জনের বেশি এফআরএ-পজিটিভ, প্লাটিনাম-প্রতিরোধী ডিম্বাশয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত নারী অংশ নেন। সেখানে মিরভেটুক্সিম্যাব সোরাভটানসিনের সঙ্গে প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনা করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এ ওষুধ গ্রহণকারীদের গড় বেঁচে থাকার সময় প্রায় ১৬ দশমিক ৫ মাস, যেখানে কেমোথেরাপি নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে তা ছিল প্রায় ১২ দশমিক ৮ মাস। রোগের অগ্রগতি বিলম্বিত হওয়ার সময় ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৬ মাস, যা কেমোথেরাপির ক্ষেত্রে প্রায় ৪ মাস। এ ছাড়া বেশি সংখ্যক রোগীর টিউমারের আকার কমেছে এবং মৃত্যুঝুঁকি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।
গবেষকেরা আরও জানান, উন্নত পর্যায়ের ক্যানসারে শুধু দীর্ঘায়ু নয়, রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাপন বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। মিরাসল গবেষণায় রোগীদের দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ ওষুধ গ্রহণকারীদের জীবনমান কেমোথেরাপি গ্রহণকারীদের তুলনায় ভালো ছিল। শারীরিক সক্ষমতা ও উপসর্গের চাপ উভয় ক্ষেত্রেই উন্নতি দেখা গেছে। একই সঙ্গে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও তুলনামূলক কম ছিল।
এনএইচএস ইংল্যান্ড বলেছে, এ চিকিৎসা নারীদের পরিবারের সঙ্গে কাটানোর জন্য মূল্যবান অতিরিক্ত সময় দেবে এবং চিকিৎসাকালেও উন্নত জীবনমান বজায় রাখতে সহায়তা করবে।
তবে অন্যান্য ক্যানসারের ওষুধের মতো মিরভেটুক্সিম্যাব সোরাভটানসিনেরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। এর মধ্যে বমিভাব, ক্লান্তি, ঝাপসা দেখা এবং কর্নিয়াসংক্রান্ত জটিলতা উল্লেখযোগ্য। এ কারণে চিকিৎসাকালে নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করাতে হয়। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত কেমোথেরাপির তুলনায় এ ওষুধের সামগ্রিক সহনশীলতা বেশি।
সূত্র: এনডিটিভি









