আফ্রিকার উত্তর উপকূলে অবস্থিত স্পেনের ছোট স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল সেউতা ইউরোপের অন্যতম বড় অভিবাসন সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মরক্কো থেকে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে শহরটিতে প্রবেশের পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, স্থল ও সমুদ্রপথে সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টায় অন্তত ৬৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
৩০ জুলাই থেকে হঠাৎ করেই অভিবাসীদের ঢল শুরু হয়। এতে শেনজেনভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে চরম উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সংকট বেড়ে যাওয়ায় ইতালি স্পেনের সাথে মুক্ত সীমান্ত ভ্রমণের শেনজেন চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিতের ঘোষণা দিলে উত্তেজনা আরও বাড়ে।
শনিবার (১ আগস্ট) স্পেনের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা বলেন, সেউতায় প্রবেশ করা প্রায় সব অভিবাসীকেই মরক্কোয় ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং শহরের পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, তাদের প্রায় সবাই ইতোমধ্যে সেউতা ছেড়ে গেছে। পরিস্থিতি প্রায় পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে।
কেন স্পেনে প্রবেশের চেষ্টা করছেন অভিবাসীরা?
সেউতা সীমান্ত দিয়ে হঠাৎ অভিবাসীদের ঢলের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। তবে শুক্রবার (৩১ জুলাই) স্পেনের আঞ্চলিক নীতিবিষয়ক মন্ত্রী অ্যাঞ্জেল ভিক্টর তোরেস বলেন, চলতি মাসের শুরুতে স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের সঙ্গে এর সম্পর্ক থাকতে পারে।
ওই রায়ে বলা হয়, সেউতা ও মেলিয়ার উদ্দেশে সমুদ্রপথে আসার সময় আটক অভিবাসীদের বিশেষ প্রক্রিয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। তোরেসের মতে, এই সিদ্ধান্ত সাম্প্রতিক অভিবাসী প্রবাহ বৃদ্ধির একটি কারণ হতে পারে।
কোথায় এই সেউতা?
সেউতা আফ্রিকার উত্তর উপকূলে জিব্রাল্টার প্রণালির প্রবেশমুখে অবস্থিত স্পেনের একটি স্বায়ত্তশাসিত শহর, যা চারদিক থেকে মরক্কো দ্বারা বেষ্টিত। ভৌগোলিকভাবে এটি আফ্রিকায় হলেও অঞ্চলটি স্পেনের অংশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বহির্সীমান্ত হিসেবে বিবেচিত।
১৮ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই শহরে প্রায় ৮৫ হাজার মানুষের বসবাস। মরক্কোর সঙ্গে এর স্থলসীমান্ত ৬ দশমিক ৪ কিলোমিটার এবং স্পেনের মূল ভূখণ্ড জিব্রাল্টার প্রণালির ওপারে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
পূর্বে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মেলিয়ার সঙ্গে সেউতা মিলিয়ে আফ্রিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত গড়ে উঠেছে। ১৫৮০ সাল থেকে স্পেনের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই শহরে খ্রিস্টান ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন। আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থানের কারণে শহরটির কৌশলগত গুরুত্বও অনেক।
সেউতা নিয়ে স্পেন ও মরক্কোর বিরোধ
সেউতা নিয়ে স্পেন ও মরক্কোর বিরোধ দীর্ঘদিনের। মরক্কো এই অঞ্চলের ওপর স্পেনের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে না এবং সেউতা ও মেলিয়াকে ‘দখলকৃত অঞ্চল’ বলে উল্লেখ করে। অভিবাসন ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে শহরটি বহুবার উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে।
২০২১ সালের মে মাসে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ শিথিল হওয়ার পর প্রায় ৮ হাজার অভিবাসী মরক্কো থেকে সেউতায় প্রবেশ করেন। পশ্চিম সাহারা ইস্যুকে ঘিরে ওই সময় মাদ্রিদ ও রাবাতের মধ্যে কূটনৈতিক সংকটও তৈরি হয়েছিল।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ সেউতা?
সেউতার গুরুত্ব মূলত এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। এটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আফ্রিকার মধ্যে বিরল স্থলসীমান্তগুলোর একটি। মেলিয়ার পাশাপাশি সেউতাও মরক্কো থেকে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে পরিচিত।
বছরের পর বছর ধরে হাজারো অভিবাসী সীমান্তের বেড়া টপকে, চেকপয়েন্ট অতিক্রম করে কিংবা তারাহাল ব্রেকওয়াটারের বিপজ্জনক সমুদ্রপথ ব্যবহার করে এই অঞ্চলে প্রবেশের চেষ্টা করেছেন। এ পথে প্রবল স্রোত, উত্তাল সমুদ্র এবং কঠোর সীমান্ত নিরাপত্তার মুখে অনেকেই প্রাণের ঝুঁকি নেন।
তবে সেউতায় পৌঁছালেই স্পেন বা ইউরোপের অন্য অংশে অবাধে যাওয়ার সুযোগ মেলে না। অনিয়মিতভাবে প্রবেশকারীদের মূল ভূখণ্ডে যাওয়ার আগে অভিবাসনসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
সূত্র: উইয়ন নিউজ

সেউতা সীমান্তে প্রাণহানি বেড়ে ৬৭, মরক্কোয় ফেরানো হচ্ছে অভিবাসীদের
স্পেনে ঢুকে পড়া ৬০ হাজার মানুষ নিয়ে কঠিন সংকটে ইউরোপের দেশগুলো
৫৭ জনের মৃত্যুর পর সেউতা সফরে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী, বললেন ‘সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন’







