দেশজুড়ে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেওয়ার পর রবিবার রাতে শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তনের দাবিদার শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ স্বীকার করা এবং দাঙ্গাকারীদের সমালোচনা করার মধ্যে ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
ম্যাক্রোঁ বলেন, যারা সম্পত্ত ধ্বংস করেছেন, তাদের মূল্য দিতে হবে। যারা লুটপাট করেছেন, তাদের ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যারা প্রজাতন্ত্রকে ফেলে দিতে চেয়েছেন, তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
কিন্তু প্যারিসের দক্ষিণ-পূর্বের শহরতলি ইভরি-সুর-সেন থেকে আসা ২০ বছর বয়সী ইয়ানিস প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে সন্তুষ্ট হননি। তিনি বলেন, তিনি বরাবরের মতোই কেবল ফাঁকা বুলি আওড়ালেন, সুনির্দিষ্ট কোনও প্রস্তাব দিলেন না। আমরা আবারও রাস্তায় নামব। যতক্ষণ না কোনও পরিবর্তন আসে, ততক্ষণ একের পর এক বিক্ষোভ চলতে থাকবে প্রতি সপ্তাহান্তে, কোনও বিরতি ছাড়াই।
গত সপ্তাহান্তে ব্যাপক ক্ষোভ সহিংস বিক্ষোভে রূপ নেওয়ায় ফ্রান্স যখন সংকটে, তখন অন্তত দেশটির তরুণদের মধ্যে ম্যাক্রোঁর মতো মধ্যপন্থি রাজনীতির আবেদন দ্রুত কমে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কয়েক মাস আগে এই অস্থিরতা রাজনৈতিক বিভাজনকে আরও তীক্ষ্ণ করেছে। রাস্তায় দেখা যাওয়া হতাশার উত্তর হিসেবে নিজেদের তুলে ধরতে চাইছে বিভিন্ন দল।
পপুলিস্ট বামপন্থি নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ শিক্ষার্থী আন্দোলনকে উৎসাহের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন। অন্যদিকে চরম ডানপন্থি নেত্রী মারিন লো পেন বিক্ষোভের সঙ্গে আসা বিশৃঙ্খলার ওপর জোর দিয়ে একে নিরাপত্তা ও কর্তৃত্বের সংকট হিসেবে তুলে ধরছেন। মধ্যপন্থি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু অভিযোগ করেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ওয়ার্ম-আপ রাউন্ড হিসেবে চরম বামপন্থিরা সহিংসতা উসকে দিয়েছে।
নির্বাচনের আগের জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, লড়াইয়ে চরম বাম ও চরম ডান, দুই পক্ষই কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকতে পারে। তবে দেশ পরিবর্তন চাইলেও সেই পরিবর্তন কেমন হবে, তা নিয়ে ঐকমত্য সামান্যই। দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা ম্যাক্রোঁকে নির্বাচনের পর সরে দাঁড়াতে হবে, কারণ সংবিধান তাকে আবার প্রার্থী হতে দেয় না।
ইউপিইসি-প্যারিস ১২-এর পাবলিক ল'র অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক বেলিগ নাবলি বলেন, প্রার্থীদের অবস্থান নিয়ে তরুণদের উদ্দেশে কথা বলা ছাড়া উপায় নেই। তরুণদের উদ্দেশে বার্তা দেওয়া তাদের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। সেই বার্তা অন্তঃসারশূন্য হলে চলবে না, তাকে তাদের দাবির জবাব দিতে হবে।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি বিক্ষোভ শুরুর পর থেকে শিক্ষার্থীরা আরও ভালো স্কুল, আরও শিক্ষক এবং আরও সমতাভিত্তিক ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছেন। তবে আন্দোলন দ্রুত স্কুলের আঙিনা ছাড়িয়ে রাস্তায় নামে এবং বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক উদ্বেগকে ছুঁয়ে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে তরুণদের তুলনামূলক কম অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক প্রচারণার বয়স্ক ভোটার ও পেনশনের মতো বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার প্রবণতা থাকায় এ ইস্যুগুলো অন্যথায় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে আসত না, কিন্তু বিক্ষোভ তা এনে দিয়েছে। নাবলি বলেন, এই আন্দোলন না হলে সবকিছু আগের মতোই চলত। প্রার্থীদের মধ্যে তরুণদের প্রতি একধরনের আপেক্ষিক উদাসীনতা দেখা যেত, কারণ ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের বিপরীতে তরুণেরা নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি সংগঠিত সামাজিক গোষ্ঠী নয়।
মেলশর নেতৃত্বাধীন বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবাউড শিক্ষার্থী আন্দোলনকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছে। সমালোচকেরা অভিযোগ করেছেন, দলটি তরুণদের ক্ষোভ উসকে দিচ্ছে এবং রাজনৈতিক সুবিধার জন্য অস্থিরতাকে কাজে লাগাচ্ছে। তবে তরুণ ভোটারদের মধ্যে দলটির আবেদন বিক্ষোভের আগেই ছিল। এর কর্মসূচিতে আন্দোলনের কয়েকটি কেন্দ্রীয় অভিযোগের সমাধান রয়েছে, যার মধ্যে আছে শিক্ষায় বিনিয়োগ, শিক্ষকদের বেতন এবং উচ্চশিক্ষায় আবেদনের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পারকুরসুপ বাতিল, যাকে অনেকে স্বচ্ছতাহীন মনে করেন।
লে একোর জন্য ওপিনিয়নওয়ের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত জরিপ অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে মেলশ এগিয়ে, ৪৯ শতাংশ তাকে সমর্থন করছেন, যা ২০২২ সালের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি। কিছু তরুণ বিক্ষোভকারীর কাছে মেলঁশোঁকে সমর্থন চরম ডানপন্থার বিরোধিতা এবং রাজনৈতিক মধ্যপন্থার প্রতি হতাশা, দুটোরই প্রতিফলন।
সোমবার জাদুঘরে এক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া একোল দু লুভরের ২১ বছর বয়সী শিক্ষার্থী লিদিয়া বলেন, আমি ফ্রান্স আনবাউডকে ভোট দেব চরম ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি এবং মধ্যপন্থিদের ঠেকাতে, যারা মূলত আমাদের ম্যাক্রোঁ নীতিরই পুনরাবৃত্তি উপহার দেবে।
রাজনৈতিক বর্ণালীর অন্য প্রান্তে লো পেন ও তার ন্যাশনাল র্যালি দল অস্থিরতাকে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে পরিণত করতে চেয়েছে। তারা সরকারকে দেশ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ বলে অভিযুক্ত করেছে এবং প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মেলঁশোঁকে সহিংসতা উসকে দেওয়ার দায়ে অভিযুক্ত করেছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দৌড়ে ৩২ শতাংশ ভোট নিয়ে লো পেনই শীর্ষ প্রার্থী। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে ন্যাশনাল র্যালি ফ্রান্স আনবাউডের পরেই দ্বিতীয় স্থানে।
রবিবার রাতে এক ভিডিও বার্তায় লো পেন বলেন, গতকাল আপনারা আমাদের শহর, আমাদের রাস্তা এবং আমাদের দেশকে নির্যাতিত, বিধ্বস্ত ও লুণ্ঠিত হতে দেখেছেন। তিনি আরও বলেন, আমরা আস্থা ও কর্তৃত্বের গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যা আমাদের গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। তার ভাষ্যে, ফ্রান্স সহিংসতা ও অক্ষমতার মাঝে কার্যত জিম্মি হয়ে ফাঁদে আটকা পড়েছে।
এই দুই বিপরীত আখ্যানের মাঝখানে আটকে আছে ম্যাক্রোঁ মধ্যপন্থি জোট। তার প্রেসিডেন্সি শুরু হয়েছিল ইয়েলো ভেস্ট বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে, আর এখন আরেকটি বড় সামাজিক অস্থিরতার পটভূমিতে তা শেষের দিকে। জ্বালানি করবৃদ্ধিতে শুরু হওয়া ওই আন্দোলন পরে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং ম্যাক্রোঁর অভিজাতদের পক্ষ নেওয়ার বিরুদ্ধে বৃহত্তর বিদ্রোহে রূপ নিয়েছিল।
তখনকার সঙ্গে এখনকার একটি পার্থক্য হলো, পরবর্তী কোনও সরকারেরই চেক বিলিয়ে অস্থিরতা প্রশমনের আর্থিক সুযোগ থাকবে না। গত বছর সরকার দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ দশমিক ১ শতাংশ ঘাটতি নথিভুক্ত করেছে, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চগুলোর একটি। তুলনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের গড় ৩ দশমিক ১ শতাংশ। ভবিষ্যতের যেকোনও প্রেসিডেন্টকে ম্যাক্রোঁর মাথাব্যথার মোকাবিলা করতে হবে, জনক্ষোভ না বাড়িয়ে কীভাবে অর্থ সাশ্রয় করা যায়।
বিক্ষোভ-সহিংসতায় উত্তাল ফ্রান্স, ম্যাক্রোঁ কোথায়?
প্যারিস দ্রুতই মুসলিমদের শহরে পরিণত হবে, ম্যাক্রোঁর সমালোচনায় ট্রাম্প
ক্ষোভের আগুন ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে, বিক্ষোভে উত্তাল আট দেশ