মতুয়া সম্প্রদায়ের তীর্থস্থান পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগরে তৃণমূলের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সফর ঘিরে রবিবার চরম উত্তেজনা ছড়ায়। অভিষেকের আসার খবরে সকাল থেকেই দফায় দফায় উত্তেজনা ঠাকুরনগরের ঠাকুরবাড়িতে। পুলিশে পুলিশে সয়লাব গোটা ঠাকুরনগর। মতুয়া ভক্তদের মূল নাটমন্দিরে ভিড় রাজ্য পুলিশের। তা দেখে মেজাজ হারান কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বিজেপি সাংসদ এবং মতুয়া সম্প্রদায়ের সংঙ্ঘাধিপতি শান্তনু ঠাকুর।
বেলা পৌনে তিনটে নাগাদ অভিষেক মতুয়া ঠাকুরবাড়িতে ঢুকতেই জোর করে ঠাকুরনগরের মন্দিরের ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভেঙে ফেলা হয় অভিষেকের কর্মসূচি উপলক্ষে তৈরি হওয়া তোরণ। মতুয়া ভক্তদের সঙ্গে তৃণমূলের নারীদের মধ্যে চলে ধস্তাধস্তি। সব মিলিয়ে অভিষেক আসার আগেই উত্তপ্ত ঠাকুরবাড়ি চত্বর।
আগেই মুখ্যমন্ত্রীর নামে পোস্টার দিয়েছিল অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসঙ্ঘ। বিষয়টি নিয়ে এদিন কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী তথা বিজেপি সাংসদ শান্তনু ঠাকুরকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘অভিষেক কে? কোন মন্ত্রী ও? বাংলার মন্ত্রী, না কেন্দ্রের? এত সাজগোজ হচ্ছে, মন্ত্রী এলেও হয় না, প্রধানমন্ত্রী যখন এসেছিলেন, তখনও হয়নি। তিনি কে? সাধারণ সাংসদ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় না থাকলে, সাংসদ হিসেবে অভিষেক কে? ব্যক্তিগতভাবে তিনি যেমন সাংসদ, আমিও সাংসদ। ভোটের আগে ঠাকুরবাড়িতে এই মুহূর্তে কী আছে? তার পিসি ঠাকুরের নামে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করবে, তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে নাকি?’
গত ফেব্রুয়ারিতে হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের নাম বিকৃত করার অভিযোগে পথে নেমেছিলেন মতুয়ারা। মুখ্যমন্ত্রীর ভুল উচ্চারণের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করেন তারা। যা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিও হয়। নাটমন্দিরে পুলিশ কেন ঢুকেছে, প্রথমেই প্রশ্ন ছুড়ে দেন তিনি। তার পর কার্যতই পুলিশকে সেখান থেকে সরিয়ে দেন। অভিষেক চলে গেলে গোবরজল দিয়ে ঠাকুরবাড়ির শোধন হবে বলেও জানান শান্তনু।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মতুয়া ঠাকুরবাড়িতে ঢোকার আগে তুমুল বিক্ষোভ শুরু হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় মূল মন্দির, দেখানো হয় কালো পতাকা। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে কেউ কেউ বলতে থাকেন, ‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় চোর’। কেউ আবার সুর চড়িয়ে বলেন, ‘কয়লা চোর, গরু চোর’। এসময় তৃণমূল সমর্থকদের সঙ্গে মতুয়াদের বচসা শুরু হয়। শুরু হয় প্রবল ধাক্বাধাক্কি। মতুয়াদের অভিযোগ, তৃণমূলের গুণ্ডা বাহিনী তাদের ওপর চড়াও হয়।
এই ঘটনায় ৬ নারী আহত হন। তাদের ঠাকুরনগর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মূল মন্দিরে পৌঁছতে পারেননি অভিষেক। পরে পুজো দেন পাশের মন্দিরে। যান বীণাপানি দেবীর ঘরে।
ঠাকুরনগরে পৌঁছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘মতুয়া মন্দির কারও পৈতৃক সম্পত্তি নয়। সকাল থেকে বিজেপির লোকেরা মন্দির ঘিরে রেখেছে। আগামী দিনে মানুষ এর জবাব দেবে। আমি ৩ মাস অন্তর ঠাকুরবাড়িতে আসব, দম থাকলে আটকে দেখাক।’
উত্তপ্ত মতুয়াগড়ে দাঁড়িয়ে চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপি সাংসদের উদ্দেশে বলেন, শান্তনু ঠাকুর যে বাড়িতে থাকেন, সেখানকার জলের ব্যবস্থা মমতা করেছেন। যে রাস্তা দিয়ে হেঁটে তৃণমূলকে চমকাচ্ছেন সেই রাস্তাও মমতার করে দেওয়া। ৩ মাস পর আসবো, দম থাকলে আটকাও।’
পাল্টা জবাব দেন সাংসদ শান্তনুও। তিনি বলেন, ‘অভিষেক এখানে প্রক্সি দিয়ে, দুই মন্ত্রীকে এবং জেলা সভাপতিকে দিয়ে এসব করিয়েছেন। যার জন্য মতুয়া ভক্তরা ক্ষিপ্ত হয়েছেন। আমরা প্রতিজ্ঞা করেছি তাকে ঢুকতে দেব না মন্দিরে। দ্যটস ইট। অভিষেক আমার কাছে একজন সাধারণ মানুষের মতো। আমজনতা যেরকম, অভিষষেকও আমার কাছে তাই। সাংসদ হিসেবে যে ক্যাটেগরি আছে, তার একচুল বাইরে নয়। তার থেকে বড় মন্ত্রণালয় এখন আমার হাতে।তাকে বলে দেবেন যেন না ভোলে, আমার এখন পদ কী।’
এদিকে মতুয়া ঠাকুরবাড়ির উত্তেজনার আঁচ হাসপাতালে পৌঁছায়। হাসপাতালে শান্তনু অনুগামীদের মারধরের অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। আক্রান্ত হন বনগাঁ উত্তরের বিজেপি বিধায়ক অশোক কীর্তনিয়াও। তৃণমূলের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ শান্তনু ঠাকুরের। ঘটনাস্থলে যান তিনি। তার অভিযোগ, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যেয় সারা ঠাকুরনগরে গুণ্ডা লাগিয়ে মতুয়াভক্তদের মারধর করেছে। ইতোমধ্যে ৬জন নারী ভক্ত হাসপাতালে ভর্তি। তাদের চিকিৎসা চলছে। ওই অসুস্থদের ফের মারধর করার জন্য তৃণমূল বাহিনী হাসপাতালের মধ্যে বসে আছে। অপদার্থ পুলিশ তাদের পাহারা দিচ্ছে। ব্রাত্য বসু, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, সুজিত বসুদের মতো গুণ্ডা এনে এই তাণ্ডব চালালো অভিষেক।









