প্রথম দিকে নবজাতক ছেলে আনাসকে খুঁজে পাননি তার মা। বিধ্বস্ত গাজার আল-শিফা হাসপাতাল থেকে ৩১টি রুগ্ণ শিশুর সঙ্গে তাকেও উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলে নিয়ে আসা হয়েছে। ৪৫ দিন ধরে আনাসের দেখা পাননি তার মা।
ওয়ারদা সবেতা নামের ওই মা বলেন, ছেলেকে জীবিত দেখার আশা আমি ছেড়েই দিচ্ছিলাম।
রাফাহ এলাকার একটি হাসপাতালের নবজাতক ইউনিটে এই শিশুদের রাখা হয়েছে। সেখানে আল-শিফা থেকে নিয়ে আসা সব শিশুর একটি নামের তালিকা টানানো হয়েছে। কালো ও সাদা রঙে তালিকায় আনাসের নাম লেখা হয়েছে।
হাসপাতালে হালকা নীল রঙের পোশাক পরা ঘুমন্ত ছেলের দিকে তাকিয়ে সবেতা বলেন, নিজেকে আমার আবারও জীবিত মনে হচ্ছে। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ যে, আমরা নিরাপদে আমাদের সন্তানকে ফিরে পেয়েছি।
ছেলেকে কোলে নেওয়ার পর সবেতার মুখে হাসি ফুটে। তার স্বামী একটি কম্বল দিয়ে তাকে মুড়িয়ে দিতে সহযোগিতা করেন। গোলাপি কম্বলে টুপিও রয়েছে। মোড়ানো হয়ে গেছে ছেলেকে বুকে টেনে নেন তিনি।
যুদ্ধের আগে গাজা সিটিতে বসবাস করতেন ৩২ বছর বয়সী সবেতা। তার আরও সাত সন্তান রয়েছে। এখন তারা দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের একটি স্কুলে বাস করছেন। স্কুলটি উত্তরাঞ্চল থেকে আসা হাজারো মানুষের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে।
সবেতাকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল আনাসের সঙ্গে মিসর যাওয়ার জন্য। সেখানে আনাসকে আরও চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি স্বামী ও অপর সন্তানদের ছেড়ে যেতে চাননি।
তিনি বলেন, সন্তানদের শুধু তাদের বাবার কাছে রেখে যেতে পারি না। তিনি তাদের সবার দেখাশোনা করতে পারবেন না। ফলে আমি ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছিলাম।
আল-শিফা থেকে উদ্ধার হওয়া অপরিণত ৩১ নবজাতকের মধ্যে যে তিন জন গাজায় রয়ে গেছে তাদের একজন আনাস। অপর একজনের পরিচয় জানা যায়নি বলে জানিয়েছেন রাফাহ হাসপাতালের চিকিৎসকরা। তৃতীয় জন সম্পর্কে কোনও তথ্য তারা দেননি।
৯ দিন আগে আল-শিফা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, তাদের হাসপাতালে ৩৯ নবজাতক রয়েছে। এরপর উদ্বেগ শুরু হয়। রাফাহ ক্রসিং দিয়ে তাদের স্থানান্তরের আগে আট শিশুর মৃত্যু হয়।
মঙ্গলবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাসপাতাল থেকে শিশুদের সরিয়ে নেওয়ার আগের রাতেই আট শিশুর মৃত্যু হয়।
‘সে কি বেঁচে আছে?’
রবিবার ৩১ শিশুকে রাফাহতে স্থানান্তর করা হয়। সোমবার এদের মধ্যে ২৮ জনকে মিসরে নেওয়া হয়েছে। ইউনিসেফের মুখপাত্র জেমস এল্ডার মঙ্গলবার বলেছেন, ২০ শিশুর সঙ্গে কোনও স্বজন নেই, ৮ শিশুর সঙ্গে তাদের মায়েরা রয়েছেন। দুই শিশু যমজ হওয়ায় মায়ের সংখ্যা সাতজন।
আনাসের জন্য মিসরের নিরাপত্তা পাওয়ার সুযোগ আর নেই, কিন্তু পরিবারের সঙ্গে তার বিচ্ছেদের অবসান হয়েছে।
সবেতা বলেছেন, ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি আক্রমণ শুরু হওয়ার সময় আল-শিফাতে চিকিৎসাধীন ছিল আনাস।
উত্তর গাজার লাখো মানুষের মতো সবেতা ও তার পরিবারের সদস্যরা পালিয়ে দক্ষিণে চলে আসেন। আনাস থেকে যায় আল-শিফা হাসপাতালে। যেটি ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ, পানি, খাবার ও ওষুধের সংকটে পড়ে।
সবেতা বলেন, আল শিফা থেকে আমাদের ফোন দেওয়া হয়েছিল, বলা হয়েছিল ছেলেকে নিয়ে আসার জন্য। কিন্তু আমাদের জন্য ফিরে যাওয়া অনেক কঠিন ছিল। গাজা সিটিতে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত ছিল, কিন্তু সেখান থেকে বের হওয়ার পথ ছিল বন্ধ।
এক সপ্তাহ আগে ইসরায়েলি সেনারা যখন আল শিফায় প্রবেশ করে তখন বিচ্ছেদের যন্ত্রণা বাড়ে মায়ের। সবেতা বলেন, আমরা আনাস সম্পর্কে কোনও খবর পাচ্ছিলাম না। চেষ্টা করেও তার সম্পর্কে কোনও খোঁজ পাইনি। সে কি বেঁচে আছে? সে কি মারা গেছে? কেউ কি বাচ্চাকে দুধ দিচ্ছে?
খান ইউনিসে যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ার কারণে আনাস সম্পর্কে সঠিক তথ্য পেতে হিমশিম খেতে হয় তার মা-বাবাকে। পরে স্কুলে আশ্রয় নেওয়া অন্যদের কাছ থেকে তারা শুনতে পান শিশুদের দক্ষিণের হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে।
দ্রুত তারা খান ইউনিসের নাসের হাসপাতালে ছুটে যান। কিন্তু সেখানে তাদের বলা হয় রাফাহতে প্রসূতি হাসপাতালে যেতে হবে। শেষ পর্যন্ত এই হাসপাতালেই আনাসের সঙ্গে তাদের পুনর্মিলন ঘটে।
মঙ্গলবার হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাওয়ার মতো সুস্থ ছিল আনাস। তার বাবা-মা তাকে খান ইউনিসের স্কুলে নিয়ে যাচ্ছেন। যেখানে যুদ্ধে উদ্বাস্তু হয়ে পড়া সাত ভাই ও বোনের সঙ্গে নতুন জীবন শুরুর জন্য তার যাত্রা শুরু হবে।
সূত্র: রয়টার্স









