গাজায় ইসরায়েল কী করতে চায়?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৬ জুলাই ২০২৪, ২২:০০আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৪, ২২:০০

গাজায় হামাসকে ‘পরাজিত’ করার ইসরায়েলের লক্ষ্য অর্জন বেশ দূরবর্তী হয়ে পড়েছে। আর বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্প্রতি ঘোষিত ‘তৃতীয় পর্যায়’ আদতে অনেকটাই দখলের মতো মনে হচ্ছে। ইসরায়েল বৃহস্পতিবার বলেছিল, তারা হামাসের পক্ষ থেকে যে সর্বশেষ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, তা তারা বিবেচনা করবে। যা বিশ্বকে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই চুক্তি হলেও গাজায় বর্তমান সংকটের দ্রুত সমাধান নাও হতে পারে।

অন্যদিকে, হামাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবের পূর্বে ইসরায়েল তাদের ‘পরবর্তী পর্যায়’ নিয়ে কথা বলেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসারে, এই পর্যায়ে সংঘাতের তীব্রতা কম থাকবে। তবে এটি এমন একটি পর্যায় যা ইসরায়েলি সেনাদের গাজার ভূখণ্ডে মোতায়েন রাখবে এবং ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্ত করতে লড়াই চালিয়ে যেতে অগ্রাধিকার দেবে।

ইসরায়েলি সরকার এখন পর্যন্ত জোর দিয়ে বলে আসছে, হামাস ‘পুরোপুরি পরাজিত’ না হওয়া পর্যন্ত লড়াই শেষ হবে না। তবে হামাস ও অপর ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীর যোদ্ধারা এমন সব এলাকায় আবারও হাজির হচ্ছে যেখানে ইসরায়েল তাদের পরাজিত করার ঘোষণা দিয়েছিল। ফলে এটি স্পষ্ট হয়ে গেছে, হামাস ও ফিলিস্তিনি যোদ্ধাদের পরাজিত করার লক্ষ্য ইসরায়েল খুব সহসাই অর্জন করতে পারছে না। একই সঙ্গে এর অর্থ হলো, গাজায় ইসরায়েলের উপস্থিতির কোনও নির্দিষ্ট মেয়াদ নেই বলে মনে হচ্ছে।

যুদ্ধে বিধ্বস্ত নগরীতে পরিণত হয়েছে গাজা। ছবি: রয়টার্স

মধ্যপ্রাচ্য কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের সহযোগী ওমর রহমান আল জাজিরাকে বলেছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জন্য এই সংঘাত যতদিন সম্ভব টিকিয়ে রাখার মতো ‘স্বার্থ’ রয়েছে।

অপর বিশ্লেষকেরাও ওমর রহমানের এই মন্তব্যের সঙ্গে একমত।

দোহা ইনস্টিটিউটের ইহাব মাহার্মেহ বলেছেন, গাজায় চলমান গণহত্যা, ধ্বংস, ফিলিস্তিনিদের অনাহার ও জীবিকা ধ্বংসের সঙ্গে ইসরায়েলের কৌশলগত ও নিরাপত্তা বিবেচনা করলে ইসরায়েলের মূল লক্ষ্য গাজা উপত্যকা পুনরায় দখল করা এবং ফিলিস্তিনিদের তাদের ভূমি থেকে সরিয়ে দেওয়ার লক্ষ্যের ইঙ্গিত দেয়।

উদ্দেশ্য

ইসরায়েলের স্থল আক্রমণের আগে কয়েক মাস ধরে রাফাহতে দশ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি আশ্রয় নিয়েছিলেন। এই এলাকায় ইসরায়েলি অভিযানের বিরুদ্ধে নেতানিয়াহু ও তার সরকারের ওপর বৈশ্বিক চাপ বেড়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে।

৯ মে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছিলেন, তিনি ইসরায়েলকে বোমা সরবরাহ স্থগিত রাখবেন যদি ইসরায়েল রাফাহতে আক্রমণ করে।

তবে বাইডেন প্রশাসনের কোনও বিরোধিতা ছাড়াই রাফাহতে রাফাহতে ইসরায়েল অভিযান চালিয়েছে। যদিও তারা এটি সীমিত অভিযান হিসেবে দাবি করেছে। এরপর থেকে যুদ্ধবিরতির আলোচনা থেকে ব্যাহত হয়েছে। দেশে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তার পারদ বেড়েছে। নেতানিয়াহুর সরকার এখন সম্ভবত একটি ভিন্ন লক্ষ্যের দিকে কাজ করছে।

ওমর রহমান বলেছেন, অনেকেই মনে করেন ইসরায়েলের প্রকৃত লক্ষ্য হলো গাজায় ইসরায়েলের অন্তহীন উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ এবং ফিলিস্তিনিদের উপস্থিতির অবসান ঘটানো।

দক্ষিণ গাজায় ইসরায়েলি ট্যাংক। ছবি: রয়টার্স

দোহা ইনস্টিটিউটের হানি আওয়াদ বলেছেন, ইসরায়েলের লক্ষ্য হলো যত বেশি সম্ভব ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে জাতিগতভাবে নির্মূল করা। ইসরায়েল জেনে গেছে, ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের শক্তি শাসন, পরিচিতি কিংবা কোনও গোষ্ঠীর পরিচালনায় আসেনি, বরং একটি ঐক্যবদ্ধ ফিলিস্তিনি সমাজের অস্তিত্ব থেকে উদ্ভূত।

যদিও ইসরায়েল সরকারের মধ্যে কিছু চরম ডানপন্থি নেতা গাজা পুরোপুরি দখল এবং বসতি স্থাপনের পক্ষে ছিলেন। তবে নেতানিয়াহু জোর বলে আসছেন, এটি তার অবস্থান নয়।

তবে, গাজার চারপাশে একটি ‘বাফার জোন’ জোর করে তৈরি এবং উপত্যকার প্রাণকেন্দ্র বরাবর একটি করিডোর নির্মাণের চেষ্টার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটি পাল্টে দিতে চাইছে ইসরায়েল।

মধ্যপ্রাচ্য ইনস্টিটিউটের ইয়াল লুরি-পার্দেস আল জাজিরাকে বলেছেন, আমার দীর্ঘদিনের বিশ্লেষণ হলো যে ইসরায়েলের প্রধান লক্ষ্য হলো গাজাকে পশ্চিম তীরের মতো করে ফেলা। তারা পশ্চিম তীরের মতো গাজার সামরিক ও নিরাপত্তা ইস্যুগুলো পরিচালনা করতে চায়, কিন্তু বেসামরিক ইস্যুগুলো নয়।

তিনি আরও বলেন, গাজায় ইসরায়েলি অভিযানের ‘তৃতীয় পর্যায়’-এর ধারণা হলো যে ইসরায়েল একটি শহরের ভেতরে সেনাবাহিনীর পুরো একটি ব্রিগেডের প্রয়োজন নেই। একে পশ্চিম তীরের মতো ভাবুন। তারা মূল জনসংখ্যার বাইরে অবস্থান করে। কিন্তু সবসময় ছোট অভিযানে শহরের ভেতরে প্রবেশ বা অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা রাখে।

ইসরায়েলের দ্বিধা

নেতানিয়াহু একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে আসছেন। তবে তার বিকল্প প্রস্তাবগুলো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে খুব বেশি সমর্থন পায়নি।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে নেতানিয়াহু গাজায় যুদ্ধের পর সম্ভাব্য বিভিন্ন পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে আরব দেশগুলো– বিশেষ করে মিসর, জর্ডান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত–শিবির পুনর্নির্মাণ ও পরিচালনার সাহায্য করবে।

বাইডেন বলেছেন, আরব দেশগুলো গাজা পুনর্নির্মাণে সহায়তা করতে ইচ্ছুক। তবে গাজায় দৈনন্দিন শাসন পরিচালনায় তাদের আগ্রহের কোনও প্রমাণ নেই।

মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল্লাহ বিন জায়েদ টুইটারে বলেছেন, গাজা উপত্যকয় ইসরায়েলের উপস্থিতির ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে এমন কোনও পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ প্রত্যাখ্যান করে আমিরাত।

তিনি আরও বলেছিলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলি দখলে থাকা গাজা উপত্যকার বেসামরিক প্রশাসনে অংশগ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স

কিন্তু এমনকি যদি নেতানিয়াহু দীর্ঘ দিন দেশের ভেতরে যে ক্ষোভ বিরাজ করছে সেটির কাছে নতিস্বীকার করেন, তবু ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় নীতিতে পরিবর্তনের কোনও নিশ্চয়তা নেই।

আওয়াদ বলেছেন, এই অবস্থান শুধু নেতানিয়াহুর জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি পুরো ইসরায়েলি শাসন কাঠামো, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর অবস্থান।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, নেতানিয়াহুর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ইসরায়েলি রাজনীতির মূলধারায় প্রতিফলিত হয়। তার প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গান্টজ এবং তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্ট রয়েছেন।সম্প্রতি ওয়াশিংটন সফরের সময় মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তারা সাক্ষাৎ করেছেন।

রহমান বলেন, যদি নেতানিয়াহুর সরকার ক্ষমতা ছাড়ে এবং নতুন কেউ ক্ষমতায় আসে তাহলেও ইসরায়েল এমন একটি দ্বিধার সম্মুখীন হবে। তারা গাজা উপত্যকা থেকে সামরিকভাবে নিজেকে প্রত্যাহার করতে পারবে না নিজেদের অনিচ্ছা বা ফিলিস্তিনিদের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনুধাবনে অক্ষমতার কারণে।

ইসরায়েল ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় হামাসের কাছে শাসন বা নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দিতে চায় না। তবে কেন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধান ছাড়াই আরব দেশগুলো ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইসরায়েলের হয়ে গাজা পুনর্নির্মাণ, শাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখবে?

সেনা প্রত্যাহারের জন্য কী প্রয়োজন?

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমে সম্প্রতি বলা হয়েছে, সেনাবাহিনী লেবানন সীমান্তের দিকে সেনা সরিয়ে নিচ্ছে একটি বৃহত্তর যুদ্ধের আশঙ্কায়। কিন্তু সামরিক বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের কোনও চিহ্ন নেই। এমন কিছু হলে বর্তমান পরিস্থিতিতে তা হবে অস্বাভাবিক।

আওয়াদ বলেছেন, ইসরায়েলের সামরিক প্রচেষ্টায় এই ঘাঁটিগুলোকে স্থায়ী করার লক্ষ্য হাজির হচ্ছে। যা ইঙ্গিত দিচ্ছে ইসরায়েল সামরিকভাবে পরাজিত না হওয়া বা যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চলবে। কোনও নাটকীয় মার্কিন নীতির পরিবর্তন বা গাজায় অপ্রত্যাশিত বিধ্বংসী পরাজয় না ঘটলে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে। আপাতত যুদ্ধের অবসান হবে না বলেই মনে হচ্ছে।

রহমান বলেন, ইসরায়েলের অন্য কোনও পরিকল্পনা নেই।

সূত্র: আল-জাজিরা।

/এএ/
সম্পর্কিত
কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বললেন আরাঘচি
ইরাকে অস্ত্র জমা দেওয়ার ঘোষণা ইরানপন্থি দুই মিলিশিয়া গোষ্ঠীর
বোফোর্ট দুর্গে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে হিজবুল্লাহর হামলা
সর্বশেষ খবর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম