এখনও ইসরায়েলকে মরণ কামড় দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে হামাসের

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
০৯ অক্টোবর ২০২৪, ১৭:৩৬আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৪, ১৭:৫৮

এক বছর আগে দক্ষিণ ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের আকস্মিক হামলার জেরে অবরুদ্ধ গাজায় উপত্যকায় সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। হামাসকে নির্মূল করার উদ্দেশে পরিচালিত এই অভিযানে নারী ও শিশুসহ হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। তবে ইসরায়েল অনেক হামাস যোদ্ধা ও কমান্ডারকে হত্যার দাবি করেছে।

এই যুদ্ধে গাজার অধিকাংশ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া সত্ত্বেও হামাসকে ধ্বংসের যে পণ ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু করেছিলেন, তা এখনও পূরণ হয়নি। হামাস দুর্বল হলেও গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর সোমবারের আক্রমণের প্রথম বার্ষিকীতে এবারও ইসরায়েলে বেশ কয়েকটি রকেট ছুড়েছে হামাস। ধারণা করা হচ্ছে, গোষ্ঠীটির আরও কিছু অত্যাধুনিক সামরিক সক্ষমতা এখনও অক্ষত রয়েছে৷ হামাসের সামরিক শাখার এক মুখপাত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ‘দীর্ঘ ও বেদনাদায়ক যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার’ অঙ্গীকার করেছেন।

হামাসের অবশিষ্ট ক্ষমতা নিয়ে মঙ্গলবার (৮ অক্টোবর) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। 

হামাসের যোদ্ধাদের সংখ্যা

গাজায় ১৭ হাজারেরও বেশি যোদ্ধাকে হত্যা ও বন্দি করার দাবি করেছে ইসরায়েল। যুদ্ধের আগে, হামাসের যোদ্ধা সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার ছিল বলে অনুমান করা হয়েছিল। তবে গোষ্ঠীটি কখনও এই তথ্য নিশ্চিত করেনি।

যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত গাজায় হামাসের আধিপত্য ছিল। সরকারি মন্ত্রণালয় ও পুলিশসহ বেসামরিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল গোষ্ঠীটির হাতে। সেসব প্রতিষ্ঠানের কিছু কর্মকর্তাদের গাজায় হামাসের শাসনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে যুক্তি দেখিয়ে লক্ষ্যবস্তু করেছে ইসরায়েল।

তবে হামাসের কোন সদস্যদের হত্যা করা হয়েছে সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কোনও তথ্য নেই। হামাসও সাধারণত নির্দিষ্ট নেতাদের হত্যার ইসরায়েলি দাবিকে নিশ্চিত বা অস্বীকার করে না।

গবেষণা সংস্থা ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির সন্ত্রাসবিরোধী কর্মসূচির পরিচালক ম্যাথিউ লেভিট বলেছেন, ‘এখন পর্যন্ত নিহত যোদ্ধাদের বেশিরভাগই পদাতিক সেনা কি-না তা স্পষ্ট নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই মানুষদের মধ্যে কতজন কট্টর বিশ্বাসী ছিলেন এবং কতজন এই কাজটিকে হাতের কাছে পাওয়া চাকরি ভেবে করছিলেন, তা নিশ্চিত নয়। তবে অনেক হামাস কমান্ডার ও নেতা যে নিহত হয়েছেন তা স্পষ্ট।’

হামাসের একটি রকেট কারখানা ধ্বংসের দাবি ইসরায়েলের। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

জুলাইয়ে ইরানের রাজধানী তেহরানে একটি বিস্ফোরণে হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর কাতার-ভিত্তিক নেতা ইসমাইল হানিয়েহ নিহত হন। এই হামলার জন্য হামাস ও ইরান উভয়ই ইসরায়েলকে দায়ী করেছে। তবে হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ।

আগস্টে ইসরায়েল দাবি করেছিল, এক মাস আগে দক্ষিণ গাজায় একটি বিমান হামলায় হামাসের সামরিক শাখার নেতা এবং ৭ অক্টোবরের হামলার মূল মাস্টারমাইন্ড মোহাম্মদ দেইফকে হত্যা করেছে তারা। দেইফের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি হামাস। ঘনবসতিপূর্ণ ওই এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয়েছিল। এটিকে একটি ‘মানবিক অঞ্চল’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল ইসরায়েলি সেনাবাহিনী।

মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুসারে, গোষ্ঠীটির নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার জীবিত রয়েছেন বলে মনে করা হয়। তবে কয়েক মাস ধরেই তার কাছ থেকে নির্দিষ্ট কোনও অডিও বা ভিডিও রেকর্ডিং বার্তা পাওয়া যায়নি। সিনওয়ার অনেক আগেই ইলেকট্রনিক ডিভাইসের ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং একটি ভূগর্ভস্থ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে বার্তা বাহকের মাধ্যমে সংগঠনের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ রেখে আসছেন।

এই মুহূর্তে হামাসের যত শক্তিই থাকুক না কেন, যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ভবিষ্যতে নতুন যোদ্ধাদের সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রেরণা যোগাতে পারে। ইসরায়েলি সেনারা গাজার আশেপাশের যেসব এলাকা থেকে ইতোমধ্যে সেনা প্রত্যাহার করেছিল সেসব এলাকাতে বারবার তাদের অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে। তাদের যুক্তি, সেসব স্থানে হামাস যোদ্ধারা পুনরায় ফিরে এসেছে।

লেভিট বলেছেন, ‘পরবর্তীতে যা হবে তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। গাজাকে ব্যর্থ রাষ্ট্র হিসেবে ফেলে রাখা হবে বা হামাসকে বাদ দিয়ে ধ্বংসস্তূপে ফিলিস্তিনের স্বশাসিত সরকারের মতো ইতিবাচক কিছু হবে? ভবিষ্যতে যা আসবে তা যদি অতীতের চেয়ে খারাপ কিছু হয় তাহলে তাহলে তা দ্রুত ও ভয়াবহ সশস্ত্র চরমপন্থার দিকে নিয়ে যাবে।’

হামাসের একটি সুড়ঙ্গ। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

হামাসের যে পরিমাণ অস্ত্র রয়েছে

হামাসের অস্ত্রের সক্ষমতা ও মজুদ নিয়ে স্পষ্ট কোনও তথ্য নেই।

যুদ্ধের বেশ কয়েক বছর আগে, ইসরায়েলি গোয়েন্দারা অনুমান করেছিল, হামাস ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর গাজায় প্রায় ৩০ হাজার রকেট ও মর্টার প্রজেক্টাইল লুকানো রয়েছে। রকেটগুলো দূরপাল্লার ও ব্যাপক উন্নত বলে জানা গেছে।

এর মধ্যে কিছু সুড়ঙ্গের মাধ্যমে গাজায় পাচার করা হয়েছিল বা খাদ্য ও ত্রাণের চালানের ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। বাকিগুলো মাটির নিচের ল্যাবে বিস্ফোরিত না হওয়া ইসরায়েলি যুদ্ধাস্ত্র ও ফেলে দেওয়া বর্জ্যের ব্যবহারযোগ্য উপকরণ থেকে তৈরি করা হয়েছিল।

হামাসের এক জুনিয়র কর্মকর্তা জুলাইয়ে টাইমসকে বলেছিলেন, যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে বিস্ফোরক ও ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদনও বাড়াতে শুরু করেছে গোষ্ঠীটি।

ইসরায়েলি সরকারের মতে, গত অক্টোবর থেকে হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠী গাজা থেকে ইসরায়েলে প্রায় ১৩ হাজার ২০০টি রকেট ছুড়েছে, যার এক-চতুর্থাংশই নিক্ষেপ করা হয়েছিল ৭ অক্টোবরের হামলায়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সেনারা গাজার অন্যান্য গোলাবারুদ ও অস্ত্র পরীক্ষাগারগুলো দখলে নিয়ে ধ্বংস করেছে।

সোমবার গাজা থেকে নিক্ষেপ করা চারটি ক্ষেপণাস্ত্র মধ্য ইসরায়েলের খোলা স্থানে আঘাত করেছিল। এর মধ্যে একটিকে প্রতিহত করার দাবি করেছে ইসরায়েল। দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারকারী কেএএন জানিয়েছে, এই হামলায় এক নারী সামান্য আহত হয়েছেন। হামাসের এই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইসরায়েল দক্ষিণ গাজায় একটি বিমান হামলা করেছিল। ওই হামলায় একটি রকেট লঞ্চপ্যাড ধ্বংস করা হয়েছে।

সোমবার ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে হামাস। ছবি: নিউ ইয়র্ক টাইমস

হামাসের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ

বছরের পর বছর সময় ব্যয় করে একটি বিশাল ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ তৈরি করেছে হামাস। সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ বিস্ফোরণবিরোধী দরজা দিয়ে সুরক্ষিত এবং এটি ক্রমাগত ইসরায়েলি আক্রমণ প্রতিরোধে সক্ষম।

যুদ্ধের শুরুর দিকে ইসরায়েল অনুমান করেছিল, সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্ক প্রায় আড়াইশো মাইল পর্যন্ত প্রসারিত। তবে এখন তারা মনে করে, এটি আগের অনুমানের চেয়েও দ্বিগুণ দীর্ঘ।

ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে হামাসের সুড়ঙ্গগুলোকে ধ্বংস করছে। তবে এটি একটি ধীর ও বিপজ্জনক প্রক্রিয়া, এতে বহু বছর সময় লাগতে পারে। হামাস যোদ্ধারা গত বছর থেকে গাজায় প্রায় আড়াইশো জনকে জিম্মি করে তাদের ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গে আটকে রেখেছে। এতে করে সুড়ঙ্গের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা ইসরায়েলের জন্য আরও জটিল হয়ে পড়েছে।

যদিও ৭ অক্টোবরের হামলার আগে কিছু সুড়ঙ্গ অনুসন্ধান করে সেগুলো ধ্বংস করেছিল ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। এক ঊর্ধ্বতন ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, তখন ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গকে সেভাবে আমলে নেওয়া হয়নি। কেননা, গাজায় একটি আগ্রাসন ও সর্বাত্মক যুদ্ধের আশঙ্কা কম ছিল বলে মনে করা হতো।

আক্রমণের পর অবশ্য হিসাব নিকেশ পাল্টে যায়। কেননা, ততদিনে কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছিলেন, এই গোষ্ঠীটি এমন একটি আক্রমণের প্রস্তুতিই নিচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুড়ঙ্গ না থাকলে হামাস ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ওপর এতটা আক্রমণ করতে পারত না।

এই সুড়ঙ্গ অতীতে ইসরায়েলি হামলা থেকে হামাস নেতাদের রক্ষা করেছিল। ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেছেন, স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেওয়ার আগে, বহু দশক ধরে মাটির নিচেই কাটিয়েছেন মুহাম্মদ দেইফ।

এটি সম্ভবত গোষ্ঠীটির জন্য যোগাযোগের একটি প্রাথমিক মাধ্যম হয়ে উঠেছে। সুড়ঙ্গগুলোতে নিজস্ব ল্যান্ডলাইন টেলিফোন নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা ইসরায়েলের পক্ষে পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। গোষ্ঠীর নেতারা যোগাযোগের জন্য মোবাইল ফোন ও পেজারের মতো প্রযুক্তির ব্যবহারও পরিহার করেছেন। এর পরিবর্তে তারা ভূগর্ভস্থ বার্তা বাহকদের মাধ্যমে সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে বার্তা সরবরাহ করেন।

 

/এএকে/এএ/
সম্পর্কিত
কুয়েত ও বাহরাইনে হামলার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে যা বললেন আরাঘচি
ইরাকে অস্ত্র জমা দেওয়ার ঘোষণা ইরানপন্থি দুই মিলিশিয়া গোষ্ঠীর
বোফোর্ট দুর্গে ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে হিজবুল্লাহর হামলা
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক