দখলকৃত গোলান মালভূমির এক প্রত্যন্ত এলাকায় গড়ে ওঠা ইসরায়েলি বসতির নাম ‘ট্রাম্প হাইটস’। এর বাসিন্দারা নতুন করে আশাবাদী হয়েছেন মার্কিন নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয়েছে। তারা মনে করেন, দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হলে এই ছোট্ট জনপদে নতুন প্রাণসঞ্চার হবে।
২০১৯ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পই প্রথম বিদেশি নেতা হিসেবে গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি দেন। এর প্রতিদান হিসেবে ইসরায়েল এই বসতির নামকরণ করে ‘রামাত ট্রাম্প’ বা ‘ট্রাম্প হাইটস’। তবে সেই সময় এই নামকরণ অনুষ্ঠান বেশ আড়ম্বরপূর্ণ হলেও বসতিতে উল্লেখযোগ্য জনবৃদ্ধি দেখা যায়নি। বর্তমানে সেখানে মাত্র কয়েক ডজন পরিবার বসবাস করছে। চাকরির সুযোগও সীমিত। আর প্রতিবেশী লেবাননের হিজবুল্লাহ বিদ্রোহীদের সঙ্গে ইসরায়েলের চলমান সংঘর্ষে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প হাইটসের কমিউনিটি ম্যানেজার ইয়ারডেন ফ্রেইমান জানান, ট্রাম্পের পুনঃনির্বাচন এখানকার মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। আমরা আশা করছি এতে বসতি সম্প্রসারণে তহবিল এবং নিরাপত্তা বাড়ানোর জন্য আরও সহায়তা পাওয়া যাবে।
গোলান অঞ্চলের আঞ্চলিক কাউন্সিলের প্রধান ওরি ক্যালনার জানান, ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে ফেরা অবশ্যই এই শহরটিকে শিরোনামে নিয়ে এসেছে।
বসতির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য ইতোমধ্যে সেখানে নতুন রাস্তা, ল্যাম্পপোস্ট এবং ইউটিলিটি লাইন তৈরি করা হয়েছে।
ফ্রেইমান বলেন, আমরা আমাদের নিজেদের কমিউনিটিতে টিকে থাকার জন্য লড়াই করছি। কিন্তু কাজ করতে পারছি না, শিক্ষাব্যবস্থাও অচল।
ট্রাম্প হাইটস লেবানন ও সিরিয়া থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে। হামলার সাইরেন বাজলে সেখানকার বাসিন্দাদের মাত্র ৩০ সেকেন্ড সময় মেলে নিরাপত্তা বাঙ্কারে যাওয়ার জন্য।
গোলান মালভূমির ওপর ইসরায়েলের অধিকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। ১৯৮১ সালে ইসরায়েল এই কৌশলগত মালভূমি অধিগ্রহণ করে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কোনও দেশই এটি মেনে নেয়নি। ২০১৯ সালে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র গোলানকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। তার এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক নিন্দার মুখে পড়ে। বাইডেন প্রশাসন ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র দেশ হিসেবে এই দখলদারি মেনে নিয়েছে।
ক্যালনার আশা করেন, ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে ইউরোপীয় দেশগুলোকে গোলানের ওপর ইসরায়েলের অধিকার স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করবেন।
ইসরায়েলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গোলান মালভূমিতে ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। এদের অর্ধেক ইহুদি ইসরায়েলি এবং বাকি অর্ধেক আরব দ্রুজ সম্প্রদায়ের। যারা এখনও নিজেদের সিরীয় বলে মনে করেন। ইসরায়েল গোলানে বসতি স্থাপনকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু এই অঞ্চলটি তেল আবিব থেকে দূরে হওয়ায় অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এখানকার অর্থনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়েছে। সেবা খাত সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। গত জুলাই মাসে মজদাল শামসে একটি ফুটবল মাঠে রকেট হামলায় ১২ জন দ্রুজ শিশু নিহত হয়। কয়েক মাস পর ইসরায়েল লেবানন আক্রমণ করে।
ট্রাম্পের গোলান স্বীকৃতি ছিল ইসরায়েলের জন্য তার প্রথম মেয়াদের বেশ কিছু কূটনৈতিক উপহারগুলোর একটি। তিনি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন, আমেরিকার দূতাবাস সেখানে স্থানান্তর করেন এবং আরব দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক চুক্তি সম্পাদনে মধ্যস্থতা করেন, যা ‘আব্রাহাম চুক্তি’ নামে পরিচিত। দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প আবারও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যদিও এর নির্দিষ্ট পরিকল্পনা সম্পর্কে কিছু জানাননি।
ট্রাম্পের প্রতি নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত আনুগত্য বিভিন্ন সময় দেখা গেছে। যদিও বাইডেনের বিজয়ের পর তাকে অভিনন্দন জানানোয় ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। নেতানিয়াহু সম্প্রতি ট্রাম্পকে ‘ইতিহাসের সেরা প্রত্যাবর্তনের জন্য’ অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন, হোয়াইট হাউজে আপনার ফিরে আসা আমেরিকা ও ইসরায়েলের মধ্যে মহান জোটের প্রতি নতুন অঙ্গীকারের সূচনা করবে।
ট্রাম্প হাইটসেও নতুন প্রত্যাশা জেগেছে। ক্যালনার বলেন, গোলানের জনগোষ্ঠী দৃঢ় ও প্রতিকূলতার মধ্যেও স্থিতিশীল। আমি মনে করি, আমরা এই কঠিন সময় কাটিয়ে উঠব এবং আমাদের সম্প্রদায় বাড়বে।
সূত্র: এপি









