লেবাননে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন গাজায় চলমান সংকট সমাধানের জন্য অনুরূপ চুক্তির আশা প্রকাশ করেছেন। এই লক্ষ্যে পুনরায় উদ্যোগ নেওয়ারও ঘোষণা দিয়েছেন তার প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তবে বিশেষজ্ঞরা এই ধারণাকে সময়ের আগে করা মন্তব্য হিসেবে দেখছেন। গাজা সংকট সমাধানের পথ যে লেবাননের তুলনায় অনেক কঠিন, তা বিশ্লেষকরা স্পষ্ট করেছেন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমস এ খবর জানিয়েছে।
লেবাননে যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছে আংশিকভাবে হিজবুল্লাহর দুর্বল অবস্থার কারণে। একাধিক হত্যাকাণ্ড ও যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজয়ের ফলে তারা দর-কষাকষিতে তাদের প্রভাব হারিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু লেবানন চুক্তিতে রাজি হতে পেরেছিলেন, কারণ এতে তার দেশীয় রাজনীতিতে তেমন প্রভাব পড়েনি।
গাজায় সমঝোতা আরও কঠিন। কারণ, হামাস এখনও প্রায় ১০০ জনকে জিম্মি করে রেখেছে। এটি তাদের জন্য একটি বড় সুবিধা, যা তাদের প্রধান আলোচক খালিল আল-হায়াকে কঠোর অবস্থান বজায় রাখতে সাহায্য করছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর জন্য হামাসের সঙ্গে সমঝোতা করা মানে তার জোট সরকারকে ঝুঁকির মুখে ফেলা।
নেতানিয়াহুর ডানপন্থি জোটের অনেকেই গাজা যুদ্ধের পর সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপন করতে চান। তারা হুমকি দিয়েছেন, হামাস পুরোপুরি পরাজিত না হলে জোট ছেড়ে দেবেন। লেবানন ইস্যুতে নেতানিয়াহুর ওপর এই ধরনের চাপ ছিল না, যদিও হিজবুল্লাহর দীর্ঘমেয়াদি হুমকি নিয়ে তার সমর্থকদের উদ্বেগ রয়েছিল।
লেবাননে চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার সময় প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেছিলেন, তিনি গাজা ইস্যুতেও অগ্রগতির আশা করেন। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বাইডেন গাজা সমাধানে নতুন প্রচেষ্টার প্রতিশ্রুতি দেন। নেতানিয়াহু লেবাননের যুদ্ধবিরতিকে হামাসকে বিচ্ছিন্ন করার একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, হিজবুল্লাহর সমর্থন ছাড়া হামাস একা হয়ে পড়েছে। আমরা হামাসের ওপর চাপ বাড়িয়ে আমাদের পবিত্র লক্ষ্য, জিম্মিদের মুক্তি, বাস্তবায়ন করব।
তবে ফিলিস্তিনি বিশ্লেষকরা বলছেন, হামাস এত সহজে তাদের অবস্থান ছাড়বে না। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও গাজায় নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে তারা। ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হওয়ার পর হামাস পাঁচ সদস্যের একটি পরিচালনা পরিষদের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যা আপসের বিরুদ্ধে সিনওয়ারের দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখেছে।
হামাস বুধবার এক বিবৃতিতে তাদের মূল দাবি পুনর্ব্যক্ত করে বলেছে, ইসরায়েলকে গাজা থেকে স্থায়ীভাবে সরে যেতে হবে। ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক মখাইমার আবুসাদা বলেন, লেবাননের যুদ্ধবিরতি গাজায় কোনও প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয় না। এখানে কোনও আলো নেই, শুধু অন্ধকারের সুড়ঙ্গ।
গাজায় স্থায়ী সমাধানের জন্য নেতানিয়াহুকে একটি যুদ্ধোত্তর পরিকল্পনা নির্ধারণ করতে হবে, যা তিনি এড়িয়ে চলছেন। এই ধরনের একটি পরিকল্পনা তার দেশীয় ও বিদেশি অংশীদারদের মধ্যে অগ্রাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে পারে।
সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইছে, যদি তারা গাজা ও পশ্চিম তীরে একটি ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় সম্মত হয়। কিন্তু নেতানিয়াহুর জোট সহযোগীরা ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের বিরোধিতা করছেন। সৌদি আরবের সঙ্গে একটি চুক্তি নেতানিয়াহুকে তার দেশে এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সাফল্য এনে দিতে পারে। তবে তার জোট ভেঙে গেলে তা তার অভ্যন্তরীণ ক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে এবং চলমান দুর্নীতির মামলায় তাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
ইসরায়েলের বিশ্লেষক মাজাল মুআলেম মনে করেন, নেতানিয়াহু সময়ক্ষেপণের কৌশলে পারদর্শী। তিনি বলেন, নেতানিয়াহু সবসময় সময় কিনতে চান এবং পরিস্থিতি সামাল দেন। গতকাল তিনি বাইডেন প্রশাসনের সময় শেষ হওয়া পর্যন্ত সময় কিনেছেন।








