সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেছেন, ইসরায়েল মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিচ্ছে। সোমবার জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন। টাইমস অব ইসরায়েল এ খবর জানিয়েছে।
নেতানিয়াহু বলেন, সিরিয়ার আসাদ সরকার ছিল ইরানের ‘অশুভ চক্রের’ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দীর্ঘ ১৩ বছরের গৃহযুদ্ধের পর বিদ্রোহী গোষ্ঠী দামেস্ক দখল করে আসাদের শাসনের অবসান ঘটায়।
এ ঘটনাকে ইসরায়েলের শত্রুদের বিরুদ্ধে তাদের অস্তিত্বের লড়াইয়ের একটি বড় বিজয় হিসেবে উল্লেখ করেন নেতানিয়াহু।
নেতানিয়াহু বলেন, ইরান আসাদকে ক্ষমতায় রাখতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। কিন্তু এই সরকার নিজ জনগণের বিরুদ্ধে নির্মম নৃশংসতা চালিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আসাদের শাসনকাল ইসরায়েলের প্রতি শত্রুতার ক্ষেত্র তৈরি করেছে এবং এটি ইরানের সন্ত্রাসবাদের একটি কেন্দ্র ছিল।
নেতানিয়াহু উল্লেখ করেন, সিরিয়ার মধ্য দিয়ে ইরান থেকে হিজবুল্লাহর কাছে অস্ত্র সরবরাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ তৈরি হয়েছিল। তবে ওই পথের ওপর ইসরায়েল তাদের সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করেছে।
গোলান মালভূমির নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন নেতানিয়াহু। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৯ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গোলান মালভূমিকে ইসরায়েলের সার্বভৌম এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, গোলান মালভূমি চিরদিন ইসরায়েলের অবিচ্ছেদ্য অংশ থাকবে।
আসাদ সরকারের পতনকে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামাস, হিজবুল্লাহ ও ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। নেতানিয়াহু বলেছেন, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে আক্রমণ চালানোর পর থেকেই ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে এই অশুভ চক্র ভাঙার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, হিজবুল্লাহর নেতা হাসান নাসরাল্লাহকে হত্যা এই অশুভ চক্রের পতনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তার মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে।
নেতানিয়াহু আশা প্রকাশ করেন যে আসাদের পতনের পর একটি নতুন সিরিয়া তৈরি হবে, যা ইসরায়েল ও সিরিয়ার জনগণের জন্য মঙ্গলজনক হবে। তিনি সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলের মানবিক সহায়তার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, আমরা সীমান্তে একটি ফিল্ড হাসপাতাল তৈরি করেছিলাম এবং হাজার হাজার আহত সিরীয়কে চিকিৎসা দিয়েছিলাম। শত শত সিরীয় শিশু ইসরায়েলে জন্মগ্রহণ করেছে। আমরা যারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান চাই, তাদের প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছি। কিন্তু যারা আমাদের ক্ষতি করতে চায়, তাদের হাত আমরা কেটে ফেলবো।
নেতানিয়াহু জানান, ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) সিরিয়া-ইসরায়েল সীমান্তে বাফার জোনে নতুন অবস্থান নিয়েছে। ১৯৭৪ সালের চুক্তি অনুযায়ী এই অঞ্চলে আইডিএফের উপস্থিতি নিষিদ্ধ থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে সেখানে সেনা মোতায়েন করা হয়েছে।
আইডিএফের দাবি, এই পদক্ষেপটি সাময়িক, তবে সেনারা আগামী দিনে সিরীয় ভূখণ্ডে অবস্থান করতে পারে।
নেতানিয়াহু বলেন, আমাদের কার্যক্রম মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিচ্ছে। ইসরায়েল এখন এমন এক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে, যা একাধিক ফ্রন্টে বিজয় অর্জন করছে। যারা আমাদের সহযোগিতা করে, তারা লাভবান হয়। আর যারা আক্রমণ করে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আসাদ সরকারের পতনের ফলে হামাস আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বলে উল্লেখ করেন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, হামাস আশা করেছিল বিভিন্ন ফ্রন্টে আক্রমণ চালিয়ে তারা সহযোগিতা পাবে। কিন্তু তারা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। হিজবুল্লাহর সহায়তা আমরা বন্ধ করেছি, ইরানের প্রভাব কমিয়েছি এবং আসাদ সরকারের পতন নিশ্চিত করেছি।
নেতানিয়াহু আরও বলেন, আমরা সব জিম্মিকে মুক্ত করার জন্য প্রতিটি সম্ভাব্য পথ খুঁজছি। যারা জীবিত, তাদের আমরা ফিরিয়ে আনবো। যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের মরদেহও আমরা ফিরিয়ে আনবো।”
নেতানিয়াহু তার সরকারের যুদ্ধনীতির সাফল্যের কথা তুলে ধরে বলেন, আমরা প্রতিটি ইট সরিয়ে এই চক্র ভেঙে দিচ্ছি। আমাদের লক্ষ্য সম্পূর্ণ বিজয়, যা এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।
তিনি আশ্বস্ত করেন, ইসরায়েল তার শত্রুদের আগে ছিল ও শত্রুদের পরেও থাকবে। আমাদের সামনে আরও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে আমি নিশ্চিত ইসরায়েল বিজয়ী হবে।









