গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতের (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা উপেক্ষা করে হাঙ্গেরি সফর করছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে তার চার দিনের এই সফর। একই সময়ে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ খবর জানিয়েছে।
আইসিসির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হওয়ায় তাত্ত্বিকভাবে হাঙ্গেরির জন্য আদালতের পরোয়ানা মেনে নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান আমন্ত্রণ জানানোর সময়ই স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, তার সরকার এই রায় মানবে না।
দেশে রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই হাঙ্গেরি সফরে গেছেন নেতানিয়াহু। কাতারের সঙ্গে তার তিন সহকারীর সম্ভাব্য যোগসাজশের তদন্তকে কেন্দ্র করে দেশে বিক্ষোভ চলছে। নেতানিয়াহু এই অভিযোগকে ‘ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, কাতারের এক কর্মকর্তা এটিকে কাতারের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা প্রচারণা’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
বুদাপেস্টে গত বুধবার বুদা ক্যাসেলের সামনে একটি মঞ্চ তৈরি করা হচ্ছিল, যেখানে সামরিক সম্মাননা সহকারে নেতানিয়াহুকে স্বাগত জানাবেন অরবান। নেতানিয়াহু যে হোটেলে থাকবেন, সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি দেখা গেছে।
গত নভেম্বরে আইসিসি নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পর এটিই তার দ্বিতীয় বিদেশ সফর। তবে হলোকাস্ট স্মৃতিসৌধে যাওয়া ছাড়া তার কর্মসূচির বিস্তারিত জানানো হয়নি। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রে সফর করেছিলেন নেতানিয়াহু। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র—কোনও দেশই আইসিসির সদস্য নয়। ওয়াশিংটনের যুক্তি, আইসিসি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলার জন্য ব্যবহার হতে পারে।
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে আইসিসি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরদিনই নেতানিয়াহুকে হাঙ্গেরি সফরের আমন্ত্রণ জানান অরবান। গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার জবাবে ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। ওই হামলায় ১ হাজার ২০০ ইসরায়েলি নিহত ও ২৫১ জনকে জিম্মি করে নেওয়া হয়। এরপর থেকে ইসরায়েলের অভিযানে গাজায় ৫০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা উপত্যকা। বিশ্বজুড়ে বিক্ষোভের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা আইসিজেতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা করেছে।
ইসরায়েল সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের বক্তব্য, এসব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ইহুদিবিদ্বেষ দ্বারা প্রভাবিত। ইসরায়েলের দাবি, আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগকারী একটি গণতান্ত্রিক দেশের নেতার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আইসিসি তার সব বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।
অরবানও আইসিসির সমালোচনা করে বলেছেন, আদালতের এই সিদ্ধান্ত ‘ধৃষ্ট, নির্মম ও সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’। আইসিসি জানিয়েছে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর জন্য আদালতের রায় মানা আইনি বাধ্যবাধকতা এবং রায়ের সঠিকতা নির্ধারণ করা রাষ্ট্রগুলোর কাজ নয়।
নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের পাশাপাশি হামাসের সামরিক কমান্ডার মোহাম্মদ দেইফের বিরুদ্ধেও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল আইসিসি। পরোয়ানা জারির পর দেইফের মৃত্যু নিশ্চিত হয়। আদালত হামাস নেতা ইসমাইল হানিয়েহ ও গাজায় হামাসের প্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারের বিরুদ্ধেও গ্রেফতারি পরোয়ানা চেয়েছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার নেপথ্যে ছিলেন এরা। আইসিসির অনুরোধ অনুমোদনের আগেই ইসরায়েলের হামলায় নিহত হন তারা।
নেতানিয়াহুর হাঙ্গেরি সফর শুরু হয়েছে এমন সময়, যখন গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত হচ্ছে। গাজার কিছু অংশ দখল করে নিরাপত্তা অঞ্চল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার এবং বিপুল সংখ্যক ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইসরায়েল। তাদের লক্ষ্য, গাজায় এখনও আটক থাকা ৫৯ জন জিম্মিকে ছাড়াতে হামাসের ওপর চাপ তৈরি করা।








