সিরিয়ার সেনাবাহিনীতে বিদেশি সাবেক জিহাজি বিদ্রোহীদের অন্তর্ভূক্ত করার সরকারি পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অনুমোদনের ফলে সিরিয়া হাজার হাজার বিদেশি সাবেক জিহাদি বিদ্রোহীকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই প্রক্রিয়াকে ‘স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল’ করার শর্ত দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত থমাস বারাক এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই পরিকল্পনার আওতায় প্রায় ৩ হাজার ৫০০ বিদেশি যোদ্ধাকে নতুন গঠিত ৮৪তম সেনা ডিভিশনে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর মধ্যে বেশিরভাগই চীনের উইঘুর মুসলিম এবং মধ্য এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর নাগরিক। এই ডিভিশনে সিরিয়ার সদস্যরাও থাকবেন।
দামেস্কে রয়টার্সের এক প্রশ্নের জবাবে থমাস বারাক বলেন, এই পরিকল্পনার বিষয়ে আমাদের মধ্যে একটি বোঝাপড়া হয়েছে, অবশ্যই স্বচ্ছতা বজায় রাখার ভিত্তিতে। তিনি আরও বলেন, এই যোদ্ধাদের অনেকেই সিরিয়ার নতুন প্রশাসনের প্রতি অত্যন্ত অনুগত। তাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করাই ভালো, না হয় তারা চরমপন্থি গোষ্ঠীগুলোর কাছে ফিরে যেতে পারে।
২০১১ সালে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিদ্রোহী যুদ্ধের একপর্যায়ে বহু বিদেশি যোদ্ধা সিরিয়ায় প্রবেশ করে। তারা আল-কায়েদার শাখা হায়াত তাহরির আল-শাম (এইচটিএস)-এর সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই গোষ্ঠী গত বছর আসাদকে উৎখাত করে ক্ষমতা গ্রহণ করে।
এই বিদেশি যোদ্ধারা দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমাদের কাছে বড় এক উদ্বেগের কারণ ছিল, বিশেষ করে এইচটিএস-এর অন্তর্ভুক্ত চরমপন্থি ইউনিটগুলোতে তাদের সক্রিয়তা।
যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালের মে মাসের আগ পর্যন্ত সিরিয়ার নতুন সরকারের ওপর চাপ দিচ্ছিল, যেন তারা বিদেশি যোদ্ধাদের সেনাবাহিনী থেকে বাদ দেয়। কিন্তু গত মাসে মধ্যপ্রাচ্য সফরে গিয়ে ট্রাম্প সিরিয়ার অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার সঙ্গে সৌদি আরবে বৈঠক করেন এবং আসাদ যুগের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সম্মতি দেন। এরপরেই নীতিগত অবস্থান পাল্টায় ওয়াশিংটন।
সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঘনিষ্ঠ দুটি সূত্র জানিয়েছে, শারার নেতৃত্বাধীন প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা অংশীদারদের বোঝাতে চেয়েছে যে বিদেশি যোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্তি না করে বরং বাইরে রাখলে তারা আইএস বা পুনরুত্থিত আল-কায়েদার হাতে চলে যেতে পারে।
তবে পশ্চিমা দুনিয়ার উদ্বেগ এখনও কাটেনি। গত ডিসেম্বরে এইচটিএস-এর শীর্ষ পর্যায়ের কিছু বিদেশি নেতা সিরিয়ার নতুন সেনাবাহিনীতে উচ্চপদে নিযুক্ত হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।
এই পরিকল্পনায় সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন চীন। কারণ অন্তর্ভুক্ত হতে যাওয়া যোদ্ধাদের একটি বড় অংশই চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় শিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলিম, যারা তুর্কিস্তান ইসলামি পার্টি (টিআইপি) নামের একটি সংগঠনের সদস্য ছিলেন। বেইজিং এই সংগঠনকে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, চীন আশা করে সিরিয়া সন্ত্রাস ও চরমপন্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের প্রতি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।
একইসঙ্গে, তুর্কিস্তান ইসলামি পার্টির রাজনৈতিক কর্মকর্তা ওসমান বুগরা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সংগঠনটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়েছে এবং এখন সম্পূর্ণভাবে সিরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ বাহিনীতে একীভূত।
তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের কার্যক্রম পুরোপুরি জাতীয় নীতিমালার অধীন পরিচালিত হয়। আমাদের আর কোনও আন্তর্জাতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক নেই।
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট শারা জানিয়েছেন, যারা আসাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে এবং নতুন সরকারকে সমর্থন দিচ্ছে, এমন বিদেশি যোদ্ধাদের পরিবারসহ নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক ভাবা হচ্ছে।
দামেস্কভিত্তিক জিহাদি বিশেষজ্ঞ আব্বাস শরিফা বলেন, এই যোদ্ধারা নতুন সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখিয়েছে এবং আদর্শিকভাবে পরিশোধিত বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, তাদের বাদ দিলে তারা সহজেই আইএস বা অন্যান্য চরমপন্থি গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে কূটনৈতিক মহলে ধারণা করা হচ্ছে, এই নতুন অবস্থান কিছুটা কৌশলগত। সিরিয়ার নতুন সরকারকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে ও ইসলামি স্টেট বা আল-কায়েদার সম্ভাব্য পুনরুত্থান ঠেকাতেই ওয়াশিংটনের এই নমনীয়তা।








