গাজা উপত্যকার রাফাহ শহরে ইসরায়েল সরকারের প্রস্তাবিত ‘মানবিক শহর’ প্রকল্পের তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশটির দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াইর লাপিদ ও এহুদ ওলমার্ট। তারা বলেছেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা কার্যত ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি ‘কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে’ পরিণত হবে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ খবর জানিয়েছে।
রবিবার ইসরায়েলি সামরিক রেডিওকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিরোধী দল ইয়েশ আতিদ-এর প্রধান ইয়াইর লাপিদ বলেন, এই পরিকল্পনা নিরাপত্তা, রাজনীতি, অর্থনীতি কিংবা লজিস্টিক কোনও দিক থেকেই ইতিবাচক কিছু বয়ে আনবে না। যদি কাউকে একটি জায়গা থেকে বের হতে না দেওয়া হয়, তাহলে সেটাকে আর কিছু বলা যায় না, এটি একটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প।
একই দিন ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান-কে দেওয়া মন্তব্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট বলেছেন, আমি দুঃখিত, কিন্তু এটা তো সত্যিই একটি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। যদি ফিলিস্তিনিদের সেখানে স্থানান্তর করা হয়, তাহলে এটিকে জাতিগত নির্মূল অভিযান বলা যায়।
ইসরায়েল সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাফাহ শহরের ধ্বংসস্তূপের ওপর গড়ে তোলা হবে এই ‘মানবিক শহর’। সেখানে প্রাথমিকভাবে আল-মাওয়াসি এলাকার ৬ লাখ উদ্বাস্তু ফিলিস্তিনিকে বসবাস করতে বাধ্য করা হবে। দীর্ঘমেয়াদে পুরো গাজা উপত্যকার প্রায় ২০ লাখ মানুষকে সেখানেই স্থানান্তর করা হবে।
এ নিয়ে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ-এর প্রধান ফিলিপ ল্যাজারিনি প্রশ্ন তুলেছেন, এই পরিকল্পনা কি দ্বিতীয় নাকবার সূচনা? প্রস্তাবিত শিবিরগুলো কার্যত মিসর সীমান্তে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি বিশাল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প হয়ে দাঁড়াবে, যা ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমিতে ভবিষ্যতের যেকোনও সম্ভাবনা বিনষ্ট করবে।
ইসরায়েলি স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এপ্রিল থেকে জুলাইয়ের মধ্যে রাফাহ শহরে ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের সংখ্যা ১৫ হাজার ৮০০ থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ হাজার ৬০০-এ। শুধু গত রবিবারই ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৯৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল এই ‘মানবিক শহর’-এর আড়ালে মূলত গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের বিতাড়নের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক গবেষণা সংস্থা মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর গবেষক ওমর রহমান আল জাজিরাকে বলেছেন, এই পরিকল্পনার মাধ্যমে গাজা উপত্যকাকে ধ্বংস, ফিলিস্তিনি সমাজকে ভেঙে ফেলা এবং জোরপূর্বক জনগণকে উৎখাত করার কৌশল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
রহমান আরও বলেন, ইসরায়েল চাচ্ছে, ফিলিস্তিনিরা প্রতিদিনই ক্ষুধার্ত অবস্থায় বন্দি শিবিরে জীবন কাটাক অথবা গুলি খেয়ে মারা যাক। তাদের প্রতিদিনের ‘পছন্দ’ এটাই রাখা হচ্ছে। যার পরিণতিতে তারা যেন নিজেরাই দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।
এদিকে, *গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (জিএইচএফ) নামে একটি বেসরকারি মার্কিন ও ইসরায়েল-সমর্থিত প্রতিষ্ঠান গাজায় ‘হিউম্যানিটারিয়ান ট্রানজিট এরিয়া’ নামে শিবির নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, এই শিবিরে ফিলিস্তিনিরা অস্থায়ীভাবে বসবাস করবে, উগ্রবাদ থেকে দূরে থাকবে, সমাজে পুনঃএকীকরণ ঘটবে এবং পরবর্তীতে ইচ্ছা করলে তারা গাজার বাইরে স্থানান্তরিত হতে পারবে।
জিএইচএফ বর্তমানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অনুমোদিত একমাত্র খাদ্য বিতরণ সংস্থা গাজায়। যদিও মে মাস থেকে এ পর্যন্ত সংস্থাটির বিতরণকেন্দ্রে ত্রাণ সংগ্রহে আসা ৮০০ জন ফিলিস্তিনি ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিবেশী আরব দেশগুলো এবং ফিলিস্তিনি জনগণ এই স্থানান্তর পরিকল্পনাকে সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছে। তবু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে যৌথভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছেন। নেতানিয়াহু বলেন, আমরা এমন দেশ খুঁজছি যারা ফিলিস্তিনিদের জন্য ‘ভবিষ্যৎ’ গড়ে তুলতে আগ্রহী।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও আশাবাদ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ইসরায়েল ঘিরে থাকা দেশগুলোর সঙ্গে দারুণ সহযোগিতা হয়েছে। খুব শিগগিরই ভালো কিছু ঘটবে।









