কয়েক দশকের মধ্যে বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান যুদ্ধ। তবে এই চরম সংকটের মধ্যেও বিশ্বমঞ্চে দেখা গেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। মধ্যপ্রাচ্যের এই বিধ্বংসী সংঘাতের জেরে কিছু দেশ ও অঞ্চলের অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে এক ‘অপ্রত্যাশিত’ সুবাতাস।
লড়াই শুরুর পর তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে আছে। এর ফলে আমদানিকারক দেশগুলো বিকল্প জ্বালানির খোঁজে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর জাহাজ ও বিমান পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো মহাদেশজুড়ে তাদের কার্গো এবং ট্রাফিক রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। এই ওলটপালট পরিস্থিতির কারণে এমন কিছু জায়গায় অর্থনৈতিক ‘বিজেতা’ তৈরি হয়েছে, যা কেউ আগে ভাবেনি। ওমানের বন্দর ও নাইজেরিয়ার শোধনাগার থেকে শুরু করে ভেনিজুয়েলার তেলক্ষেত্র এবং সিরিয়ার আকাশসীমা; যুদ্ধের সম্মুখভাগ থেকে বহু দূরে থাকা এসব অঞ্চলের নিয়ামকেরা পারস্য উপসাগরের অচলাবস্থার শূন্যস্থান পূরণে বড় ভূমিকা রাখছে।
সিরিয়ার আকাশসীমায় বিমানের ভিড়
যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ঝুঁকি এড়াতে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো তাদের ফ্লাইটের রুট পরিবর্তন করছে। এর ফলে সিরিয়ার আকাশসীমা ব্যবহারের পরিমাণ নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের কারণে নিরাপত্তা শঙ্কায় বিগত বছরগুলোতে বেশিরভাগ বিমান সংস্থাই এই দেশটিকে এড়িয়ে চলত।
সিরিয়ার বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে ১১ হাজার ৮০১টি ফ্লাইট সিরিয়ার আকাশসীমা অতিক্রম করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগে, অর্থাৎ গত ফেব্রুয়ারি মাসে এই সংখ্যাটি ছিল মাত্র ৪ হাজার ২৬৭। সেই তুলনায় মে মাসের ট্রাফিক প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।
আকাশসীমা ব্যবহারের এই বড় লাফ দামেস্কের নতুন সরকারের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি চমৎকার উৎসে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতনের পর সিরিয়ার ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রতি ফ্লাইটের জন্য ৪৯৯ ডলারের একটি নির্দিষ্ট ফি নির্ধারণ করে। রয়টার্সের হিসাব অনুযায়ী, কেবল মে মাসের ট্রাফিক থেকেই সিরিয়া সরকারের প্রায় ৫৯ লাখ ডলার রাজস্ব আয় হয়েছে।
বিগত এক দশকের বেশির ভাগ সময় গৃহযুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো সিরিয়ার আকাশসীমা পুরোপুরি এড়িয়ে চলেছে। তবে বর্তমান আঞ্চলিক সংঘাত সাময়িকভাবে সেই ধারাকে উল্টে দিয়েছে। যুদ্ধকবলিত রুটগুলোর বিকল্প খুঁজতে গিয়ে এখন আরও বেশি বিমান সংস্থা সিরিয়ার আকাশপথ বেছে নিচ্ছে।
ভৌগোলিক সুবিধায় ওমানের বাজি
যদিও ওমান এই সংঘাতের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়, মাঝে মাঝেই দেশটিকে ইরানি ড্রোনের অনুপ্রবেশের মুখে পড়তে হয়েছে এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিও রয়েছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত বা কুয়েতের মতো উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের যেভাবে ক্রমাগত হামলার শিকার হতে হয়েছে, ওমানকে তেমন দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, ওমানের প্রধান বন্দরগুলোর অবস্থান হরমুজ প্রণালির ভেতরে নয়, বরং ওমান উপসাগর এবং আরব সাগরের উপকূলে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রফতানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হলেও ওমান নির্বিঘ্নে তাদের এলএনজি রফতানি চালিয়ে গেছে। এমনকি ২০২৬ সালের এপ্রিলে জার্মানির সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ওমান গ্যাস সরবরাহও শুরু করেছে। ওক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের তথ্য মতে, ২০২৫ সালে ওমান ১৫ দশমিক ১ বিলিয়ন ঘনমিটার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস রফতানি করেছে, যার মধ্যে প্রায় ১৩ দশমিক ৯ বিলিয়ন ঘনমিটার পারস্য উপসাগরের বাইরের বিশ্ববাজারে পৌঁছেছে।
এই অচলাবস্থার কারণে ওমানের লজিস্টিক অবকাঠামোর গুরুত্বও অনেক বেড়ে গেছে। সংঘাতপূর্ণ রুটগুলোর বিকল্প খুঁজতে গিয়ে ওমানের বন্দর, মজুদাগার ও শিপিং হাবগুলোতে বাণিজ্যিক তৎপরতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে সোহার বন্দর একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সশিপমেন্ট পয়েন্ট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গত ৩০ মে, আবু ধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি সোহার বন্দরের মাধ্যমে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে স্থানান্তরের পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রতি মাসে প্রায় ১০ লাখ টন ন্যাপথা রফতানি পুনরায় শুরু করেছে। এর ফলে উপসাগরের অন্যত্র অচলাবস্থা থাকা সত্ত্বেও ওমানের মাধ্যমে তাদের চালান পাঠানো সম্ভব হচ্ছে।
ইউরোপের সংকট মেটাচ্ছে নাইজেরিয়া
উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রফতানি ব্যাহত হওয়ার পর ইউরোপের বাজারে জেট ফুয়েলের (বিমানের জ্বালানি) তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। আর এই সুযোগে ইউরোপের বাজারে জ্বালানি সরবরাহের এক অপ্রত্যাশিত ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে নাইজেরিয়ার ড্যাঙ্গোট পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি।
দৈনিক ৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন আফ্রিকার এই বৃহত্তম শোধনাগারটি তাদের রফতানি বহুগুণ বাড়িয়েছে। গত মঙ্গলবার লন্ডনে আয়োজিত এক জ্বালানি সম্মেলনে ড্যাঙ্গোট রিফাইনারির প্রধান নির্বাহী (সিইও) ডেভিড বার্ড বলেন, তাদের শোধনাগারে চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত জেট ফুয়েল উদ্বৃত্ত রয়েছে এবং তারা বিশ্বজুড়ে যেকোনও বাজারে তা সরবরাহ করতে সক্ষম।
এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে ইউরোপে, যেখানে বিমান সংস্থা এবং জ্বালানি সরবরাহকারীরা তীব্র সংকট ও চড়া মূল্যের মুখোমুখি হয়েছিল। শিপিং ইন্টেলিজেন্স ফার্ম কেপলার-এর তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিল মাসে ড্যাঙ্গোট শোধনাগার থেকে ইউরোপে রেকর্ড ২ লাখ ৭২ হাজার মেট্রিক টন জেট ফুয়েল পাঠানো হয়েছে, যা মার্চ মাসের তুলনায় ৭৫ শতাংশ বেশি। এর আগে গত সেপ্টেম্বরে শোধনাগারটি সর্বোচ্চ রফতানির রেকর্ড গড়েছিল, এপ্রিলের থেকেও তা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বেশি।
এই মাসে নাইজেরিয়ান জেট ফুয়েলের সবচেয়ে বড় গন্তব্য ছিল ফ্রান্স, যেখানে ১ লাখ ৬৩ হাজার মেট্রিক টন জ্বালানি পাঠানো হয়েছে। এর পরের অবস্থানে থাকা স্পেন পেয়েছে ৮৮ হাজার মেট্রিক টন এবং যুক্তরাজ্য আমদানি করেছে ২২ হাজার মেট্রিক টন।
বিশ্ববাজারে ফিরলো ভেনিজুয়েলা, ভারতের বিশেষ নজর
পারস্য উপসাগরের অপরিশোধিত তেলের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে বৈশ্বিক বাজারে ভেনিজুয়েলার গুরুত্ব নতুন করে বাড়ছে।
চলমান সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের দৈনিক ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল রফতানি এখন ঝুঁকির মুখে। এর ফলে এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার তেল শোধনাগারগুলো তাদের সরবরাহের উৎস বহুমুখীকরণ করতে বাধ্য হচ্ছে। ভেনিজুয়েলার জন্য এই পরিস্থিতি একটি উপযুক্ত সুযোগ হয়ে এসেছে। বিশ্বের বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুত থাকা সত্ত্বেও দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটি বছরের পর বছর ধরে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বিনিয়োগের অভাব এবং উৎপাদন হ্রাসের কারণে কোণঠাসা হয়ে ছিল। কিন্তু চলতি বছরের শুরুতে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং তেল উৎপাদন পুনরুত্থানের ফলে বৈশ্বিক এই তেলের চাহিদা পূরণে কারাকাস এখন বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।
শিপিং ডাটা এবং ভেনিজুয়েলার রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি পিডিভিএসএ-এর রেকর্ড অনুযায়ী, মে মাসে ভেনিজুয়েলার অপরিশোধিত তেল রফতানি দৈনিক ১২ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছে, যা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং এটি টানা তৃতীয় মাসের মতো বৃদ্ধির রেকর্ড। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই রফতানি ৬১ শতাংশ বেড়েছে এবং বিশ্বের সব বড় বড় বাজারে তাদের চালান যাচ্ছে। মে মাসে ভেনিজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্র দৈনিক ৫ লাখ ৫৮ হাজার ব্যারেল, ভারত ৪ লাখ ২৭ হাজার ব্যারেল এবং ইউরোপ ১ লাখ ৬৯ ব্যারেল তেল আমদানি করেছে।
বিশেষ করে ভারত উপসাগরীয় সরবরাহের বিকল্প হিসেবে কারাকাসের সঙ্গে তাদের জ্বালানি সম্পর্ক আরও গভীর করতে তৎপর হয়েছে। চলতি সপ্তাহেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নয়া দিল্লিতে ভেনিজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজকে স্বাগত জানান। বৈঠকে দুই পক্ষই জ্বালানি খাতের আপস্ট্রিম ও ডাউনস্ট্রিম প্রকল্পের সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা রুদ্রেন্দ্র ট্যান্ডন জানান, কারাকাস ভারতকে জ্বালানি খাতে তাদের ‘পছন্দের অংশীদার’ হিসেবে বিবেচনা করে। আগামী ৭ জুন রদ্রিগেজের এই সফর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে এবং এর মধ্যে তিনি ভারতের শীর্ষস্থানীয় জ্বালানি কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন।
সূত্র: আল-মনিটর









