ইসরায়েলের আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে আইনগতভাবে যতটুকু সম্ভব দেরিতে অর্থাৎ বছরের শেষভাগের দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে তার ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টির ভেতরে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মাঝেই তিনি এই তৎপরতা চালাচ্ছেন।
নেতানিয়াহু বর্তমানে একসঙ্গে বহুবিধ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, যার মধ্যে রয়েছে প্রতিকূল জনমত জরিপ, দুজন জনপ্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বী,কট্টর-অর্থোডক্স দলগুলোর প্রতি তার অন্ধ সমর্থনের কারণে সৃষ্ট জনবিক্ষোভ এবং একজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি স্পষ্টতই এখন তার বিপক্ষে চলে যাচ্ছেন। এর মধ্যেও লিকুদ পার্টিতে তার নেতৃত্বের বিরোধিতা করার মতো কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী এখনও সামনে আসেনি, ফলে দলটির ভবিষ্যৎ পুরোপুরি নেতানিয়াহুর ভাগ্যের ওপরই ঝুলে রয়েছে।
ইসরায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহু মোট প্রায় ২০ বছর ক্ষমতায় রয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি বারবার বিভিন্ন প্রতিকূলতা জয় করেছেন। অতি সম্প্রতি, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের চালানো নজিরবিহীন হামলার পেছনে যে ভয়াবহ ব্যর্থতা ছিল, তা অনেক বিশ্লেষকের মতেই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় হিসেবে গণ্য হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে নেতানিয়াহু ও তার সহযোগীরা সব দায় নিজের কাঁধ থেকে সরিয়ে এককভাবে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর ওপর চাপিয়ে দিতে সক্ষম হন। তবে আগামী ২৭ অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা থাকায়, সামগ্রিক জনমত এবং বিগত কয়েক সপ্তাহে তার দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত রাজনৈতিক ভোটব্যাংকেও ধস নামার কারণে নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ এখন অনেকটাই অন্ধকার।
নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা হ্রাসের এই প্রবণতা তার নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত চ্যানেল ১৪-এর জনমত জরিপেই প্রতিফলিত হয়েছে। গত ৪ জুন প্রকাশিত চ্যানেল ১৪-এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, লিকুদ পার্টি গত দুই মাসে ৪টি আসন হারিয়ে ১২০ আসনের নেসেটের মধ্যে মাত্র ৩২টি আসনে জয়ী হতে পারে। এ ছাড়া ৫ জুন প্রকাশিত চ্যানেল ১২ নিউজ-এর আরেকটি জরিপ লিকুদ পার্টির জন্য আরও বড় পতনের ইঙ্গিত দিয়েছে, যেখানে দলটি মাত্র ২৩টি আসন পেতে পারে বলে আভাস দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা জানিয়েছেন, যদিও দুটি জরিপেই লিকুদ এখনও একক বৃহত্তম দল হিসেবে টিকে আছে, তবুও নিজের এবং দলের এই ক্রমাগত সমর্থন হ্রাসের প্রবণতা নেতানিয়াহুকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। এই পতন ঠেকাতে ক্ষমতাসীন জোটে থাকা কট্টর-ডানপন্থি এবং কট্টর-অর্থোডক্স দলগুলোর ওপর তার নির্ভরশীলতা আরও বাড়িয়ে দেবে।
সম্প্রতি এবিসি নিউজের জোনাথন কার্লকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলে বলেন, আমি জানি না। তার ক্যারিয়ার চমৎকার ছিল। তিনি কি এটি চালিয়ে যেতে চান? কারণ, আপনি তো জানেন, তিনি একজন যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী। আমরা খুব শিগগিরই এই যুদ্ধে জয়ী হব এক উপায়ে বা অন্য উপায়ে, এবং তিনি হলেন একজন যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী।
এর জবাবে বুধবার লিকুদ পার্টির এক মুখপাত্রের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নেতানিয়াহু বলেন, প্রধানমন্ত্রী আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন এবং ঈশ্বরের ইচ্ছায় জয়ী হবেন।
নেতানিয়াহু বর্তমানে প্রতিকূল জনমত জরিপ, দুজন জনপ্রিয় প্রতিদ্বন্দ্বী বেনি গান্তজ ও গাদি আইজেনকোট এবং কট্টর-অর্থোডক্স দলগুলোর কারণে সৃষ্ট জনবিক্ষোভের মুখোমুখি। ২০২৬ সালের শুরুতে শুরু হওয়া ইরান যুদ্ধ এখন এক অন্তহীন চোরাবালিতে রূপ নিয়েছে। এছাড়া ট্রাম্প এই সংঘাতের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে দ্রুত এটি শেষ করতে চাচ্ছেন এবং শান্তি চুক্তির আশায় লেবাননে ইসরায়েলের পাল্টা আঘাতের ক্ষমতাকে সীমিত করে দিয়েছেন।
নেতানিয়াহুর পক্ষে ট্রাম্পের মন্তব্যের গুরুত্বকে হালকা করে দেখিয়ে ইসরায়েলের প্রবাসী বিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি বলেন, ট্রাম্প ইসরায়েলের সর্বকালের সেরা বন্ধু। তিনি আব্রাহাম চুক্তি করিয়েছিলেন, গোলান মালভূমিতে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন এবং ইরানের বিরুদ্ধে দুটি সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন। সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বক্তব্যের কোনও মূল্য নেই। নেতানিয়াহু নির্বাচনে লড়বেন এবং তিনিই জিতবেন।
চ্যানেল ১৪ ও চ্যানেল ১২ নিউজের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ১২০ আসনের নেসেটে লিকুদ পার্টির আসন সংখ্যা কমে ২৩ থেকে৩২-এ নেমে আসতে পারে। এর বড় কারণ কট্টর-অর্থোডক্স দল ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম এবং শ্যাস তাদের অনুসারীদের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবায় অন্তর্ভুক্ত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, যা লিকুদ পার্টির সাধারণ সমর্থকদের ক্ষুব্ধ করেছে। এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাসান নাসরাল্লাহ এবং চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে খামেনিকে হত্যার মতো বড় সামরিক সাফল্য থাকলেও নেতানিয়াহু সরকার সেগুলোকে কোনও কূটনৈতিক বা আব্রাহাম চুক্তির বিস্তারে রূপান্তর করতে পারেনি।
আগামী ২১ অক্টোবর নেতানিয়াহু তার ৭৭তম জন্মদিন উদযাপন করবেন, যার মাত্র কয়েক দিন পরেই নির্ধারিত নির্বাচনের শেষ সময়সীমা। তিনি এর আগে প্রোস্টেট ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়েছেন,যা তিনি সে সময় জনসমক্ষে প্রকাশ করেননি। তার বিরোধীরা এখন নির্বাচনি প্রচারে তার বয়স এবং স্বাস্থ্যকে প্রধান ইস্যু করার চেষ্টা করছেন, যদিও ভোটযুদ্ধে এই বিষয়গুলো কতটা প্রভাব ফেলবে তা নিশ্চিত নয়।
নেতানিয়াহু কি তবে নিশ্চিতভাবেই পরাজয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন? উত্তর হলো, না। তিনি এখনও ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে তুখোড় ও দুর্ধর্ষ রাজনৈতিক প্রচারক এবং অসম্ভব পরিস্থিতি থেকে বারবার অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরার ট্র্যাক রেকর্ড তার রয়েছে। যেকোনও বাঁধাকে রাজনৈতিক সুযোগে রূপান্তর করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা তার আছে। এই ক্ষেত্রেও, তিনি হয়তো ট্রাম্পের এই ক্রমবর্ধমান দূরত্বকে ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষার প্রমাণ হিসেবে জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারেন; তিনি দেখাতে পারেন যে ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য তিনি তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রের সঙ্গেও দ্বন্দ্বে জড়াতে পিছপা হন না।
সূত্র: আল মনিটর









