ট্রাম্পের সঙ্গে চুক্তি করে যেভাবে লাভবান হলো ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১৮ জুন ২০২৬, ১৯:০১আপডেট : ১৮ জুন ২০২৬, ১৯:০১

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে হওয়া সমঝোতার ফলে বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা পেতে যাচ্ছে তেহরান। দুই দেশের এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইরানের তেল বিক্রির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অবিলম্বে শিথিল করা, অবরুদ্ধ করে রাখা বিশাল তহবিল মুক্তি এবং চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

 

বুধবার এক ফোন ব্রিফিংয়ে মার্কিন প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই সমঝোতা স্মারকের পূর্ণাঙ্গ পাঠ সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করেন, যা এর আগে জনসমক্ষে আনা হয়নি। এর কয়েক ঘণ্টা পর ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমও প্রায় হুবহু একই বিবরণ প্রকাশ করে। এই সমঝোতায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, মার্কিন নৌঅবরোধের অবসান এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এছাড়া ৬০ দিনের জন্য হরমুজ প্রণালি টোল-মুক্ত রাখা, ইসরায়েলের হিজবুল্লাহ অভিযানের পর লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতা বজায় রাখা এবং ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, এমন অঙ্গীকারও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জন্য বেশ কিছু অর্থনৈতিক প্রণোদনার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ইরানিরা যদি তাদের ভালো আচরণ বজায় রাখে, তবে আমরাও তাদের অর্থনৈতিক ও নিষেধাজ্ঞা মওকুফের সুবিধা বাড়িয়ে দেব, যা তাদের একটি সমৃদ্ধিশালী দেশ হতে সাহায্য করবে।

অবরুদ্ধ তহবিল ফেরত

সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, এটি বাস্তবায়নের সঙ্গে সঙ্গেই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অবরুদ্ধ থাকা ইরানের সব সম্পদ ও তহবিল সম্পূর্ণ ব্যবহারের উপযোগী করে দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। এই অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা হবে। সেন্ট্রাল ব্যাংক অব ইরান কর্তৃক নির্ধারিত যেকোনো চূড়ান্ত সুবিধাভোগীকে অর্থপ্রদানের জন্য এই তহবিল সম্পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য হবে।

বর্তমানে ভারত, কাতার, ইরাক ও জাপানসহ বিভিন্ন দেশের অ্যাকাউন্টে ইরানের প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ আটকে আছে বলে ধারণা করা হয়। ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পর এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা হয়। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে বিদেশি ব্যাংকগুলো এই অর্থ স্থানান্তর করতে পারছিল না।

এর আগে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা পাঁচ মার্কিন জিম্মিকে মুক্ত করতে ইরানকে ১.৭ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার অনুমোদন দিলে ট্রাম্প তার তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তবে বুধবার ফ্রান্সের জি-৭ সম্মেলনে এক সংবাদ সম্মেলনে নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গেয়ে ট্রাম্প বলেন, আমরা তাদের অনেক টাকা আটকে রেখেছিলাম, এটি তাদের নিজেদেরই টাকা, যা আমরা একটা নির্দিষ্ট সময়ে অবরুদ্ধ করেছিলাম। আমি মনে করি এখন আমাদের এটি ফেরত দিতেই হবে।

নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি

সমঝোতা অনুযায়ী, চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে মার্কিন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞাসহ ইরানের ওপর থাকা ‘সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা’ একটি সম্মত সময়সূচি অনুযায়ী প্রত্যাহার করা হবে। ১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকটের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে আসছে। ওবামা যেভাবে ২০১৫ সালে সাময়িক মওকুফ ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছিলেন, ট্রাম্পও একইভাবে তা করতে পারেন। তবে ইরানের মানবাধিকার লঙ্ঘন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং সন্ত্রাসে সমর্থনের সঙ্গে সম্পর্কিত স্থায়ী নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলতে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।

পূর্বে ট্রাম্প প্রশাসন ‘নো ডাস্ট, নো ডলারস’ নীতি বজায় রাখার কথা বললেও, বর্তমান সমঝোতা অনুযায়ী সমৃদ্ধ উপাদানের বিষয়টি সমাধানের আগেই ইরান কিছু নিষেধাজ্ঞা মওকুফের সুবিধা পেয়ে যাবে। নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি শেষ না হওয়া পর্যন্ত মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইরানের তেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য ও উপজাত রফতানির জন্য ছাড়পত্র জারি করবে। এর আওতায় ব্যাংকিং, পরিবহন ও বীমা সুবিধাও থাকবে।

ইরানের অপরিশোধিত তেলের প্রধান ক্রেতা মূলত চীনের শানডং প্রদেশের স্বাধীন শোধনাগারগুলো। নিষেধাজ্ঞা মওকুফের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, মার্কিন বিধিনিষেধ আসলে চীনের কাছে ইরানের তেল রফতানি আটকাতে পারছিল না, বরং ইরানকে বাধ্য করছিল গোপনে ও কম দামে তেল বিক্রি করতে। এক কর্মকর্তা বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দিয়ে তারা এমনিতেও তেল বিক্রি করতে পারত। তাই আমরা ভেবেছি এটি ইরানকে দেওয়ার মতো একটি ন্যায্য ছাড়, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমাতেও সাহায্য করবে।

৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিল

সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ইরানের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক অংশীদাররা মিলে কমপক্ষে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি সুনির্দিষ্ট ও পারস্পরিক সম্মত পরিকল্পনা তৈরি করবে। ৬০ দিনের আলোচনার মধ্যে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে।

কয়েক দশকের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের বাণিজ্য পঙ্গু হয়ে পড়েছে এবং দেশটির মুদ্রা রিয়াল ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে গেছে। বর্তমান যুদ্ধ ইরানের অর্থনীতিকে আরও বিপর্যস্ত করেছে, যার ফলে দেশটি বিলিয়ন ডলারের তেল রাজস্ব হারিয়েছে এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও শিল্প অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।

প্রথমে এই ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তহবিলের খবর অস্বীকার করলেও পরে ট্রাম্প স্পষ্ট করে জানান যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই তহবিলে কোনও টাকা দেবে না। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এর জন্য এক পয়সাও দিচ্ছি না।

সূত্র: আল মনিটর

/এএ/
সম্পর্কিত
ইরান-মার্কিন চুক্তিতে কী পেলেন ইসরায়েলের নেতানিয়াহু
হরমুজ পার হলো সৌদি আরবের তিন সুপারট্যাংকার
কী, কেন, কীভাবেচুক্তির পরও ইরান-মার্কিন শান্তির পথে বাধা কী
সর্বশেষ খবর
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ‌গর্জনের পরও ‘যেই লাউ সেই কদু’
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ‌গর্জনের পরও ‘যেই লাউ সেই কদু’
বিশ্বকাপের আবেগে রঙিন রাজধানী, নজর কেড়েছে দৈত্যাকার জার্সি
বিশ্বকাপের আবেগে রঙিন রাজধানী, নজর কেড়েছে দৈত্যাকার জার্সি
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়েছে ৪১ শতাংশ, জমা দাঁড়ালো কত?
সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের আমানত বেড়েছে ৪১ শতাংশ, জমা দাঁড়ালো কত?
গ্লোবাল নয়, দেশি বিনিয়োগকারীদের ওপর বেশি ফোকাস: আশিক চৌধুরী
গ্লোবাল নয়, দেশি বিনিয়োগকারীদের ওপর বেশি ফোকাস: আশিক চৌধুরী
সর্বাধিক পঠিত
সেই খালেদা রাব্বানীকে দেখতে গেলেন প্রধানমন্ত্রী, কথা শুনে আবেগাপ্লুত
সেই খালেদা রাব্বানীকে দেখতে গেলেন প্রধানমন্ত্রী, কথা শুনে আবেগাপ্লুত
হাজারি গুড়ের কেজি ২ হাজার টাকা, কারা খায় কোথায় যায়
হাজারি গুড়ের কেজি ২ হাজার টাকা, কারা খায় কোথায় যায়
বিএমএতে দ্বিতীয় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা সেনাপ্রধানের  
বিএমএতে দ্বিতীয় বাংলাদেশ ব্যাটালিয়নের কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা সেনাপ্রধানের  
আমাকে দুটি আসন দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী: এমপি জেবা আমিন
আমাকে দুটি আসন দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী: এমপি জেবা আমিন
পাবনায় ১৬০০ ছাড়িয়েছে সমকামী, ১৬ জন এইডসে আক্রান্ত
পাবনায় ১৬০০ ছাড়িয়েছে সমকামী, ১৬ জন এইডসে আক্রান্ত