ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বাতিল করে বুধবার রাতে তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালাতে পারে বলে ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই ঘোষণার আগের রাতেই উভয় পক্ষ পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের নতুন ঘোষণার পর ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত কোন পথে গড়াচ্ছে তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান যুদ্ধের মধ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন আচরণ এবারই প্রথম নয়। দুই মাস আগেও দুই দেশের যুদ্ধবিরতি আলোচনার মাঝেই তিনি নতুন হামলার হুমকি দিয়েছিলেন এবং এরপর ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছিল। ফলে আলোচনার টেবিলে বসেও দুপক্ষের মধ্যে বৈরিতা শুরু হওয়াটা নতুন কিছু নয়। তবে চলমান এই সংঘাত এবার কী রূপ নেবে, তা এখনও অস্পষ্ট।
মার্কিন সেনাবাহিনীর সেন্টকম আসন্ন হামলা নিয়ে সাংবাদিকদের বিস্তারিত কিছু না জানালেও, যুক্তরাষ্ট্র যে আবারও ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করছে, সেই স্পষ্ট ইঙ্গিত তারা দিয়ে রেখেছে।
মার্কিন জনগণের একটি বড় অংশ ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের বিরোধিতা করছে। তবে বর্তমানে অন্যান্য কিছু বিষয়ে ব্যস্ত থাকায় এই যুদ্ধ নিয়ে জনগণের মধ্যে তেমন আলোচনা নেই। উত্তর গোলার্ধে এখন গ্রীষ্মকাল চলছে, স্কুলগুলোও বন্ধ। সাধারণ মানুষ কিছুটা ছুটির আমেজে থাকার চেষ্টা করছে। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসের অধিবেশনও এই সপ্তাহের জন্য স্থগিত রয়েছে।
তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আলী আকবর দায়েরিনি ট্রাম্পের সমঝোতা স্মারক ‘ভেস্তে যাওয়ার’ ঘোষণার প্রেক্ষিতে বলেন, ইরান যুদ্ধ চায় না, ইরান এখানে ভুক্তভোগী। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হলো আগ্রাসী পক্ষ। এখন আপনারা দেখছেন ট্রাম্প নিজেই তার সই করা সমঝোতা স্মারকটিকে কার্যকরভাবে নস্যাৎ করছেন।
তিনি আরও বলেন, মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের ফলে পরিস্থিতি আবার সমঝোতা স্মারকের পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে গেছে এবং এখন পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দায়েরিনির মতে, ইরান এখন পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে একটি বিস্তৃত ভৌগোলিক যুদ্ধের দিকে যেতে পারে। কারণ ইরান যুদ্ধ না চাইলেও, হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের অবকাঠামোগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো এই ছোট আকারের সামরিক হামলা তারা মুখ বুজে সহ্য করবে না।
অন্যদিকে, ইসরায়েল উপসাগরীয় অঞ্চলের এই পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। তবে এই উত্তেজনা বৃদ্ধিতে তারা অবাক নয়। কারণ ইসরায়েল মনে করে, ইরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের শর্তগুলো পূরণ করতে পারবে না। ইসরায়েলি গণমাধ্যম মাআরিভকে দেশটির একটি সামরিক সূত্র জানিয়েছে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী (আইডিএফ) ইরানের যেকোনও হুমকি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত। সতর্কতা ও প্রস্তুতি আগের দিনগুলোর মতোই উচ্চপর্যায়ে রয়েছে। তবে এই মুহূর্তে আমেরিকানরাই আলোচনা চালাচ্ছে এবং গত রাতে তারাই ইরানে হামলা চালিয়েছে।
আরব পারসপেক্টিভস ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেইদন আলকিনানি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট কূটনীতির ভাষা পুরোপুরি বদলে দিলেও তার মুখের কথা মানেই যে ‘স্থায়ী পদক্ষেপ’, তা নয়।
তিনি ট্রাম্পকে বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসের এক ‘ব্যতিক্রমী চরিত্র’ হিসেবে উল্লেখ করে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওভাল অফিসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির সঙ্গে ট্রাম্প ও তার ভাইস প্রেসিডেন্টের ক্যামেরার সামনে করা নির্মম সমালোচনার উদাহরণ টানেন। আলকিনানি বলেন, ইরানিরাসহ যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু বা শত্রু সব দেশই ভালো করে জানে যে ট্রাম্প অত্যন্ত প্রতিক্রিয়াশীল একজন মানুষ এবং তার অনেক মন্তব্যই বাস্তবে স্থায়ী কোনও পদক্ষেপে রূপ নেয় না।
তিনি মনে করিয়ে দেন যে, ট্রাম্প এর আগে ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের কথা বললেও, পরে আবার সেই একই শাসনব্যবস্থার সঙ্গেই সরাসরি আলোচনায় বসার আগ্রহ দেখিয়েছিলেন।
সূত্র: আল জাজিরা








