কী, কেন, কীভাবে

হুথিদের মোকাবিলায় কেন ব্যর্থ সৌদি আরব, নেপথ্যে কোন পরাশক্তি?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৩৯ আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৩৯

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের মধ্যে বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে আরও টালমাটাল করে দিয়েছে একটি নতুন অনুসন্ধানী তথ্য। সুইজারল্যান্ডের জেনিভাভিত্তিক বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থা অরোরা জিওসিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স-এর অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সৌদি আরবের সামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামোয় নির্ভুল হামলায় সহায়তা করছে রাশিয়ার সরকারি ও সামরিক স্যাটেলাইট।

ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারের সঙ্গে হুথিদের লড়াই দীর্ঘ দিন ধরে চললেও চলতি বছরের জুলাই থেকে তা তীব্র আকার ধারণ করে। সেপ্টেম্বর মাসে লোহিত সাগর উপকূলে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয় হুথিরা। একই মাসে সৌদি আরবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইনের পাম্পিং স্টেশনে নিখুঁত হামলা চালায় তারা। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই হামলার কয়েক দিন আগেই রুশ স্যাটেলাইটগুলো ওই অঞ্চলের ওপর নজরদারি চালিয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেছিল।

প্রশ্ন উঠেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান মিত্র ও বিপুল সামরিক বাজেটের অধিকারী সৌদি আরব কেন ইয়েমেনের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠীকে ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে? এবং এই লড়াইয়ে রাশিয়ার ভূমিকা কতটা গভীর?

অনুসন্ধানে কী উঠে এসেছে?

বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) বরাতে জানা যায়, গত ১ জুলাই থেকে ১৯ অক্টোবরের মধ্যে সৌদি আরবে চালানো হুথিদের ৪০টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বিশ্লেষণ করেছে অরোরা জিওসিগন্যাল। প্রতিটি হামলার আগে ও পরে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর ওপর রুশ সামরিক স্যাটেলাইটের ধারাবাহিক গতিবিধি ও নজরদারির প্রমাণ মিলেছে।

অরোরা জিওসিগন্যালের প্রতিষ্ঠাতা নওয়াফ ওবায়েদ জানান, রাশিয়ার সামরিক নজরদারি ব্যবস্থার গতিপথ ও কক্ষপথ হিসাব করে তারা দেখতে পান যে, সৌদি আরব, জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইয়েমেনের সামরিক ঘটনাবলীর সঙ্গে এই স্যাটেলাইটগুলোর তৎপরতার সরাসরি সংযোগ রয়েছে।

এর মধ্যে রাশিয়ার বার্স-এম সামরিক ম্যাপিং, পারসোনা অপটিক্যাল, লোটোস-এস১ ইলেকট্রনিক, পিয়ন-এনকেএস সামুদ্রিক এবং কন্ডোর-এফকেএ রাডার স্যাটেলাইটের উপস্থিতি শনাক্ত করা গেছে।

ওবায়েদ বলেন, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার কেবল একক রুশ স্যাটেলাইটের উপস্থিতি নয়, বরং তাদের সমন্বিত গোয়েন্দা সক্ষমতার পর্যায়ক্রমিক ব্যবহার। রাশিয়ার সামরিক ভূ-সংস্থানিক এবং সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স মূলত ইরানি পরিচালিত গোয়েন্দা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করছে, যা হুথিদের সহায়তা দিচ্ছে।

তিনি জানান, ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে বাব আল-মানদাব অভিমুখে হুথি অগ্রযাত্রার সময় রুশ গোয়েন্দা তথ্য, ইরানি কমান্ড ও স্থানীয় তথ্যের সমন্বয়ে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনীর মধ্যে দ্রুত সমন্বয়হীনতা তৈরি হয়। একইভাবে সেপ্টেম্বরে সৌদির ইস্ট-ওয়েস্ট তেলের পাইপলাইনের উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ ৩টি পাম্পিং স্টেশনে (আফিফ, আল-দিকরা ও আল-মেসবাআ) হামলা চালানো হয়। প্রকৌশলগত দুর্বলতা জেনেই তারা এমন নির্ভুল আঘাত হানে।

তবে এসব তথ্য কতটা সুনির্দিষ্ট, তা নিয়ে কিছু ভিন্নমতও রয়েছে। ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক বিশ্লেষক এলিজা মানিয়ার বলেন, এটি সত্যি যে তথ্য হস্তান্তরিত হয়েছে, তবে রাশিয়া তা সরাসরি হুথিদের দিয়েছে, নাকি ইরান স্বাধীনভাবে এই রুশ তথ্য সংগ্রহ করে হুথিদের হাতে তুলে দিয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া কঠিন।

অবশ্য বার্তা সংস্থা এপি-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সৌদি আরব, হুথি ও একটি বেসরকারি গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ তিন কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে হুথিরা রাশিয়া ও চীনের এই ধরনের প্রযুক্তিগত সুবিধা পাচ্ছে। সম্প্রতি সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী রায়েদ করিমলি সাংবাদিকদের বলেন, হুথিরা রাশিয়া ও চীন থেকে তথ্য পাচ্ছে। আমরা নিয়মিত চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করছি এবং করে যাব।

রাশিয়ার এই সহায়তার গুরুত্ব কতখানি?

রাশিয়ার পক্ষ থেকে এই অনুসন্ধানের বিষয়ে এখনও কোনও মন্তব্য করা হয়নি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মস্কো ও তেহরানের মধ্যকার সামরিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে গভীর হয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইয়েমেন বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক আহমেদ নাজি বলেন, মস্কো যদি সত্যি তেহরানের মিত্রদের সহায়তা করে থাকে, তবে তা ইয়েমেন সংঘাতের গতিপথ পুরোপুরি বদলে দেবে। তিনি বলেন, ইয়েমেন যুদ্ধ এখন আর অভ্যন্তরীণ সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। আমরা দেখছি রাশিয়া সরাসরি বা ইরানের মাধ্যমে হুথিদের আধুনিক অস্ত্র ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে জটিল করছে। পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদেও হুথিবিরোধী পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে মস্কো।

সৌদির কোথায় কোথায় আঘাত হেনেছে হুথিরা?

গ্রীষ্মের পর থেকে হামলা বাড়ার পর শুক্রবার হুথিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারিয়ি দাবি করেন, তারা পূর্ব ও পশ্চিম উপকূল থেকে শুরু করে রিয়াদ এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় নাজরান পর্যন্ত সৌদি আরবের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামরিক স্থাপনায় আঘাত করেছেন।

সারিয়ির দাবি অনুযায়ী, তারা রাস তানুরা শোধনাগার, আবকাইকে আরামকো স্থাপনা, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, দাম্মামের কিং ফাহাদ বিমানবন্দর, রাবিগ শোধনাগার এবং নাজরানের সামরিক সদরদপ্তরে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে হামলা চালিয়েছে।

যদিও এসব দাবির সব কটির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা যায়নি, তবে সৌদিতে হুথিদের বিমানবন্দর কেন্দ্রিক হামলা বেশ প্রাণঘাতী হয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে রিয়াদের কিং খালিদ বিমানবন্দরে হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত ও ৩০০ জন আহত হন। এর ফলে বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় এবং সৌদির ফ্ল্যাগশিপ বিনিয়োগ সম্মেলন ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থগিত করতে হয়। গত ২১ অক্টোবর দাম্মামের কিং ফাহাদ বিমানবন্দরেও ২ জন নিহত হন।

হুথিরা এত শক্তিশালী অস্ত্র পাচ্ছে কোত্থেকে?

২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর হুথিরা ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর বিশাল অস্ত্রাগারের দখল নেয় এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহের অনুগত বাহিনীর সঙ্গে জোট গঠন করে।

স্ট্র্যাটেজিক-অ্যারো রিসার্চের প্রধান বিশ্লেষক সাজ আহমেদ বলেন, অস্ত্র সংগ্রহের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক চোরাবাজার থেকে পার্টস সংগ্রহ করে নিজেরাই অস্ত্র অ্যাসেম্বল করা শিখে গেছে তারা। এমনকি ইসরায়েলের মতো দূরবর্তী স্থানেও তারা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারছে। ফলে সৌদির মতো কাছের হাই-ভ্যালু টার্গেটে আঘাত হানা তাদের জন্য সহজ হয়ে উঠেছে।

২০২২ সালে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির সময় ইয়েমেন সরকার রাজনৈতিক সমাধানের আশা করলেও, হুথিরা মূলত নতুন যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে জানান বিশ্লেষক আহমেদ নাজি।

এ ছাড়া ইরান থেকে সরাসরি ‘ফিলিস্তিন-২’ ও ‘তুফান’-এর মতো হাইপারসনিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ড্রাইভ প্রযুক্তি হুথিদের হাতে পৌঁছেছে। আইআরজিসি ছাড়াও লেবাননের হিজবুল্লাহ ও ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো হুথিদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও রণকৌশলের অভিজ্ঞতা জুগিয়েছে।

সৌদির পাল্টা আঘাত ও সীমাবদ্ধতা

হুথিদের রোখার জন্য সৌদি জোটও থেমে নেই। সম্প্রতি ইয়েমেন সরকার অপারেশন ইয়েমেন ডন শুরু করেছে। সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়মিত হুথিদের ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করছে। গত কয়েক দিনে রিয়াদ ও পশ্চিম সৌদি আরবের দিকে আসা একাধিক ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার দাবি করেছে সৌদি সামরিক বাহিনী। এমনকি হুথিদের ৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপক এবং ৫টি গোপন সুড়ঙ্গ ধ্বংস করেছে তারা।

তবে এত কিছুর পরও কেন সফল হতে পারছে না সৌদি আরব?

সামরিক বিশ্লেষক এলিজা মানিয়ার সংক্ষেপে বলেন, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে কখনও যুদ্ধ জেতা যায় না। বিমান হামলা কেবল পদাতিক বাহিনীকে পথ তৈরি করে দেয়। কিন্তু সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি পদাতিক বাহিনী বিভক্ত, সুসংগঠিত নয় এবং রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত নয়।

অপর বিশেষজ্ঞ সাজ আহমেদের মতে, শত শত কোটি ডলারের আধুনিক মার্কিন ও ইউরোপীয় অস্ত্র কেনা সত্ত্বেও কৌশলগত ব্যবহারে পিছিয়ে আছে রিয়াদ। বিপরীতে হুথিরা গেরিলা যুদ্ধ এবং ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে মারাত্মক পারদর্শী হয়ে উঠেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, রিয়াদ যেভাবে অবরুদ্ধ পরিস্থিতির মুখে পড়ছে, তাতে আমি অবাক হব না যদি একসময় সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো সৌদি আরবও এই যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে সরে দাঁড়ায়।

সূত্র: আল জাজিরা

/এএ/
সম্পর্কিত
আরও সন্তান চান জেডি ভ্যান্স, স্ত্রীর এক হুমকিতেই চুপ!
যেকোনও হুমকিতে তাৎক্ষণিক জবাব দেবে ইরান, সেনাবাহিনীকে খামেনির নির্দেশ
নির্বাচনে ভরাডুবি হলে ইরানে বড় হামলা চালাতে পারেন ট্রাম্প
সর্বশেষ খবর
আরও সন্তান চান জেডি ভ্যান্স, স্ত্রীর এক হুমকিতেই চুপ!
আরও সন্তান চান জেডি ভ্যান্স, স্ত্রীর এক হুমকিতেই চুপ!
দীপ যা বলছে আসলে তা প্রশ্নবিদ্ধ: তাহসিফের বাবা
দীপ যা বলছে আসলে তা প্রশ্নবিদ্ধ: তাহসিফের বাবা
প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের বইয়ের পাশাপাশি দেওয়া হবে খেলনা: ববি হাজ্জাজ
প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের বইয়ের পাশাপাশি দেওয়া হবে খেলনা: ববি হাজ্জাজ
মিরপুরে হারের পর শান্ত বললেন, ‘ক্রিকেটে এমনটা হয়’
মিরপুরে হারের পর শান্ত বললেন, ‘ক্রিকেটে এমনটা হয়’
সর্বাধিক পঠিত
প্রথম দিনে বাজারে ঢুকেছে হাজার টন ইলিশ, দাম কত?
প্রথম দিনে বাজারে ঢুকেছে হাজার টন ইলিশ, দাম কত?
লাগেজ কাটা-চুরি বন্ধে নতুন ব্যবস্থা: কতটা বদলালো শাহজালাল বিমানবন্দর
লাগেজ কাটা-চুরি বন্ধে নতুন ব্যবস্থা: কতটা বদলালো শাহজালাল বিমানবন্দর
পাসের হারে শীর্ষে কোন বোর্ড, তালানিতে কোনটি
পাসের হারে শীর্ষে কোন বোর্ড, তালানিতে কোনটি
এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ আজ
এইচএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ আজ
বৈঠক শেষেই গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য বড় ঘোষণা দিলেন মন্ত্রী
বৈঠক শেষেই গার্মেন্ট শ্রমিকদের জন্য বড় ঘোষণা দিলেন মন্ত্রী