সোলাইমানিকে হত্যা যেভাবে ভারতকে বিপাকে ফেলেছে

Send
রঞ্জন বসু, দিল্লি
প্রকাশিত : ০৫:৫৯, জানুয়ারি ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১১:৪০, জানুয়ারি ০৬, ২০২০

কাসেম সোলাইমানি (ফাইল ছবি, সংগৃহীত)

একদিকে ভারতের চিরাচরিত মিত্র দেশ ইরান–যেখান থেকে পাওয়া তুলনামূলকভাবে সস্তা তেল বহু বছর ধরে ভারতকে বাঁচিয়ে এসেছে। যে দেশের চাবাহার বন্দর ভারতের জন্য মধ্য এশিয়া বা আফগানিস্তানের প্রবেশপথ। আর অন্যদিকে ভারতের ইদানিংকার বন্ধু আমেরিকা–যেখানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আবার জেতানোর জন্য ইতোমধ্যে ডাক দিয়ে এসেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানির হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে তীব্র সংঘাত শুরু হয়েছে, তারই মাঝে এক বিষম জাঁতাকলে পড়েছে ভারত। তারা না পারছে ইরানকে ফেলতে, না পারছে বেপরোয়া ট্রাম্পকে গিলতে।

এরই মধ্যে নিহত জেনারেল সোলাইমানিকে বিশ্বের নানা প্রান্তে একগুচ্ছ সন্ত্রাসী হামলার জন্য দায়ী করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এসব হামলার একটা আবার দিল্লিতে ঘটেছিল বলেও তিনি টুইটারে দাবি করেছেন। লিখেছেন, নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করাটা সোলাইমানি নাকি নেশায় পরিণত করে ফেলেছিলেন–আর তার জঙ্গিবাদের হাত বিস্তৃত ছিল সুদূর দিল্লি থেকে লন্ডন পর্যন্ত!

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা একমত, দিল্লিতে হামলার কথা উল্লেখ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের রাজধানীতে একজন ইসরায়েলি কূটনীতিকের গাড়িতে বোমা হামলার কথাই বলতে চেয়েছেন। কিন্তু ঠিক কী ঘটেছিল দিল্লিতে আট বছর আগের সেই দিনটিতে?

২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ভারতে নিযুক্ত তৎকালীন ইসরায়েলি ডিফেন্স অ্যাটাশে-র স্ত্রী যখন তার বাচ্চাদের স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিলেন তখন কে বা কারা তার গাড়িতে একটি দেশি বোমা বসিয়ে দিয়ে যায়। পরে সেই বিস্ফোরণে ওই নারী গুরুতর জখম হন, আহত হন তার গাড়ির চালক ও দুইজন পথচারীও।

ঠিক একই সময়ে জর্জিয়ার টিবিলিসি ও থাইল্যান্ডের ব্যাংককেও ইসরায়েলি কূটনীতিকরা হামলার শিকার হন।

দিল্লির ঘটনায় পুলিশ পরে অভিযুক্ত করে সৈয়দ মোহাম্মদ আহমদ কাজমি নামের এক সাংবাদিককে, যিনি ইরানিয়ান একটি সংবাদ সংস্থার হয়ে কাজ করতেন। তার বিরুদ্ধে পেশ করা চার্জশিটে বলা হয়, কাজমি তিনজন ইরানি নাগরিকের সঙ্গে মিলে দিল্লিতে অবস্থিত ইসরায়েলি দূতাবাস ‘রেকি’ করেছিলেন–পরে সেই তিন ইরানির একজন গাড়িতে বোমাটি পেতে রাখেন।

কাজমি ও তার স্ত্রীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে হামলার ঠিক আগে বিদেশ থেকে ৩০ হাজার ডলারেরও বেশি জমা পড়েছিল বলেও জানানো হয়। ২০১২ সালের জুলাই মাসে টাইমস অব ইন্ডিয়া দাবি করে, ওই হামলায় ইরানের রিভলিউশনারি গার্ডস জড়িত ছিল বলে প্রমাণ পেয়েছে দিল্লি পুলিশ। কিন্তু এর মাস তিনেক পরই আটক সৈয়দ মোহাম্মদ আহমদ কাজমি জামিন পেয়ে যান। ধামাচাপা পড়ে যায় হামলার তদন্ত।

এখন প্রায় আট বছর পর কাসেম সোলাইমানির হত্যার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই জঙ্গি হামলার প্রসঙ্গ খুঁচিয়ে তুলতেই ভারত ও ইরানের সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

দিল্লিতে নিযুক্ত তেহরানের রাষ্ট্রদূত আলি চেগেনি অবশ্য শনিবারই ‘দ্য হিন্দু’ পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, দিল্লিতে ওই হামলার সঙ্গে জেনারেল সোলাইমানির দূরতম কোনও সম্পর্কও ছিল না।

রাষ্ট্রদূত চেগেনি বলেছেন, ‘ট্রাম্প তার যা ইচ্ছে বলতে পারেন, হাজারটা জঙ্গি হামলার ফিরিস্তি দিতে পারেন। কিন্তু আসলে এগুলো সবই ডাহা মিথ্যে। বাস্তবতা হলো জেনারেল সোলাইমানি ছিলেন একজন সেনানী। বিশ্বের কোথাও কোনও দিন তিনি কোনও নিরীহ বেসামরিক মানুষকে আক্রমণের নিশানা করেননি।’

দিল্লিতে জেএনইউ-র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ও প্রখ্যাত ইরান বিশেষজ্ঞ কামার আগাও বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আট বছর আগের দিল্লির ওই হামলায় ইরানের সম্পৃক্ততা যদি থেকেও থাকে– জেনারেল সোলাইমানি নিজে তাতে জড়িত ছিলেন এটা বিশ্বাস করা প্রায় অসম্ভব।

অধ্যাপক আগার কথায়, ‘কুদস ফোর্সের প্রধান হিসেবে আন্তর্জাতিক অপারেশনগুলোর দায়িত্ব ছিল তার হাতেই, এ কথা ঠিক। কিন্তু দিল্লির হামলাটি ছিল এতোই দুর্বল ও ছোট মাপের যে জেনারেল সোলাইমানি নিজে সেটা পরিচালনা করেছিলেন বলে কিছুতেই মনে হয় না!’

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও বিষয়টি এতটাই অস্বস্তিতে ফেলেছে যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওই টুইট (যাতে তিনি দিল্লির জঙ্গি হামলার কথা উল্লেখ করেছেন) নিয়ে দিল্লি কোনও মন্তব্য করতেই অস্বীকার করেছে। এমনকি জেনারেল সোলাইমানির হত্যাকাণ্ডের পর ভারত শুক্রবার যে সরকারি বিবৃতি দিয়েছে তাতেও ওই হত্যার সরাসরি নিন্দা করা হয়নি, দিল্লি শুধু বলেছে বিষয়টি তারা ‘নোট’ করেছে। ওই বিবৃতিতে নিতান্ত দায়সারাভাবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনায় ‘উদ্বেগ’ ব্যক্ত করা হয়েছে।

জেনারেল সোলাইমানির হত্যা যে ভারতকে বিরাট এক কূটনৈতিক জাঁতাকলে ফেলেছে, সেই ইঙ্গিত তাই স্পষ্ট। 

/এমপি/ আপ-এএইচ/এমএমজে/

লাইভ

টপ