ইরানের হুমকি থেকে কতটা নিরাপদ যুক্তরাষ্ট্র?

Send
বিদেশ ডেস্ক
প্রকাশিত : ২১:০১, জানুয়ারি ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১২, জানুয়ারি ০৬, ২০২০

ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় আল কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানি নিহতের ঘটনায় ক্ষোভে ফুঁসছে ইরান। ইতোমধ্যেই এ হত্যকাণ্ডের ‘কঠোর প্রতিশোধ’ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। নিহত কমান্ডারের রক্তের বদলা নেওয়া হুমকি দিয়েছে ইরানের বিশেষায়িত বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডস কর্পস (আইআরজিসি)। সোলাইমানিকে হত্যার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইরাকে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একইসঙ্গে দেশটিতে নিজেদের নাগরিক ও সম্পদের সুরক্ষার জন্য ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী যুদ্ধ স্থগিত করেছে ওয়াশিংটন। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশ্লেষণদর্শী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের সামরিক হুমকির মুখে যুক্তরাষ্ট্র চাইলেই সব সময় তাদের সবকিছু নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখতে পারবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে শুক্রবার (৩ জানুয়ারি) বাগদাদ বিমানবন্দরে হামলা চালিয়ে ইরানের শীর্ষ জেনারেল ও কুদস ফোর্সের প্রধান সোলাইমানিকে হত্যা করা হয়েছে। ইরান ওই হত্যার চরম প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর পাল্টাপাল্টি হুমকি অব্যাহত রয়েছে।

রবিবার সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাতকারে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির পরামর্শক হোসেইন দেহগান বলেছেন, মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েই প্রতিশোধ নেওয়া হবে।

সিএনএন’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিঙ্গাপুর থেকে জিবুতি ও বাহরাইন থেকে ব্রাজিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ৮০০ টি সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করছে। যা অন্য যেকোনও দেশের তুলনায় অনেক বেশি। নিজেদের সীমারেখা পেরিয়ে অন্য দেশের এসব স্থাপনার মাধ্যমে তারা সামরিক শক্তি বিস্তার করেছে। এছাড়া মার্কিন সীমান্তেই শত শত ছোট-বড় সামরিক স্থাপনা রয়েছে।

এসব প্রত্যেকটি স্থাপনায় মার্কিন সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন। তাই তাদেরকে লক্ষ্য করে হামলা চালানোর আশঙ্কার রয়েছে। এছাড়া সাগরে মার্কিন জাহাজ কিংবা আকাশে যুদ্ধবিমানের ওপরও হামলা হতে পারে। 

মার্কিন প্রশান্ত মহাসাগরীয় কমান্ডের যৌথ গোয়েন্দা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক কার্ল শাস্টার বলেন, মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা করতে চাইলে তা অনেকভাবেই সম্ভব।

সিএনএন’র প্রতিবেদন অনুসারে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরানি সামরিক হুমকি মধ্যে রয়েছে-

ইরান প্রশিক্ষিত মিলিশিয়া

সরাসরি হামলা না করলেও ইরানের প্রশিক্ষিত ও সমর্থিত কোনও গোষ্ঠী মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সাবেক পরিচালক ক্রিস্টোফার কোস্তা বলেন, ‘বিশ্বজুড়ের নিজেদের সমর্থনপুষ্ঠ বাহিনীর মাধ্যমে প্রভাব ধরে রেখেছে ইরান’। বর্তমানে আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা জাদুঘরের প্রধান এই কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরানের পক্ষে এই প্রক্সি বাহিনীর মাধ্যমেই হামলা করা সম্ভব’।

ইরান সমর্থিত এমনই এক বাহিনী হচ্ছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। লেবাননে যাত্রা শুরু এই গোষ্ঠীটি ১৯৮৩ সালে বৈরুত বিমানবন্দরে মার্কিন মেরিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। ওই হামলায় ২২০ মেরিন সেনাসহ ২৪১ জন মার্কিন নাগরিক নিহত গিয়েছিলেন। এছাড়া ১৯৯৬ সালে সৌদি আরবে খোবার টাওয়ারে মার্কিন এক সামরিক স্থাপনায় হামলার জন্য হিজবুল্লাহকে দায়ী করা হয়। তখন ১৯ জন পাইলট নিহত হয়েছিলেন।

রবিবার হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন, সোলেইমানির মৃত্যু প্রতিশোধ নিতে তারা প্রস্তুত। টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিত রয়েছে। এখানে তাদের সামরিক ঘাঁটি, সামরিক নৌযান ও সেনারা রয়েছে। মার্কিন সেনারা সোলেইমানি হত্যার জন্য দায়ী। তাদেরকে এর মূল্য দিতে হবে।’ 

মধ্যপ্রাচ্য পেরিয়ে আফ্রিকাতেও নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে হিজবুল্লাহ। শাস্টার বলেন, ‘রবিবার কেনিয়ায় আল-শাবাবের হামলায় তিন মার্কিন নিহত হয়েছে। আল-শাবাব হিজবুল্লাহ’র সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। তবে এই হামলায় স্পষ্ট যে, মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালানো কঠিন কিছু নয়’।

সাগরে হামলার শঙ্কা

বিভিন্ন জলপথে মার্কিন নৌবাহিনী ২৯৩টি মোতায়েনযোগ্য যুদ্ধ জাহাজ রয়েছে। এর মাত্র এক-তৃতীয়াংশ বিদেশি বন্দর কিংবা সাগরে মোতায়েন করা। সবগুলোই হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। যেমন, ২০০০ সালে অক্টোবরে ইয়েমেনের এডেন বন্দরে মার্কিন ডেস্ট্রয়ারের ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। একটি ছোট নৌকায় করে চালানো ওই আত্মঘাতীয় হামলায় ১৫ মার্কিন নৌ সেনা প্রাণ হারায়। আল-কায়েদার চালানো ওই হামলায় প্রমাণ করে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজে হামলা অসাধ্য কিছু না।

তৎকালীন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী উইলিয়াম এস কোহেন বলেছিলেন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না হলে হামলায় আরও ক্ষয়ক্ষতি হতে পারত। এরপর নতুন সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

তবে শাস্টার মনে করেন, বিদেশি বন্দরে থাকা মার্কিন জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নির্ভর করে তাদের আশ্রয় দেওয়া দেশের মনোভাবের ওপর। তিনি বলেন, অন্য কারও সীমারেখায় প্রবেশ করলে তা আন্তর্জাতিক বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও ওই দেশেরও ভূমিকা থাকে।

শাস্টার বলেন, ইরানের এখন দক্ষ ডুবুরি রয়েছে। তারা জাহাজের নিচে গিয়ে বিস্ফোরক লাগানোর দক্ষতা রাখে। এতে করে নিরাপত্তা যতই জোরদারই হোক না কেন তাদের আটকানো কঠিন।  

জলমাইনও মার্কিন জাহাজের জন্য বড় হুমকি। ১৯৮৮ সালে এমন মাইন বিস্ফোরণে একটি মার্কিন ফ্রিগেটের অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল।

ইউএসএস স্যামুয়েল বি রবার্টস নামের ওই ফ্রিগেট পারস্য সাগরে বিস্ফোরিত হয়েছিল। এতে করে ১৫ ফুটের একটি গর্ত হয়ে যায় নৌযানটিতে, আহত হয় ১০ জন নাবিক। আরেকটু হলে ডুবেই যেত জাহাজটি। পুরু স্টিল থাকার পরও বিস্ফোরণের ধাক্কা সামলাতে পারেনি ফ্রিগেটটি।

শাস্টার বলেন, ‘ওই মাইনটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রযুক্তিতে তৈরি। এতেই ‍কুপোকাত হয়ে যায় মার্কিন জাহাজ। 

 

নিরাপত্তায় মুহূর্তের শিথিলতা

ইরানি হুমকির পর নিশ্চিতভাবেই মার্কিন সেনারা সতর্ক অবস্থানে থাকবেন। কিন্তু টানা ২৪ ঘণ্টা এই সতর্কতা বজায় রাখা সম্ভব না। শাস্টার বলেন, ক’ড়া নিরাপত্তা অনেক কঠিন। এতে করে প্রত্যেক ঘাঁটিতে আপনার যোগাযোগ ও সেনা সরবরাহ বাড়াতে হবে। কিন্তু দীর্ঘসময় ধরে আপনি ২৪ ঘণ্টা সেটিকে একেবারে সুরক্ষিত রাখতে পারবেন না’। তিনি আরও বলেন, ‘ইরান ধৈর্য্য ধরে থাকতে পারে। যখনই কোনও দুর্বল মুহূর্ত পাবে তখনই আঘাত করে বসবে। তারা অপেক্ষা করছে কখন কেউ শিথিল হবে’।

২০১৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার এক পুলিশি অভিযানে এই মনোভাব স্পষ্ট হয়। ওই ঘটনায় নৌবাহিনীর এক বিমান ঘাঁটিতে দুই ব্যক্তি একটি জিপে করে পালিয়ে যাচ্ছিল।৭ মাইল পাড়ি দিয়ে তারা ৬ কোটি ডলারের একটি এফ/এ-ফাইটার জেটে আঘাত আনে।

ঘাঁটির কর্মকর্তারা দাবি করেন, প্রবেশ ও বের হওয়ার সবগুলো পথই সুরক্ষিত ছিল, প্রহরীরা নিযুক্ত দায়িত্বে ছলেন। কিন্তু তারা জানেন না কীভাবে গাড়িটি ভেতরে প্রবেশ করতে পারল। ওই ঘাঁটিতে পুরো সময় ‘ফোর্স প্রটেকশন ব্রাভো’র নিরাপত্তায় ছিলো যা পেন্টাগনের তৃতীয় সর্বোচ্চ নিরপত্তা ব্যবস্থা। 

অভ্যন্তরীণ হুমকি

যু্ক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই হামলার শঙ্কা রয়েছে। গত মাসে যেমন ফ্লোরিডার পেনাসকোলায় নৌবাহিনীর এক বিমান ঘাঁটিতে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। সেখানে পাঁচজন নিহতও হয়েছে। সন্দেহভাজন হামলাকারী একজন মার্কিন নাবিক ও আরেকজন সৌদি সামরিক কর্মকর্তা। তাদের দুজনেরই ওই ঘাঁটিতে থাকার অনুমতি ছিল এবং কেউই সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত নয়।

তাই মার্কিন ঘাঁটিতে অবস্থান করা লাখ লাখ সেনার মানসিকতায় নজরদারি চালানো সহজ কাজ নয়। যেকোনও সময় এমন ঘটনা আরও ঘটতে পারে। শাস্টার বলেন, ‘কড়া নিরাপত্তায় সুরক্ষা সবসময় নিশ্চিতভাবে সম্ভব নয়। এতে করে অনেক ঠিকাদারদের আনাগোনা বেড়ে যায়। দীর্ঘসময় ধরে প্রত্যেকের ওপর আলাদা নজরদারি করতে পারবেন না আপনি। আর পারলেও তা যথেষ্ট নয়’।

তার মতে, ‘ইরান এখন নিজেদের কড়া নিরাপত্তার কথা ভাবছে না। এতে করে তার ব্যর্থ হচ্ছে না, তারা সাফল্যের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে।

 

/এমএইচ/এএ/এমপি/

লাইভ

টপ