ভারত শাসনে বিজেপি’র ভুল কোথায়?

Send
আশীষ বিশ্বাস, কলকাতা
প্রকাশিত : ০৪:০০, জানুয়ারি ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৪:০৫, জানুয়ারি ২৪, ২০২০

নিজেদের লক্ষ্য পুরণের কথা হলে, ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ধারে কাছে কেউ আসতে পারবে না। মাত্র আট মাস আগে লোকসভায় ৩০৩ আসনে জয় নিয়ে ক্ষমতায় ফিরে দলটি সমালোচকদের নীরব আর বিরোধী দলগুলোকে স্তব্ধ করে দেয়। মনে হচ্ছিল বিজেপি কোনও ভুল পদক্ষেপ ফেলবে না।

আজকের দিনে সব পক্ষের আক্রমণের মুখে নিজেদের এককোণে বন্দি করে ফেলেছে দলটি। বিরোধীদের পুনরুত্থান কয়েকটি রাজ্যে স্বাভাবিক শাসন চালানোও কঠিন করে দিয়েছে। বর্হিবিশ্বে, গণতন্ত্র সূচকে ভারতের অবস্থান নেমেছে, বেশিরভাগ দেশই দিল্লির ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ভারতের সরকার পরিচালনার ধরণ আর মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে কঠিন স্বরে কথা বলা শুরু করেছে নাগরিক অধিকার সংস্থাগুলো। জাতীয় নাগরিক তালিকা (এনআরসি) এবং এই সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সম্পর্ক শিথিল করেছে প্রতিবেশি বাংলাদেশ।

অর্থনীতির ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী শ্লথ গতি বড় শঙ্কার কারণ। ইতোমধ্যে পূর্বাভাস পাওয়া গেছে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীরা সম্ভাব্য বিনিয়োগ স্থগিত করতে থাকায় জিডিপির ধীর গতি আরও সংকটময় হবে। বিরোধীদের আন্দোলনের মুখে কয়েকটি অঞ্চলে স্বাভাবিক জীবন যাত্রার ব্যাঘাত এবং সহিংসতা বাড়তে থাকা নিয়ে সৃষ্ট উদ্বেগ আরও জটিল করে ফেলছে পরিস্থিতি  নিঃসন্দেহে নাগরিকত্ব সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ইস্যুতে দিল্লি আগের ঘোষিত কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে পিছু হটছে। মাত্র আট মাসের মধ্যে একটি আত্ম-প্রত্যয়ী দলের এই অবনমন কিভাবে হলো?

বেশিরভাগ পর্যবেক্ষক মনে করেন এর মূল কারণ হলো বিজেপির অভ্যন্তরে হিন্দুত্ববাদের প্রতি স্পষ্ট সমর্থন। বিজেপির বর্তমান সভাপতি (গত ২০ জানুয়ারি দায়িত্ব নিয়েছেন) জগত প্রসাদ নাড্ডার কাছে এক বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক উত্তরাধিকার দিয়ে গেছেন সাবেক সভাপতি প্রধান অমিত শাহ। হিমাচল প্রদেশ থেকে উঠে আসা নাড্ডা অপেক্ষাকৃত সজ্জন বলে বিবেচিত। বিপদের সময়ের সম্পদ বলে বিবেচিত হলেও এই কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় তার করণীয় কী হবে সেটা একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তাছাড়াও বিশালাকার ক্ষমতাসীন একটি দলকে ঐক্যবদ্ধ করে রাখার মতো ব্যক্তিত্ব ও মনোবল নাড্ডার আছে কিনা তা এখনও অজানা। এমন এক পরিস্থিতিতে তিনি দলের দায়িত্ব নিয়েছেন যখন বিজেপির মূল ভোট বিজয়ী নরেন্দ মোদির ভাবমূর্তি পড়তির দিকে। ২০১৪ সালের পর প্রথমবারের মতো দলটি বিরোধীদের মারাত্মক তোপের মুখে পড়েছে।

গত দুই বছরে আসামে এনআরসি নিয়ে বিজেপির প্রচারণায় ভাটা পড়েছে। সেখানে একসময় দলটির প্রতি সমর্থন বাড়তে থাকলেও এখন তা কমতে শুরু করেছে। অমিত শাহ অবৈধ বাংলাদেশিদের ঘুণপোকা আখ্যা দিয়ে তাদের বিতাড়িত করার কথা বলে এসেছেন। কিন্তু আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সানোয়াল এখন বলেছেন, ইতোমধ্যে বিদ্যমান ছয়টি আটক কেন্দ্রের পাশাপাশি নতুন নির্মিত আরও দশটি আটক কেন্দ্রে অবৈধ অভিবাসীদের পাঠানো হলে তাদের কেবল খাবার আর আশ্রয় দেওয়া হবে। আর কিছুই এ থেকে পাওয়া যাবে না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো যে, আসামে লাখ লাখ বিদেশি থাকার যে দাবি বিজেপি সমর্থকরা এতোদিন করে এসেছেন সরকারিভাবে তা প্রমাণ করা যায়নি। সম্প্রতি প্রকাশিত এনআরসিতে তিন কোটি ২০ লাখ মানুষের মধ্যে কেবল মাত্র কয়েক লাখই নিজেদের নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে পারেনি।

আসামের এনআরসি পর্বতের মুসিক প্রসব। মুসলমানদের থেকে বেশি হিন্দু বাদ পড়েছে। বিজেপির প্রচারণার বেলুন ফুটো হয়ে গেছে। বিপরীতে ভারতীয় এবং বিদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোতে দরিদ্র মুসলমান ও হিন্দুদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের খবর প্রচারিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ভারতের ধর্ম নিরপেক্ষ ও বহু জাতিগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি। অবৈধ বাংলাদেশি শনাক্ত করা নিয়ে চুপ হয়ে গেছেন মোদি তবে আসামের এনআরসি নিয়ে সব হুঁশিয়ারি ও সমালোচনা উড়িয়ে দিয়ে বিষ ছড়িয়ে চলেছেন অমিত শাহ।

অমিত শাহ আগ্রাসী নীতি অব্যাহত রেখেছেন। আর বিজেপিও এনআরসি পর্যালোচনা বা বিরত থাকার চিন্তা করছে না। সঞ্জয় হাজারিকা ও হর্শ মান্দারের নেতৃত্বে বুদ্ধিজীবীরা সব কর্তৃপক্ষের ন্যায্য আচরণ চেয়ে আবেদন করলেও নিপীড়িতদের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টও খুব বেশি কোনও ভূমিকা রাখেনি।

কয়েক মাসের মাথায় এখন লাখ লাখ মানুষের (যাদের বেশিরভাগই মুসলমান) অসন্তোষ ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। এই ক্ষোভ আসাম ছাড়িয়ে সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। এটা সরাসরি এনআরসি নিয়ে বিজেপির বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণার ফলাফল।

কেবলমাত্র আসামে বিজেপির মন্ত্রী হেমন্ত বিশ্ব শর্মা রাষ্ট্রনায়কোচিত মনোভাব প্রদর্শণ করে স্বীকার করেছেন যে, অসমিয়া কট্টরপন্থীরাই নিজেদের রাজ্যের ক্ষতি করছেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা এনিয়ে চুপ থেকেছেন। আর সম্মিলিতভাবে বিজেপি নেতারা আসামের এনআরসি নিয়ে ভারতীয় মুসলমানদের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার শক্তিকে অবজ্ঞা করেছেন।

নিজের সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা নাড্ডার ওপর ছেড়ে দিয়ে অমিত শাহ এখন চুপ করে গেছেন। জাতীয় জনসংখ্যা তালিকায় (এনপিআর) পিতামাতার জন্ম রেকর্ড বাধ্যতামূলক, নাকি ঐচ্ছিক হবে এমন সব আনুষ্ঠানিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য এখন অমিত শাহ কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী প্রকাশ জাদভেদকারকে সামনে ঠেলে দিচ্ছেন।

আর এসবই হচ্ছে চাপের মুখে। ফলে নতুন করে বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে উঠছে। সাধারণ মানুষের বিক্ষোভ কেন অবজ্ঞা করা হলো? এখন এসব দুর্ভাগা মানুষ পশ্চিম বঙ্গ, দিল্লি, উত্তর প্রদেশসহ বিভিন্ন স্থানে বিরোধী দলগুলোর পতাকার নিচে জড়ো হচ্ছে আর বিজেপি ব্যস্ত রাজনৈতিক উত্তাপ নিরসনে। দলটির ‘লাখ লাখ অবৈধ বাংলাদেশি’ খুঁজে বের করার স্বপ্ন কখনোই বাস্তবায়ন হবে না। এমনকি আসামেও না।

এই মুহূর্তে খোলাখুলিভাবে প্রশ্ন উঠছে বিজেপি কি ফ্যাসিস্ট? কোনও কোনও পর্যবেক্ষক (নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অভিজিৎ ব্যানার্জিও তাদের মধ্যে আছেন) বলছেন ভারতে ফ্যাসিজমের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এর জোরালো প্রমাণ হলো দেশব্যাপী এনআরসি করা হবে কিনা তা এখনও পরিস্কার করতে পারেনি বিজেপি। রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়টি খোলাসা করার আগে দিল্লি এবং বিহারের বিধানসভার নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে।

অস্বীকার করার উপায় নেই সাবেক সভাপতির হাত ধরেই বিজেপি সবচেয়ে শক্তিশালী এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা বাতিল বা তিন তালাক বাতিলের মতো কয়েকটি বিষয়ে বিজেপির কঠোরতা ভারতে কোনও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেনি।

এই ধরণের ইতিবাচকতার ওপর ভর করে পুলওয়ামায় ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর পাকিস্তানের সীমানায় হামলা চালানোর মতো জোরালো অবস্থান দেখাতে পেরেছে ভারত। ১৯৭০-৭১ এর পর এরকম সাহসিকতা এই অঞ্চলে আর দেখা যায়নি। নিঃসন্দেহে এর পর দেশে বিদেশে বিজেপির ভাবমূর্তি বেড়েছে।

সে পর্যন্ত ভালোই ছিল। কিন্তু হিটলার ও নাৎসিদের মতো অমিত শাহ খুব বেশি দূরই অগ্রসর হয়ে পড়েছিলেন। যেকোনও আক্রমণাত্মক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে কখন কোথায় থামতে হবে সেটা জানাও খুব জরুরি। সব মিলে বিজেপি আসামের এনআরসি নিয়ে হয়ে যাওয়া ক্ষতি নিরুপণ করতে ব্যর্থ হয়েছে বিজেপি।

বর্তমান সংকট মোকাবিলায় দলটিকে অবশ্যই পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। ভালো লক্ষণ হলো শেষ পর্যন্ত জনমত শুনছে তারা। এর পাশাপাশি মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে তাদের আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপ নিতে হবে। ২০২৪ সালের পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত পর্যাপ্ত সময় হাতে থাকা দলটির জন্য এক বড় স্বস্তি।

/জেজে/

লাইভ

টপ