মিয়ানমার এখন কী করবে?

Send
জাহিদুল ইসলাম জন
প্রকাশিত : ১৬:২০, জানুয়ারি ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৬, জানুয়ারি ২৬, ২০২০

আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিতের পাশাপাশি নিয়মিত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়ার পর নেপিদোর পক্ষ থেকে কোনও স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। আদালতের রায় নিয়ে প্রায় কিছুই বলেনি সরকার। অতীতের ধারাবাহিকতায় গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তা সত্ত্বেও বিশ্লেষকরা বলছেন, গত সপ্তাহে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতের দেওয়া রায় নিঃসন্দেহে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় নেপিদোর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াবে।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরদার করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। হত্যাকাণ্ড, সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগের বাস্তবতায় জীবন বাঁচাতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে সাত লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এই নৃশংসতাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যা দিয়ে গত ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসে (আইসিজে) মামলা করে গাম্বিয়া। ডিসেম্বরে ওই মামলার শুনানি  হয়। এ বছর ২৩ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার) আইসিজের বিচারক রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা নিশ্চিতে চারটি অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ ঘোষণা করেন।

আইসিজের আদেশের বিষয়ে গ্লোবাল অ্যাকাউন্টিবিলিটি ইনিশিয়েটিভ অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল কমিশন অব জুরিস্টের আইনি উপদেষ্টা ও সমন্বয়কারী কিংসলে অ্যাবোট সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে বলেন, ‘গণহত্যা সনদ অনুযায়ী রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় মিয়ানমারকে বাধ্য করার জন্য বৃহস্পতিবারের আদেশ খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। আদেশ মানতে মিয়ানমার আইনগতভাবে বাধ্য। জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সর্বোচ্চ আদালতের তৈরি করা আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা মানতে এই আদেশ দেশটির ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে।’নিপীড়নের মুখে ২০১৭ সালে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে লাখ লাখ রোহিঙ্গা

মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করেছিলেন গাম্বিয়ার মানবাধিকার আইনজীবী ও বিচারমন্ত্রী আবু বকর তামবাদু। তিনি বলেছেন, আদালতের বিচারকেরা যে সর্বসম্মত আদেশ দিয়েছেন, তা গাম্বিয়ার প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছে। মিয়ানমার ও গাম্বিয়া প্রত্যেকে বিচারকদের প্যানেলে একজন করে সদস্য মনোনয়ন দেয়। মিয়ানমারের নিয়োগ করা বিচারক জার্মান অধ্যাপক ক্লস ক্রেসও গাম্বিয়ার পক্ষে রায় দিয়েছেন।

ইংল্যান্ডের অ্যাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান রাইটস সেন্টারের সিনিয়র লেকচারার কারলা ফেরটসম্যান নিউ ইয়র্ক টাইমসকে বলেন, বেশ কয়েকটি কারণে এই আদেশ গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতির উন্নয়নে মিয়ানমারকে অবশ্যই সক্রিয় পদক্ষেপ নিতে হবে এবং তা করার প্রমাণ দিতে হবে। আর  প্রতিবেদন দাখিলের স্পষ্ট সময়সীমা রয়েছে।

জাতিসংঘ, বিভিন্ন মানবাধিকার গ্রুপ ও বেশ কয়েকটি দেশ মিয়ানমারের নিন্দা করলেও গাম্বিয়াই প্রথম তাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। আর ওই মামলাতেই প্রথমবারের মতো দেশটির বিরুদ্ধে কোনও আন্তর্জাতিক আদালত আদেশ দিলো। নিউ ইয়র্কভিত্তিক গ্লোবাল জাস্টিস সেন্টারের প্রেসিডেন্ট আকিলা রাধাকৃষ্ণান বলেন, আদালত নিশ্চিত করেছে গণহত্যা কোথায় ঘটেছে সেটা বিষয় না, এটা পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিষয়। এখন গণহত্যায় আক্রান্ত বা সম্পৃক্ত না হয়েও আক্রান্তদের পক্ষ নিয়ে যে কোনও রাষ্ট্র তা ঠেকাতে, বন্ধ করতে এবং শাস্তির ব্যবস্থা করতে পারবে।কক্সবাজারের ঘনবসতিপূর্ণ শিবিরে বসবাস করছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা

৫৭ জাতির অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কোঅপারেশনের (ওআইসি) পক্ষে মামলাটি দায়ের করে গাম্বিয়া। আদালতে করা আবেদনে দেশটি মিয়ানমার গণহত্যা কনভেনশন ভঙ্গ করেছে বলে ঘোষণা দেওয়ার আহ্বান জানায়। ওই সিদ্ধান্ত আসতে বেশ কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। তবে বৃহস্পতিবারের আদেশে মিয়ানমারকে সেখানে থেকে যাওয়া ছয় লাখ রোহিঙ্গার সুরক্ষা নিশ্চিতের নির্দেশ দেন আদালত। একইসঙ্গে গণহত্যার আলামত রক্ষারও আদেশ দেওয়া হয়।

এখন মিয়ানমার যদি আইসিজের আদেশ মেনে না চলে তাহলে কী হবে?

অং সান সু চির সরকার ইতোমধ্যে কার্যত আইসিজের আদেশ প্রত্যাখ্যান করে দাবি করেছে গণহত্যার কোনও প্রমাণ নেই। সর্বোপরি দেশটির সামরিক শাসকেরা দশকের পর দশক ধরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ইচ্ছা পূরণের চেয়ে বিচ্ছিন্ন থাকাকেই বেছে নিয়েছে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো বেসামরিক শাসনের দিকে এগিয়ে চাওয়ার বদলে তারা গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চিকে দীর্ঘদিন ধরে গৃহবন্দি করে রেখেছিল।  

এশিয়া জাস্টিস কোয়ালিশন সেক্রেটারিয়েটের প্রধান ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ প্রিয়া পিল্লাই সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে বলেন,  মিয়ানমার আদেশ মানবে কি মানবে না, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতির বড় প্রশ্ন আকারে হাজির হয়েছে। বিষয়টি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ বা সাধারণ পরিষদে উঠতে পারে। এটা না মানা তাদের স্বার্থের কোনো বিষয় নয়। এটা আদালতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে উঠেছে গণহত্যার অভিযোগ

এদিকে নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষমতা আদালতের নেই। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। ইতোমধ্যে আদালতের আদেশকে স্বাগত জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। বিষয়টি তিনি নিরাপত্তা পরিষদের উত্থাপন করতে পারেন বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলো থেকেও চাপে পড়তে পারে মিয়ানমার। নেপিদো অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনসের (আসিয়ান) সদস্য। আসিয়ানের সদস্যভুক্ত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয়েশিয়ার এক বিবৃতিতে আইসিজের আদেশকে সঠিক পথের পদক্ষেপ বলে অভিহিত করা হয়েছে। নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গাদের বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠী আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, আইসিজের আদেশ রাখাইনে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আকিলা রাধাকৃষ্ণান আরও বলেন, মিয়ানমার যদি আদেশ বাস্তবায়ন না করে তাহলে এর অর্থ হবে ধৈর্যের বাধ ভেঙে যাওয়া। ২০১১ সাল থেকে আংশিক গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করায় এতোদিন মানবাধিকার ইস্যুতে ছাড় পেয়ে এসেছে দেশটি। এখন এই ধরনের স্পষ্ট আইনি আদেশ মেনে চলতে ব্যর্থ হলে মিয়ানমারকে সত্যিকারের পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।

মিয়ানমার সরকারের প্রধান মুখপাত্র জাও তায়ে আদালতের আদেশের বিষয়ে লিখিত প্রশ্ন বা ফোন কল নিয়ে মন্তব্য করায় সাড়া দেননি। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাও মিন তুন এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আদালতের আদেশের বিষয়ে তারা সরকারকে সহায়তা করবেন এবং সরকারের নির্দেশনা মাফিক কাজ করবেন। তবে এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি।মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি

বৃহস্পতিবার আদালতের আদেশের পর মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে আদালতের আদেশের ব্যাপারে কিছু বলা না হলেও বরাবরের মতো রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। বিবৃতিতে রাখাইনে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হওয়ার স্বীকারোক্তি দেওয়া হলেও গণহত্যার ঘটনা অস্বীকার করা হয়েছে। উল্লেখ্য, আদালতের আদেশের আগেই গত মঙ্গলবার মিয়ানমার সরকারের নিযুক্ত একটি কমিশন রাখাইনের ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, রাখাইনের কয়েকটি এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী নির্বিচারে বেসামরিক নাগরিক হত্যা করেছে। এতে প্রায় নয়শ’ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। তবে এসব হত্যাকাণ্ডে কোনও গণহত্যার উদ্দেশ্য পায়নি তারা। বৃহস্পতিবার ফিনান্সিয়াল টাইমসে প্রকাশিত এক নিবন্ধেও মোটামুটি একই অবস্থান ব্যক্ত করেছেন সু চি।

গাম্বিয়ার আইনি দলের সদস্য এবং প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের কূটনীতিক আরসালান সুলেমান বলেন, এটা খুবই জোরালো সিদ্ধান্ত এবং এতে সারা বিশ্বের রোহিঙ্গাদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে।

/বিএ/এমএমজে/

লাইভ

টপ