অন্ধকারাচ্ছন্ন দিল্লিতে সম্প্রীতির রংধনু

Send
বিদেশ ডেস্কে
প্রকাশিত : ২০:২৭, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১৯, ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০২০

উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিদ্বেষের আগুনে জ্বলছে দিল্লি। সেই আগুনে পুড়ে গেছে বহু মুসলিমের ঘর। নীরবতার পাশাপাশি বিজেপি কর্মীদের আগুন দেওয়ায় উৎসাহিত করার অভিযোগ উঠেছে দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে। ৬৯ ঘণ্টা নীরব থাকার পর দিল্লিবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। থমথমে আতঙ্কের নগরে পরিণত হয়েছে উত্তর-পূর্ব দিল্লি। সংঘর্ষে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ জনে। তবে এখনও পুরোপুরি মৃত্যু হয়নি মানবতার। মুস্তফাবাদ, অশোকনগর ও শিববিহারের মতো বেশ কিছু অঞ্চলে হিন্দু-মুসলিম প্রতিবেশীরা পরস্পরের পাশে দাঁড়িয়েছে। দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে এই পরিস্থিতিকে ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন দিল্লিতে সম্প্রীতির রংধনু’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

মুস্তফাবাদের প্রধান সড়কগুলোর বেশিরভাগই প্রায় জনশূন্য, ঘোরাফেরা করছেন কিছু পুলিশ-সিআরপিএফ সদস্য। ১৪৪ ধারা জারি করায় কাউকে দেখামাত্রই গুলি করার অনুমতি রয়েছে তাদের। তবে অলিগলিতে স্থানীয়দের দেখা মিলছে কিছুটা। বাইরে দাঁড়িয়ে তারা সতর্ক নজর রাখছেন, যেন কেউ হামলা না চালায়। পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে এক ব্যক্তি বলেন, ‘অবস্থা তো কিছু লোকই খারাপ করে রেখেছে। আমরা চেষ্টা করছি না ওদিক (হিন্দু) থেকে হিংসা থাক, না এদিক (মুসলিম) থেকে।’ পাশের একটি বাড়ির দিকে আঙুল দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘দেখুন, ওটা মুসলিমদের বাড়ি। কিন্তু সেখানে তিনদিন ধরে এক ব্রাহ্মণ মেয়ে থাকছে।’

জানা গেছে, ওই বাড়ির মালিকের নাম মোহাম্মদ আরশাদ খান। দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর থেকেই সেখানে সোনিয়া স্বামী নামে এক হিন্দু মেয়ে আশ্রয় নিয়েছে। আম্বেদকার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সোনিয়া বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার সময় আমি কলেজেই ছিলাম। আমার সহপাঠী ও বন্ধু শামা জানতে চায়, আমি তাদের বাড়ি আসব কিনা। কারণ এটাই ছিল, কলেজ থেকে সবচেয়ে কাছের নিরাপদ জায়গা।’

শামা মালিক বলেন, ‘সে (সোনিয়া) শিববিহারে থাকে। ওই সময় তার এলাকার পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। আমি চাচ্ছিলাম সে নিরাপদে থাক। এজন্যই তাকে সঙ্গে নিয়ে আসি। বিপদে থাকবে জেনেও কীভাবে আমার বন্ধুকে রেখে আসতাম?’ সোনিয়া বলেন, ‘আমার বাবা-মা প্রথমে চিন্তায় ছিলেন। কিন্তু যখন শুনেছেন আমি শামাদের বাড়িতে, তারপর শান্ত হয়েছেন।’

শামাদের বাড়ি থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরেই পরপর তিনটি হিন্দু বাড়ি। মোহাম্মদ ইরফান নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘এলাকায় দাঙ্গার মতো পরিস্থিতি দেখার পর থেকেই তারা (হিন্দু) খুব ভয়ে ছিল। আমি বলেছি, কোনও ভয় নেই, আমি তোমাদের পাশে আছি, তোমাদের দায়িত্ব আমার। তোমরা আমার প্রতিবেশী, আমি তোমাদের খেয়াল রাখবো।’

মনু নামে ওই এলাকার হিন্দু ধর্মানুসারী এক বাসিন্দা বলেন, ‘আমরা গত রাতে খুব আতঙ্কে ছিলাম। গুলি হচ্ছিল, ইটপাটকেল মারছিল, বুঝতে পারছিলাম না কী করবো। সেই সময় বন্ধু ইমরানসহ কিছু লোক আমাদের সাহস দেয় এবং সেখান থেকে সরে আসতে সাহায্য করে। তারা মানবতাকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। একদিকে মানুষ পাথর মেরেছে, সহিংসতায় মেতেছে; অন্যদিকে তারা (মুসলিম) ভিন্ন সম্প্রদায়ের হওয়া সত্ত্বেও কঠিন সময়ে আমাদের সাহায্য করেছে।’

শুধু মুসলিমরাই নয়, দাঙ্গার মধ্যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন হিন্দুরাও। হরজিৎ ভাটি নামে এক চিকিৎসক জানান, সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর শ্যামবিহার এলাকায় অন্তত ২৫টি মুসলিম পরিবার হিন্দুদের বাড়িতে লুকিয়ে ছিল। পরে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে বুধবার মুস্তফাবাদ হাসপাতালে নিয়ে আসে। ওই পরিবারগুলোর এক সদস্য বলেন, ‘আমরা এখনও বেঁচে আছি। কারণ, হিন্দু প্রতিবেশীরা আরএসএস গুণ্ডাদের হাত থেকে আমাদের বাঁচিয়েছে। সবাই জানে এ দাঙ্গার পেছনে কারা আছে। আরএসএস-বিজেপিকে চপেটাঘাত করা এ ভারত নিয়ে আমি গর্বিত।’

অশোকনগরের ৪০ মুসলিম পরিবারের ঘর, আর জীবনযাত্রা এক প্রকার ধ্বংসই হয়ে গেছে। ধ্বংসাবশেষের মধ্যেও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ঘরহীন মুসলিমদের কাছে টেনে নিয়েছেন হিন্দু বাসিন্দারা। গত মঙ্গলবার এসব মুসলিমের বাড়িঘর এবং দোকানপাট পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তখন তাদের পাশে দাঁড়ান হিন্দু প্রতিবেশীরা। তারা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য তাদের ঘরের দরজা খুলে দেন।

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে প্রায় এক হাজার উগ্র জনতা বড় মসজিদের কাছের কলোনিতে প্রবেশ করে। তারা যখন মসজিদে প্রবেশ করে, তখন সেখানে ২০ জন মুসল্লি নামাজরত অবস্থায় ছিলেন। সেই পরিস্থিতির কথা বলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা খুরশির আলম। তিনি বলেছেন, “আমি মসজিদেই ছিলাম। আমরা তখন জীবন বাঁচাতে দৌড়ে বের হয়ে যাই।”

উগ্র জনতা ভাঙচুর করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। স্থানীয় আরেক বাসিন্দা মোহাম্মদ তৈয়ব জানান, দুপুর দেড়টার দিকে ওরা মসজিদের ছাদে উঠে ভারতের এবং গেরুয়া পতাকা উত্তোলন করে। বুধবার সকালে স্থানীয়রা এগুলো সরিয়ে ফেলে। এ সময় স্থানীয়রা উগ্র জনতাকে কোনও সম্পত্তির ক্ষতি না করার অনুরোধ করে। সেই অনুরোধ কানেই নেয়নি তারা। তারা সবাই অন্য অঞ্চলের ছিলেন। অশোকনগরের বাসিন্দা রাজেশ খাত্রি বলেছেন, “উগ্রদের বেশিরভাগের মুখ ঢাকা ছিল। তাদের হাতে ছিল লোহার রড। তারা খুব দ্রুত দোকানপাট পুড়িয়ে দিতে শুরু করে। আমরা ভয়ে ছিলাম হয়তো আমাদের মেরে ফেলা হবে।”

দোকান পোড়ানোর পরে তারা ছয়টি বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা মো. রশিদ বলেছেন, “সেখানে মাত্র ছয় ঘর মুসলিম বাস করতো। উগ্র জনতা তা নিশ্চিতভাবে জানতো। কারণ, তারা অন্য কোনও ঘরে আক্রমণ করেনি। তারা মুসলিমদের ঘর থেকে সব লুট করে নিয়ে গেছে। কিছুই ফেলে যায়নি। আমরা এখন গৃহহীন।” তিনি আরও বলেছেন, “আমরা ভেবেছিলাম আমাদের রাস্তায় থাকতে হবে এবং জীবনযাত্রা থেমে যাবে। কিন্তু, হিন্দু বন্ধুরা আমাদের পাশে দাঁড়িয়ে সব ধরনের সহযোগিতা করছেন। ওরা আমাদের তাদের ঘরে থাকতে দিয়েছে।” “আমরা এখানে ২৫ বছর একসঙ্গে বাস করছি। কখনও আমাদের হিন্দু প্রতিবেশীদের সঙ্গে একটুও মতবিরোধ হয়নি। আমরা সবাই একটি পরিবারের মতো বাস করি,” বলেছেন রশিদ।

রশিদের হিন্দু প্রতিবেশী পিন্টু। তিনি বলেছেন, “পরিস্থিতি যেমনই হোক আমরা তাদের পাশে দাঁড়াবো। আমরা কখনও তাদের সম্পত্তির ক্ষতি করার কথা ভাবতেও পারি না। যেসব দোকানে আগুন লাগানো হয়েছে তা এসব মুসলিম পরিবারের মালিকানাধীন। ফলে, তাদের বাড়িঘর ও জীবিকা নির্বাহের রাস্তা ধ্বংস হয়ে গেছে। এমন দুর্দশায় আমরা তাদের একা থাকতে দিতে পারি না।”

অশোকনগরের পাঁচ নম্বর গালির অপর বাসিন্দা নীরজ কুমার। তিনি বলেছেন, “আমরা কোনও হামলাকারীকে চিনতে পারিনি। আমরা অনেক বছর ধরেই এখানে একসঙ্গে বাস করছি। তাই আমরা একে অপরকে আঘাত করতে পারি না। এখানে দুইবার হামলা করা হয়। দুপুর ১টার দিকে একবার এবং বিকাল ৪টার দিকে আরেকবার।”

পুড়ে যাওয়া বাড়িগুলোর একটির মালিক দানিশ। তিনি বলেছেন, “আমরা কয়েকবার পুলিশকে ফোন করেছিলাম। কিন্তু, তারা এক ঘণ্টা পরে আসে। ততক্ষণে যা ক্ষতি হওয়ায় হয়ে গেছে। উগ্র জনতা বেশিরভাগ বাড়ি ভাঙচুর করেছে। পুলিশ তখন আমাদের পরিবারকে থানায় নিয়ে যায়। সেখানেই আমরা রাত কাটিয়েছি।”

উগ্র জনতার হামলায় শুধু মুসলমানরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, হিন্দুদেরও ক্ষতি হয়েছে। মসজিদের নিচে জুতা বিক্রি করতেন রাজ কুমার। তার দোকানটিও পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেছেন, “তারা কাউকে ছাড়েনি। গত কয়েকদিন ধরে আমার দোকান বন্ধ ছিল। কিন্তু, অশোকনগরে এমন একটি ঘটনা ঘটবে তা ভাবতেই পারিনি। আমি বুধবার এসে দেখি আমার দোকানটি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।”

এদিকে শিববিহারে উত্তেজিত হিন্দুত্ববাদীরা মুসলিমদের ওপর আক্রমণ চালাতে এলে দুই মুসলিম পরিবারের ২০ সদস্যকে আশ্রয় দিয়েছেন সেখানকার হিন্দুরা।

/বিএ/এমওএফ/

লাইভ

টপ