বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী পানাম পেপারসে ফাঁস হওয়া নথিতে এবার জড়িয়ে পড়েছে নিউ জিল্যান্ডের নাম। ফাঁস হওয়া নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিশ্বের অন্যতম ট্যাক্স হ্যাভেন নিউ জিল্যান্ড। লাতিন আমেরিকার বিত্তশালীরা নিউ জিল্যান্ডের গোপনীয়তা ও কর মওকুফ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে অর্থ গোপন করে রাখছেন। পানামা পেপারসে ট্যাক্স হ্যাভেন হিসেবে নিউ জিল্যান্ডের নাম উঠে আসায় চাপে পড়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী জন কি। অর্থ গোপনের সঙ্গে জড়িত স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি ওঠেছে। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ খবর জানা গেছে।
আরও পড়ুন: আজই প্রকাশিত হবে পানামা পেপারস এর দ্বিতীয় কিস্তি, বিশ্বজুড়ে উৎকণ্ঠা
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম রেডিও নিউ জিল্যান্ড, টিভিএনজেড ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক নিকি হ্যাগার পানামাভিত্তিক আইনি প্রতিষ্ঠান মোসাক ফনসেকার ফাঁস হওয়া নথি থেকে নিউ জিল্যান্ড সংশ্লিষ্ট ৬১ হাজারেরও বেশি নথি পর্যালোচনা করেন। এ পর্যালোচনায় উঠে এসেছে ট্যাক্স হ্যাভেন হিসেবে নিউ জিল্যান্ডের নাম।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, কর মওকুফ সুবিধা, উচ্চ পর্যায়ের গোপনীয়তা ও আইনি সুরক্ষার নিশ্চয়তা থাকায় মোসাক ফনসেকা নিউ জিল্যান্ডে বিনিয়োগের জন্য তার গ্রাহকদের পরামর্শ দিয়ে আসছে। এ পরামর্শের ভিত্তিতে বিদেশিরা এখানে বিনিয়োগ করেছেন। ফলে নিউ জিল্যান্ড পরিণত হয়েছে ট্যাক্স হ্যাভেনে।
নিউ জিল্যান্ডে অর্থ গোপনের বিষয়টি সামনের আসার পর দেশটির বিরোধী রাজনীতিকরা দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে দেশটির প্রধানমন্ত্রী জন কি দাবি করেছেন, নিউ জিল্যান্ডকে ট্যাক্স হ্যাভেন হিসেবে উল্লেখ করা এসব প্রতিবেদন সঠিক নয়। বিদেশি কোম্পানিগুলো সংশ্লিষ্ট আইনে যদি সংশোধন প্রয়োজন তাহলে তা করা হবে। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে যদি কোনও পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় সরকার তা বিবেচনা করবে এবং যদি প্রয়োজন হয় তাহলে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন: ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে পরীক্ষায় ৯৫.৮ শতাংশ নম্বর পেলো কিশোর
সরকার আইন মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, আইনজীবী, রিয়েল স্টেট ব্যবসায়ী ও হিসাবরক্ষকদের অর্থ পাচার বিরোধী আইন কঠোর করার যে উদ্যোগ চলমান আছে তা দ্রুত শেষ করে নিয়ে আসার জন্য।
বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা অ্যান্ড্রু লিটল বলেন, কর ফাঁকি দেওয়ার আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র হিসেবে যে ব্যবস্থার কারণে নিউ জিল্যান্ডের নাম উঠে এসেছে সে ব্যবস্থা ভেঙে দিতে হবে। নিউ জিল্যান্ডের স্বকীয়তা রক্ষা করতে হবে।
প্রতিবেদন অনুসারে, নিউ জিল্যান্ডে মোসাক ফরসেকার মূল যোগাযোগ ছিলেন বেন্টলেইজ নিউ জিল্যান্ড হিসাবরক্ষণ প্রতিস্ঠানের সহ প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক রজার থম্পসন। এটিই নিউ জিল্যান্ডে মোসাক ফনসেকার নিবন্ধিত কার্যালয়। নিউ জিল্যান্ড সংশ্লিষ্ট ফাঁস নথিগুলোর মধ্যে সাড়ে হাজার নথিতে থম্পসনের নাম উল্লেখ রয়েছে।
দেশটির রাজস্ব কার্যালয়ের মতে, চলতি বছর নিউ জিল্যান্ডে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৭০০তে। দশ বছর আগেও যা ছিলো মাত্র দুই হাজারের মতো।
থম্পসন জানিয়েছেন, তার অভিজ্ঞতা অনুসারে কর ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টি এসব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বাভাবিক বিষয় নয়। তার প্রতিষ্ঠানও অবৈধভাবে কোনও অর্থ গোপন করতে সহযোগিতা করেনি।
রয়টার্সের পক্ষ থেকে থম্পসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তার প্রতিষ্ঠান থেকে জানানো হয় তিনি অফিসে নেই।
গ্রিন পার্টির নেতা জেমস শ দেশটির প্রধানমন্ত্রীকে কর ফাঁকি দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে না দাঁড়িয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত দাবি করেছেন।
আরও পড়ুন: মোদির বিএ ডিগ্রির সনদ দেখালো বিজেপি, ভুয়া বলছে আম আদমি
উল্লেখ্য, চলতি মাসের শুরুর দিকে পানামা পেপারস ফাঁসের মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রভাবশালী রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং রাঘববোয়ালদের আর্থিক কেলেঙ্কারির তথ্য সবার সামনে চলে আসে। গোপনীয়তা রক্ষাকারী হিসেবে পৃথিবীর অন্যতম প্রতিষ্ঠান মোস্যাক ফনসেকা, যেটি পানামার একটি আইনি প্রতিষ্ঠান, সেখান থেকেই সম্প্রতি ফাঁস হয়েছে ১১ মিলিয়ন নথিপত্র। ফাঁস হওয়া নথিগুলোতে দেখা যায়, অর্থ পাচার করতে, কর ফাঁকি দিতে এবং বিভিন্ন রকম নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এই আইনি প্রতিষ্ঠানটি তার মক্কেলদেরকে পরামর্শ দিয়ে আসছে আর তাদের পরামর্শ নিচ্ছেন বিশ্বের শীর্ষ রাজনীতিক থেকে শুরু করে ক্ষমতাবান ও সম্পদশালীরা। পানামা পেপারস ফাঁসের পর বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ তৈরি হয়। এ ঘটনার জেরে এরইমধ্যে পদত্যাগ করেছেন আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ও স্পেনের শিল্পমন্ত্রী।
ফাঁস হওয়া নথিগুলোর তথ্য নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তদন্ত শুরু হয়। ফ্রান্স-অস্ট্রেলিয়া-নিউ জিল্যান্ড-অস্ট্রিয়া-সুইডেন-নেদারল্যান্ডসসহ বেশকিছু দেশ তাদের নিজ নিজ দেশের অভিযোগ ওঠা ধনী ও ক্ষমতাশালীদের ব্যাপারে তদন্তের কথা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও তদন্ত শুরুর কথা জানায়।
সোমবার (বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা) ফাঁস হওয়ার নথির দ্বিতীয় কিস্তি প্রকাশ করবে অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের আন্তর্জাতিক সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (আইসিআইজে)।ইন্টারনেটে ছাড়া হবে পানামা পেপারস এর এই দ্বিতীয় কিস্তি। পাওয়া যাবে আইসিআইজের ওয়েবসাইটে। বাংলাদেশ সময় রাত ১২টা থেকে https://offshoreleaks.icij.org ঠিকানায় ক্লিক করলে যে কেউ প্রবেশ করতে পারবেন সেখানে।
ধারণা করা হচ্ছে, নতুন করে ফাঁস হতে যাওয়া দুই লাখের বেশি অফশোর অ্যাকাউন্টের মধ্যে ৬২৫ জন কানাডার নাগরিকের নাম আছে বলে জানানো হয়েছে। ফাঁস হওয়া উপাত্ত থেকে অনুসন্ধান করা যায় এমন দুই লাখের অফশোর কোম্পানির বিভিন্ন তথ্য আজ অনলাইনে ছাড়া হবে। এসব তথ্য প্রকাশিত হলে বেনামে পরিচালিত বিভিন্ন অফশোর কোম্পানি এবং তাদের আসল মালিকদের নামের একটি বড় তালিকা সবার সামনে উন্মুক্ত হবে। সূত্র: রয়টার্স।
/এএ/








